হৃদয় ভাঙল ইংল্যান্ড, ইতিহাস গড়ল ক্রোয়েশিয়া

July 12, 2018 at 11:46 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:  ‘ইংল্যান্ডস গোয়িং অল দ্য ওয়ে’

‘ইংল্যান্ডস গোয়িং অল দ্য ওয়ে’

‘ইংল্যান্ডস গোয়িং অল দ্য ওয়ে’

ক্রোয়েশিয়ার জালে সেমিফাইনালের পঞ্চম মিনিটে বল পাঠানোর পর ইংল্যান্ড সমর্থকদের উল্লাস ছিল এমন বাঁধনহারা। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামকে মনে হচ্ছিল এক টুকরো লন্ডন, কার্ডিফ কিংবা ম্যানচেষ্টার। বারবার কানে আসছিল ‘ইংল্যান্ডস গোয়িং অল দ্য ওয়ে’।

এমন সমর্থন আর চিৎকার না করে উপায় আছে!

১৯৬৬ সালে নিজেদের একমাত্র বিশ্বকাপ জেতে ইংল্যান্ড। এরপর থেকেই কেবল অপ্রাপ্তির হাহাকার। বহু বছর বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল বড় কোনো প্রত্যাশা ছাড়া। এবার হ্যারি কেন, ইয়াং, স্টোনস, পিকফোর্ডরা সেই প্রত্যাশা তৈরি করেন। স্বপ্ন দেখান নতুন দিগন্তের। আশা জাগান নতুন ইতিহাস সৃষ্টির। তাইতো রাজপথ আর স্টেডিয়ামে শুধু চলতে থাকে ‘ইংল্যান্ডস গোয়িং অল দ্য ওয়ে’।

আত্মবিশ্বাস, মাঠের পারফরম্যান্স কোনো কিছুতেই কমতি ছিল না ইংল্যান্ডের। সেমিফাইনাল পর্যন্ত তাদের বাধা হতে পারেনি কেউ, পারেনি আটকাতে। অপ্রতিরোধ্য সেই ইংল্যান্ডকেই আজ মাটিতে নামিয়ে আনল ক্রোয়েশিয়া। ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ক্রোয়েশিয়া উঠল বিশ্বকাপের ফাইনালে।

ইংল্যান্ড শেষবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছিল ১৯৯০ সালে। তখনও পরাধীন ক্রোয়েশিয়া। পরের বছরের ২৫ জুন ক্রোয়োশিয়ার মিলল স্বাধীনতা। দেশটির ফুটবল ঐতিহ্য এতোটাই বিস্তৃত যে স্বাধীন ক্রোয়েশিয়া ১৯৯৮ সালে খেলে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। দাভর সুকেররা ত্রিবর্ণের পতাকা উড়ায় ফ্রান্সের মাটিতে। সেবার ফাইনাল খেলতে পারেনি সুকেররা। কিন্তু এবার মদ্রিচরা সেই ভুল করলেন না। ফাইনালে উঠে ইতিহাস সৃষ্টির পথে আরও একধাপ এগিয়ে গেল রাকিটিচ, মানজুকিচ ও পেরেসিচরা।

২০ বছর পর বিশ্বকাপের শেষ চারে ক্রোয়েশিয়া। ২৮ বছর পর উঠেছে ইংল্যান্ডও। ম্যাচটা যে জমজমাট হবে তা আগের থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। কিছু বুঝে উঠার আগেই গোল খেয়ে বসল ক্রোয়েশিয়া। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটে ডেলে আলিকে ডি বক্সের বাইরে ফাউল করায় ২০ গজ দূর থেকে ফ্রি-কিক পায় ইংল্যান্ড। কিরিন ট্রিপায়ারের ডানপায়ের বাঁকানো শট খুঁজে নেয় ক্রোয়েশিয়ার জাল। জাতীয় দলের হয়ে নিজের প্রথম গোল করে শুরুতেই লায়ন্সদের ‍উল্লাসে ভাসান ট্রিপায়ার।

সেট পিচ যে ইংল্যান্ডের শক্তির জায়গায় তা আরেকবার প্রমাণ মিলল। সেমিফাইনালের আগে ১১ গোল দেওয়া ইংল্যান্ড ৮টিই দিয়েছিল সেট পিচ থেকে। ট্রিপায়ার সেই তালিকায় যোগ করেন আরও একটি। তবে একটি জায়গায় ট্রিপায়ারের গোলটি এগিয়ে থাকবে। ২০০৬ বিশ্বকাপে সরাসরি ফ্রি কিকে ইকুয়েডরের বিপক্ষে গোল দিয়েছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম। বেকহ্যামের পর ট্রিপায়ার সরাসরি ফ্রি কিক থেকে গোল করার কীর্তি গড়লেন।

মাঠ গোছানোর আগে গোল হজম করে পিছিয়ে পড়ে ক্রোয়েশিয়া। দূর্বলতার সুযোগটি নিয়ে একাধিক আক্রমণ শানায় ইংল্যান্ড। ২৯ মিনিটে হ্যারি কেন বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন। মাত্র ৭ বা ৮ গজের দূরের থেকে তার নেওয়া শট ঠেকিয়ে দেন সুবাসিচ। বিশ্বকাপে ৬ গোল পাওয়া হ্যারি কেনের থেকে এমন ভুল অপ্রত্যাশিতই বটে।

২ মিনিট পর ক্রোয়েশিয়া প্রথম আক্রমণ করে ইংল্যান্ড শিবিরে। রেবিকের শট ফিরিয়ে দেন ইয়াং। রেবিকের ফিরতি শটটিও ছিল গোলমুখে। গোলরক্ষক পিকফোর্ড ঝাঁপিয়ে বল রক্ষা করেন। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে শেষ হয় দুই দলের প্রথমার্ধের লড়াই।

দ্বিতীয়ার্ধে আসল রূপে ফেরে জ্লাতকো দালিচের শিষ্যরা। প্রথমার্ধে তাদের পাওয়ার ফুটবল পাওয়াই যাচ্ছিল না। লং পাস আর দীর্ঘ ক্রস, সাথে পাওয়ার ফুটবল। তিনের মিশেলে বারবার ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টায় থাকে ক্রোয়াটরা। শেষ পর্যন্ত ৬৮ মিনিটে সমতাসূচক গোলের দেখা পায়।

ডানপ্রান্ত থেকে সিমে ভারসালজিকোর ক্রস থেকে ডি বক্সের ভেতরে পা লাগিয়ে গোল করেন পেরিসিচ। জাতীয় দলের হয়ে এটি তার ২৮তম এবং চলতি বিশ্বকাপে দ্বিতীয় গোল। সমতায় ফেরানোর ২ মিনিট পরই আবারও পেরিচের আক্রমণ। বামপ্রান্ত থেকে বল নিয়ে একাই ভেতরে ঢুকেন । বামপায়ে শট নেন ঠিকই। কিন্তু পোস্টে লেগে বল ফিরে আসে। ওখানেই শেষ হয়ে যেত ম্যাচ। কিন্তু ঈশ্বর চাননি এতটা সহজে জিতুক ক্রোয়েশিয়া!

আগের দুই ম্যাচে টাইব্রেকারে জয় পায় তারা। এবার হলে হ্যাটট্রিক হতো। সেটা হয়নি। ৯০ মিনিটের লড়াই অমীমাংসিত থাকার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেও প্রথমার্ধের ১৫ মিনিটের লড়াই ১-১ গোলে সমতা। ১০৭ মিনিটে ইংল্যান্ডকে বাঁচিয়ে দেন পিকফোর্ড। পেরিসিচের ক্রস থেকে ডাইভ দিয়ে বল পায়ে লাগান মানজুকিচ। বল ছিল গোলমুখে। পিকফোর্ড ঝাঁপিয়ে শেষ রক্ষা করেন।

কিন্তু দ্বিতীয় অর্ধে আর পারেননি পিকফোর্ড। এবারও মানজুকিচের শট। ১০৯ মিনিটে ডি বক্সের বাইরে পেরিচিসের স্বাভাবিক হেডে বল পেয়ে যান মানজুকিচ। কোনাকুনি শট নিয়ে এবার ঠিকই লক্ষ্যভেদ করেন জুভেন্টাসের হয়ে খেলা এ স্ট্রাইকার। ওই গোলেই ইংল্যান্ডের সব স্বপ্ন শুকনো পাতার মতো ভেসে যায়।

৫২ বছর পর ফের বিশ্বজয়ের বাতাস ছড়িয়ে পরে গোটা ইংল্যান্ডে। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। বাধা হয়ে দাঁড়াল নবযুগের ক্রোয়েশিয়া। ইংল্যান্ড আগেও উঠেছিল ফাইনালে, চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল। হ্যারি কেনরা এবার ইতিহাস ছুঁতে পারেনি। হৃদয় ভাঙল তারা।

‘ইংল্যান্ড ইজ কামিং হোম!’ – সমর্থকদের কন্ঠে এখন বেদনার সুর।

 

 

রাইজিংবিডি

Print