‘অসুস্থ স্ত্রীর তৃষ্ণা মেটাতে পানি দিতে পারিনি’

February 28, 2018 at 10:08 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

রাশেদা বেগম ক্ষুব্ধ হয়েই বললেন, ‘৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে (প্রসূতি ওয়ার্ড) আমার মেয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। কিন্তু ব্যবহৃত একটি স্যালাইন ফেলে দিতে বলায় আয়া আমার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছেন, তা আমি মুখে আনতে পারব না। আমাকে চুল ধরে বের করে দেবেন বলেছেন।’

আনোয়ারা উপজেলার জামাল উদ্দিন গতকাল মঙ্গলবার রাতে কর্তব্যরত দারোয়ানকে ৬০ টাকা দিয়েও পানি নিয়ে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন স্ত্রীকে খাবার পানি পৌঁছে দিতে পারেননি। জামালের অভিযোগ, ‘চিকিৎসাধীন স্ত্রীর শয্যাপাশে কেউ ছিলেন না। অসুস্থ স্ত্রীর তৃষ্ণা মেটাতে পানি দিতে পারিনি। পানি নিয়ে ঢুকতে চাইলে দারোয়ান বেশি টাকা দাবি করেন।’

বুধবার বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সেবা গ্রহীতাদের পরামর্শ ও অভিযোগের ওপর গণশুনানিতে এসব অভিযোগ করেন রোগীর স্বজনেরা। রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার, টাকা দাবি, চিকিৎসক-নার্সদের অবহেলা, দালালদের দৌরাত্ম্যসহ হাসপাতালটির সেবা নিয়ে নানা অভিযোগ উঠে আসে সেবাপ্রার্থীদের বক্তব্যে।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থার পাশাপাশি জনবল এবং অবকাঠামো সংকটকে বড় করে দেখছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন বিভিন্ন অভিযোগের জবাবে বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অবকাঠামো ও জনবল-সংকট রয়েছে। এর মধ্যে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীসহ সেবা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের গণশুনানি করার অর্থই হলো সেবা আরও সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য করা।

রাশেদার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিচালক গণশুনানিতে উপস্থিত ওয়ার্ড মাস্টার রাজীব দেকে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরিচালক রাশেদাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ওই আয়াকে বরখাস্ত করা হবে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ শুনে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন। ছবি: জুয়েল শীলএকইভাবে জামাল উদ্দিনের কাছ থেকে টাকা নেওয়া দারোয়ানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

মহেশখালীর ইদ্রিস মিয়া নামের এক যুবক অভিযোগ করে বলেন, তাঁর স্ত্রীর সিজার হয়েছে এক মাস আগে। কিন্তু এখনো সুস্থ হয়নি। অস্ত্রোপচারের স্থানে সংক্রমণ হয়েছে। ওষুধ দেওয়ার পর এখনো সুস্থ হননি। এর জবাবে গণশুনানিতে উপস্থিত প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাহানারা চৌধুরী বলেন, শয্যার চেয়ে বেশি রোগীর চিকিৎসা দিতে হয়। এ জন্য অনেক রোগীর সংক্রমণ হয়ে যায়। তারপরও কীভাবে এ রোগীকে সুস্থ করা যায় তা দেখব।

ফাতেমা বেগম নামে কালুরঘাট থেকে আসা এক নারী গতকাল বুধবার বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে যান। এ সময় বহির্বিভাগের চিকিৎসক তাঁকে কিছু পরীক্ষা করাতে বলেন। চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর হাসপাতালের কোথায় পরীক্ষা করাতে হয় জানতে চাইলে ওই নারীকে এক যুবক প্রধান সড়কের বেসরকারি পরীক্ষাগারে নিয়ে যান।
গণশুনানিতে অভিযোগ শুনে পরামর্শ চিকিৎসকেরা। ছবি: জুয়েল শীলফাতেমা গণশুনানিতে অভিযোগ করেন, গরিব মানুষ বলে হাসপাতালে কম টাকায় কীভাবে পরীক্ষা করা যায় তা চেয়েছি। কিন্তু বাইরের বেসরকারিতে পরীক্ষা করাতে নিয়ে যায় এক যুবক।

এ বিষয়ে মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা কামরুল হাসান লোহানী বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে উনি দালালের খপ্পরে পড়েছেন। যদি ওই যুবককে শনাক্ত করা যায়, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গণশুনানিতে রমজান আলী নামের এক বৃদ্ধ বলেন, তাঁর নাতিকে দুদিন আগে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু কোনো বড় চিকিৎসক দেখেননি।

জবাবে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক প্রণব কুমার চৌধুরী বলেন, যত রোগী ভর্তি হয়, সবাইকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। যদি জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের দেখার প্রয়োজন হয়, তাহলে তাঁরা অবশ্যই দেখবেন।

গণশুনানিতে অন্তত ১০ জন তাঁদের অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন হৃদ্‌রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক প্রবীর দাশ, রেডিওলজি বিভাগের প্রধান সুবাস মজুমদার, মেডিসিন বিভাগের প্রধান অশোক দত্ত হাসপাতালের উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম প্রমুখ গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন।

পরিচালক জালাল উদ্দিন বলেন, হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ বাক্স রাখা হয়েছে। এসব বাক্সে অভিযোগ ফেলতে পারবে। এসব অভিযোগ নিয়ে পরে সভাকক্ষে শুনানি করা হবে। এ ছাড়া ২৭ মার্চ দুদকের উপস্থিতিতে শাহআলম বীর উত্তম মিলনায়তনে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

সূত্র: প্রথম আলো

Print