সুদের হার ৯ শতাংশে নামবে কবে?

July 12, 2018 at 11:22 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:  ব্যাংকের সব ঋণে সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার যে ঘোষণা, তা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় এখনও কাটছে না। ৬ শতাংশ সুদে সরকারি ব্যাংকের আমানত না পাওয়ায় এখন পর্যন্ত কোনও ব্যাংকই সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে পারেনি। এখনও গ্রাহকদের দুই অঙ্কের সুদই গুনতে হচ্ছে। যদিও ব্যাংক মালিকরা সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার কথা বলে সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীরা বলছেন, ৬ শতাংশ সুদে সরকারি আমানত না পাওয়ায় এখন পর্যন্ত তারা সব ঋণে সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারছেন না। কবে নাগাদ তা সিঙ্গেল ডিজিটে নামবে তাও তারা বলতে পারছেন না। এদিকে ৬ শতাংশ সুদে সরকারি আমানত পাওয়া তো দূরে থাক, বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকারি আমানত তুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এরমধ্যে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক থেকে আগের রাখা ১৭০ কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান   বলেন, ‘৬ শতাংশের বেশি সুদ না দেওয়ায় সরকারি ব্যাংকটি তাদের রাখা আমানত তুলে নিয়েছে।’ ওই ব্যাংকের রক্ষিত আমানতের মেয়াদও শেষ হয়ে গিয়েছিল বলেও জানান তিনি।

জানা গেছে- কেবল আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকই নয়, বেশ কয়েকটি ব্যাংককে ৬ শতাংশ সুদ দেওয়ার প্রস্তাব করায় রক্ষিত আমানত তুলে অন্য ব্যাংকে বেশি সুদে রেখেছে। ফলে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের (বিএবি) ঘোষণা অনুযায়ী, সব ঋণে সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে নামছে না। বিশেষ করে ভোক্তা ঋণ, এসএমই ঋণ কিংবা ক্রেডিট কার্ডে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামবে কিনা কেউ বলতে পারে না। তবে কয়েকটি ব্যাংক শিল্পের মেয়াদি ঋণ ও চলতি মূলধন ঋণে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়েছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর হিসাবে কৃষি ও রফতানি খাতের ঋণে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ রয়েছে। তবে কৃষি ও রফতানি ঋণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে আগে থেকেই সুদহার সর্বোচ্চ ৯ ও ৭ শতাংশ নির্ধারিত ছিল।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করে  বলেন, ‘সরকারি আমানত নিয়ে যা চলছে, তাতে আগামী কয়েক মাসেও সব ঋণে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনা সম্ভব হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ব্যাংকের নগদ টাকার সংকট চলছে, সেখানে দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানোর জন্য টাকা দরকার। ৬ শতাংশ সুদে আমানত আসবে, এই আশায় বসে থাকলে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে। তার মতে, এতোদিন যে সব ব্যাংক ১১ শতাংশেরও বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করেছে, সেই সব ব্যাংক ইচ্ছে করলেও সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দিতে পারবে না।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমানত যদি না পাওয়া যায় তাহলে তো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হবে। তবে আমরা বিএবি’র ঘোষণা অনুযায়ী সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনার ব্যাপারে সচেষ্ট।’

প্রসঙ্গত, ব্যাংক ঋণে সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা ওঠে চলতি বছরের শুরুতে। শুধু তাই নয়, সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাংকের মালিকরা বেশ কয়েকটি সুবিধও নিয়েছেন। এরমধ্যে ব্যাংক পরিচালকদের মেয়াদ ও সংখ্যা দুটোই বাড়িয়ে নিয়েছেন। ব্যাংকের করপোরেট কর আগের চেয়ে আড়াই শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিএবি’র চাহিদা অনুযায়ী সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা; সিআরআর ১ শতাংশ হ্রাস; ঋণ আমানতের হার (এডিআর) সমন্বয়সীমার সময় বাড়ানো এবং রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২ জুলাই বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ৬ শতাংশ সুদে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পড়ে থাকা অলস’ টাকা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। এরপরও সব ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামেনি।

অবশ্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের চাপে গত ২০ জুন বিএবি ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। সে অনুযায়ী গত ১ জুলাই থেকে সব ঋণে সর্বোচ্চ সুদহার হওয়ার কথা ৯ শতাংশ।

এর আগে গত মার্চ মাসে বেসরকারি ব্যাংকের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতারা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গত ৩০ মার্চ সুদের হার কমিয়ে আনার শর্তে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বিএবি’র কার্যালয়ে সংগঠনটির নেতাদের এক বৈঠকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ওই বৈঠকে বলা হয়, ব্যাংকগুলো এপ্রিল মাস থেকেই এক অঙ্কের সুদে ঋণ দিতে পারবে। এজন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের ৫০ শতাংশ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা এবং ব্যাংকগুলোর নগদ জমার অনুপাত কমানোর কথা বলা হয়েছে। ওই বৈঠকে ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণ (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর) কমানোরও সিদ্ধান্ত হয়। ওই দিন বিএবি চেয়ারম্যান ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার সাংবাদিকদেরকে বলেন, ‘তিন মাসের মধ্যে (২০১৮ সালের জুন মাসের আগেই) সুদের হার এক অঙ্কে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনা হবে।’

বৈঠকের একদিন পর অর্থাৎ ১ এপ্রিল রাজধানীর একটি হোটেলে জনতা ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে বিএবি’র সেই প্রতিশ্রুতির বিষয়টি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, এক মাসের মধ্যে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হবে।

এর আগে ১৪ মার্চ আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ব্যাংকের ঋণের সুদহার এক অঙ্কে কমিয়ে আনার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে বাংলা নববর্ষের আগের দিন গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) কাছ থেকে অনুদান নেওয়ার সময় তিনি আবারও সুদ হার এক অঙ্কে কমিয়ে আনার তাগিদ দেন।

Print