রাসিক নির্বাচন: জনপ্রিয়তার শীর্ষে লিটন তবে বাধা বিতর্কিতরা

June 5, 2018 at 11:54 am

নিজস্ব প্রতিবেদক:

১৯৯০ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন গঠনের পর এ পর্যন্ত চারটি নির্বচান অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে তিন বরাই মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা। আর মাঝে ২০০৯ সালের নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীনত প্রার্থী বর্তমান মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন।

নগরবাসী মনে করেন, বিএনপি থেকে সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু (দুই বার) ও বর্তমান মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল তিনবার নির্বাচিত হয়ে প্রায় ১৯ বছর ক্ষমতায় থেকে রাজশাহী নগরীর যে উন্নয়ন না করেছেন, মাঝে ৫ বছরের ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন একবার নির্বাচিত হয়ে তার চেয়েও বেশি কাজ করেছেন। তার সময়কালেই রাজশাহী হয়েছে ঝকঝকে চকে নগরী। ফলে আগামী ৩০ জুলাইয়ের নির্বাচনে লিটনের সেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই সামনে নিয়ে আসছেন সাধারণ ভোটাররা। এবার যেসব প্রার্থীদের নাম এরই মধ্যে শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন লিটন।

পাশাপাশি বিগত কয়েক বছরে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কিছুটা হলেও বিপাকে ফেলবে লিটনকে-এমনটিও মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।

আবার দলের একটি অংশের নেতাকর্মীরা মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে এখনো ভিতরে ভিতরে ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন। এসব বিষয়ও আসছে সামনে। ফলে আগামী নির্বাচনে এখানে আওয়ামী প্রার্থীর বিজয়ী করেত হলে এসব বিষয়ও মাথায় রেখেই এগোতে হবে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগেরই শুভাকাঙ্খিরা।

দলীয় সূত্র মতে, সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে সভাপতি ও ডাবলু সরকারকে সাধারণ সম্পাদক করে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। এর প্রায় এক বছরের মাথায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। সেই থেকে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো বিরোধীতা দেখা যায়নি। এমনকি এই সময়ের মধ্যে নগরীতে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের মধ্যেও কখনো কোনো কোন্দল প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তবে মহানগর আওয়ামী লীগের ওই কমিটি গঠনের পর থেকেই সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে এখনো দলের একটি অংশের নেতাকর্মীরা ভিতরে ভিতরে ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন। যদিও তরুণ সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারকে নিয়ে দলকে এরই মধ্যে আগের চেয়ে অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছেন সভাপতি ও আগামী সিটি নির্বাচনের মেয়র প্রার্থী এইএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন।

ফলে মহানগর আওয়ামী লীগের ভিতরে ভিতরে পদ ও বিভিন্ন বিষয়ে কিছুটা দ্বন্দ্বের কথা শোনা গেলেও তা প্রকাশ্যে রুপলাভ করেনি। এতে করে গত দুটি সিটি নির্বাচনের চেয়ে এবার আওয়ামী লীগ অনেকটা সুসংগঠিত এবং মজবুত অবস্থায় আছে। আবার ব্যক্তি লিটনের ইমেজও এবার নির্বাচনে ভোটারদের বেশি আকর্ষণ করছে। তার পরেও ওয়ার্ড পর্যায়ের এবং মহানগর আওয়ামী লীগের কিছু বিতর্কিত নেতাদের কারণে কিছুটা হলেও বাধারমুখে পড়বেন লিটন-এমটিও মনে করছেন অনেকেই।

গত ২৯ মে নির্বাচনের দিন ঘোষণা হওয়ার পর ওয়ার্ড পর্যায়ে কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ গত ২ মে রাতে মহাননগর আাওয়ামী লীগের ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয়ে ভাংচুরের ঘটনাও ঘটে। তবে এসবই ছোট ছোট বিষয়। আগামী সিটি নির্বাচনে এবার লিটনকে মেয়র নির্বাচিত করতে পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গোটা নগরজুড়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

নগরজুড়ে এরই মধ্যে নগরবাসীর প্রতি লিটনকে মেয়র নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে ছেয়ে দেওয়া হয়েছে। নগরজুড়ে লিটনময় অবস্থায় পরিণত হয়েছে।

নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা মজিবুর রহমান বলেন, আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এবার লিটনকে ঠেকানোর কোনো প্রার্থী রাজশাহীতে নাই। তার পরেও কিছু বিতর্কিত নেতাকর্মী, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাই মামলার আসামি থেকে শুরু করে নানা কর্মকা-ে বিতর্কিতরা লিটনের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। এটি সাধারণ ভোটারদের অনেকেই খারাপ চোখে দেখছেন। এসব বিতর্কিতদের মাঠে না নামিয়ে লিটন একাই যদি প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যান, তাও তিনি এবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন। কাজেই বিতর্কিতদের প্রচারণার সুযোগ না দিয়ে যাদের সুনাম আছে, তাদেরকে দিয়েই প্রচারণা চালাতে হবে। তাহলে যেটুকু দুর্বলতা আছে, সেটুকুও আর থাকবে না। সাধারণ ভোটাররা লিটনকে ভোট দিতে উদগ্রিব হয়ে আছেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ‘ব্যক্তি লিটন রাজশাহীর জন্য যা করেছেন-তা নগরবাসী ভুলতে পারবেন না। এটিই আমাদের জন্য বড় কাজে দিচ্ছে নির্বাচনে। সাধারণ ভোটাররাও এই বিষয়টি এগিয়ে রাখছেন। কিন্তু দলের মধ্যেই অনেকে আছেন এলাকাভিত্তিক বিতর্কিত। তাদের নিয়ে প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে আমাদের আরো ভাবতে হবে। প্রয়োজনে তাদের বাদ দিয়েই আমাদের প্রচারণা চালাতে হবে। তা না হলে পচা শামুকেও পা কাটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এসব নিয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের উপ-প্রচারবিষয়ক সম্পাদক মীর ইশতিয়াক আহমেদ লিমন বলেন, ‘আমাদের দলের মধ্যে কোনো কোন্দল নাই। আগামী নির্বাচনে লিটন ছাগা কাউকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে কল্পনাও করছি না। ফলে আগামী সিটি নির্বাচন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হিসেবে আমরা লিটনকেই সামনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছি। তাঁর বিগত সময়ের উন্নয়ন কর্মকা-গুলো এবং আগামী তিনি মেয়র নির্বাচিত হলে নগরবাসীর জন্য কি করবেন-সেটি সামনে রেখে আমরা প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি জনগণ গত নির্বাচনে যে ভুল করেছেন, আগামী নির্বাচনে সেই ভুল আর করবেন না।’

লিমন বলেন, ‘লিটনের আমলে নগরীতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে সে অনুযায়ী নগরবাসী হয়েছে বঞ্চিত। এটা এখন নগরবাসী উপলব্ধি করতে পারছেন। তাই আগামী নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররাও চাইছেন লিটন মেয়র নির্বাচিত হোক।’
জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক শফিকুর রহমান বাদশা বলেন, ‘আমরা আগের চেয়ে অনেক সংগঠিত। এবার নির্বাচনে লিটনকে জয়ী করতে আমরা সবাই একযোগে কাজ করছি। মাঠপর্যায়েও সবাই যে যার অবস্থান থেকে কাজ করছে। কাজেই আগামী নির্বাচনে এবার আমরাই জয়ী হব বলে আশা করি। তার পরেও দলের মধ্যে যারা বিতর্কিত তাদের নিয়ে প্রচারণা চালাতে গেলে অনেক হিসেব-নিকেশ করে মাঠে নামতে হবে।’

শফিকুর রহমান বাদশা বলেন, ‘গোটা নগরজুড়ে সব নেতাই যে সবারকাছে সমান গ্রহণযোগ্যতা আছে-তা নয়। কারণ এলাকাভিত্তিক কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, সেসব এলাকায় নেতাকর্মী দিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। তাহলে আমরাদের যেটুকুর দুর্বল দিক আছে-সেটিও আমরা নির্বিঘেœ কেটে উঠে নির্বাচনে জয়ী হবো আশা করি।’

সাবেক মেয়র ও রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, দলীয় সভানেত্রীর সবুজ সংকেত পেয়ে আমি গত প্রায় ছয় মাস ধরে নির্বাচনের মাঠে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের নেতাকর্মীরাও নির্বাচনের জন্য এরই মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে রেখেছেন। সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা পাড়া-মহল্লায় এরই মধ্যে সভা-উঠানবৈঠক থেকে শুরু করে নানা কমসূচি পালন করেছি। সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশিও আমরা নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়েছি। কাজেই আমরা সিটি নির্বাচন করতে প্রস্তুত। আমাদের নেতাকর্মীর্ওা এ নির্বাচন ঘিরে উন্মুখ হয়ে আছেন।’

লিটন আরো বলেন, গত ৫ বছর দরে রাজশাহীবাসী উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে। এই ভুল নগরবাসী এখন বুঝতে পারছে। নগরবাসী এবার আর দ্বিতীয় ভুল করতে চায় না। তাই উন্নয়নের স্বার্থে নির্বাচনের জন্য নগরবাসীও প্রস্তুত হয়ে আছে। তাদের নিকট থেকে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো কোন্দল নাই। রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ একটি অন্যতম সংগঠিত দল। ফলে সকল নেতাকর্মী এবার মাঠে নেমে গেছেন। তারা সবাই যে যার অবস্থান থেকে প্রচারণা চালাচ্ছেন। যেটি গত নির্বাচনে ঘাটতি ছিল। এবার সবাই আমার হয়ে কাজ করছেন। আশা করি এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেই আগামী নির্বাচনে আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনব।’

স/আর

Print