লাইফ স্টাইল

হোম আইসোলেশনে করণীয়

নিউজ ডেস্ক২৮ এপ্রিল ২০২০৮ মিনিট পড়া

বাংলাদেশে প্রতিদিন বাড়ছে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এই সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে আতঙ্ক এখন চরমে। তবে কভিড-১৯ পজিটিভ হলেই যে সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে এমন নয়।

পরিসংখ্যান বলছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের ৮০ শতাংশই, যাঁদের কোনো উপসর্গ নেই অথবা মৃদু উপসর্গ আছে, তাঁরা বাসায় আইসোলেশনে থেকে, সঠিক নিয়ম-কানুন মেনে, বিশ্রাম নিয়ে এবং চিকিৎসকের নিদের্শনা অনুযায়ী লক্ষণনির্ভর চিকিৎসা গ্রহণ করে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করতে পারেন।

১০-১৫ শতাংশ রোগীর শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় এবং ৫-৬ শতাংশ রোগীর আইসিইউর প্রয়োজন হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মৃদু উপসর্গের কডিভ রোগীদের বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করেছে।

 

হোম আইসোলেশন যাঁদের জন্য

করোনাভাইরাসের জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার পর কোনো ব্যক্তিকে পরিবারের অন্য সবার থেকে আলাদা হয়ে পৃথক রুমে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে রেখে চিকিৎসা গ্রহণের পদ্ধতিকেই বলে ‘হোম আইসোলেশন’। হাসপাতালগুলো এখন যেহেতু ইনফেকশনের উৎস, সেহেতু হোম আইসোলেশনে থাকাটাই কভিড আক্রান্ত রোগীদের জন্য এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ভালো পদক্ষেপ। এর জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক মনোবল ও সাহস।

কভিড আক্রান্ত নিম্নোক্ত রোগীরা হোম আইসোলেশনে থাকতে পারেন—

► কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি, যাঁরা অন্য কারো সংস্পর্শে না এসে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবেন। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাময়িক সাহায্যের জন্য পরিবারের একজন সদস্য, যিনি সুস্থ, যাঁর দীর্ঘমেয়াদি রোগ নেই, এমন একজন আক্রান্ত ব্যক্তির পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

► যদি আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে কোনো রোগের উপসর্গ না থাকে অথবা প্রাথমিক মৃদু উপসর্গ—যেমন জ্বর, সর্দি, শুকনো কাশি, গলা ব্যথা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘরেই চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন।

► যদি আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেমন—ফুসফুসের রোগ, হাঁপানি, সিওপিডি, ক্রনিক ব্রংকাইটিস, ব্রংকিয়েকটেসিস, কিডনির সমস্যা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের রোগ ইত্যাদি না থাকে।

 

হোম আইসোলেশন যাঁদের জন্য নয়

► কভিড-১৯ আক্রান্ত বৃদ্ধ রোগী।

► আক্রান্ত ব্যক্তি, যাঁদের জটিল শারীরিক লক্ষণ, যেমন— শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভব করা, তীব্র কাশি, নিউমোনিয়া, সারা শরীরে ব্যথা রয়েছে, তাঁরা।

► আক্রান্ত ব্যক্তি, যাঁদের তীব্র ডায়রিয়া অথবা বমির উপসর্গ আছে এবং যাঁদের রক্তে ইলেকট্রলাইটের মাত্রা নিরূপণ এবং শরীরে স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে।

► আক্রান্ত ব্যক্তি, যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ জটিল পর্যায়ে আছে, যেমন—ফুসফুসের রোগ, হাঁপানি, সিওপিডি, ক্রনিক ব্রংকাইটিস, ব্রংকিয়েকটেসিস, হার্টের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, ক্যান্সারের রোগী।

 

হোম আইসোলেশনে করণীয়

► যে ঘরে জানালা আছে এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে, আক্রান্ত ব্যক্তি বাড়ির এমন একটি ঘরে আইসোলেটেড থাকবেন। ঘরটিতে কার্পেট এবং বাড়তি আসবাব থাকলে সেগুলো সরিয়ে ঘরটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে গুছিয়ে দিতে হবে। ঘরসংলগ্ন বাথরুম থাকা বিশেষ জরুরি।

► ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখতে হবে। পরিচর্যাকারী ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা যেন কখনো সেই ঘরে প্রবেশ না করে অথবা আক্রান্তকে বাইরে থেকে দেখতে যেন কেউ না আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

► ঘরে প্রয়োজনীয় সামগ্রী, যেমন—মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, ওষুধপত্র, টিসু বক্স, গ্লাস—এগুলো রাখতে হবে, যেন প্রয়োজনের সময় হাতের কাছে পাওয়া যায়।

► আক্রান্ত ব্যক্তি ঘরে বসেই যেন পানি গরম করে নিয়মিত গার্গল করতে পারেন, স্টিম ভ্যাপার নিতে পারেন, আদা-লেবু, টি-ব্যাগ দিয়ে চা তৈরি করে খেতে পারেন, এ জন্য ঘরে ইলেকট্রিক কেটলি দেওয়া যায়।

► ঘরে আবর্জনা, ব্যবহৃত টিস্যু, মাস্ক, গ্লাভস ছড়িয়ে ছিটিয়ে না রেখে মুখবন্ধ বিনে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে রাখতে হবে। ব্যাগটি পূর্ণ হলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে গ্লাভস পরে ব্যাগটির মুখ বন্ধ করে ব্যাগের বাইরে জীবণুনাশক হাইপোক্লোরেট সলিউশন ছিটিয়ে রেখে দেবেন। পরিচর্যাকারীকে হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক পরে ওই ব্যাগ সংগ্রহ করে নিয়ে মুখবন্ধ অবস্থায় ওই ব্যাগ ভর্তি আবর্জনা মাটিতে পুঁতে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

► দৈনিক পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন বিধায় ঘরেই বড় কনটেইনারে পানি রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

► কিছু প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সরঞ্জাম, যেমন— থার্মোমিটার, ডিজিটাল রক্তচাপ পরিমাপক যন্ত্র, সম্ভব হলে পালস অক্সিমিটার, ডায়াবেটিস থাকলে স্ট্রিপসহ গ্লুকোমিটার (হাইপোগ্লাইসেমিয়ার সতর্কতার জন্য গ্লুকোজ অথবা চিনি) দেওয়া আবশ্যক।

► ঘরের টেবিল, ব্যবহৃত স্পর্শকাতর জিনিসপত্র, মোবাইল, ল্যাপটপ, দরজার নব অথবা হ্যান্ডেল, লাইটের সুইচ ৭০ শতাংশ অ্যালকোহল দিয়ে প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হবে।

► আক্রান্ত ব্যক্তিকে সম্ভব হলে নিজে অথবা পরিচর্যাকারীর সাহায্য নিয়ে প্রতিদিন জীবাণুনাশক ব্লিচিং পাউডার পানিতে মিশিয়ে গ্লাভস পরে ঘরের মেঝে, বাথরুম পরিষ্কার করতে হবে।

► প্রতিদিন গোসলের সময় পরিহিত কাপড়, তোয়ালে এবং সপ্তাহে দুইবার বিছানার চাদর, বালিশের কাভার গরম পানি, সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করতে হবে।

 

খাবার ও ওষুধ

► প্রতি বেলার খাবার দেওয়ার সময় পরিচর্যাকারী গ্লাভস, মাস্ক পরে ননটাচ প্রক্রিয়ায় খাবার দেবেন। খাবারের সময় ব্যবহৃত গ্লাস, প্লেট, কাপ রোগী নিজেই গরম পানি, সাবান দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে রাখবেন।

► আইসোলেশনে থাকাকালে প্রোটিনসমৃদ্ধ, হালকা মসলাযুক্ত, সহজপাচ্য, পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। তৈলাক্ত খাবার থেকে বিরত থাকতে হবে।

► প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।

► গরম পানি ফুটিয়ে লবণ দিয়ে দিনে কয়েকবার গার্গল করতে হবে।

► ভিটামিন ‘সি’সমৃদ্ধ খাবার, যেমন—লেবুর শরবত, মাল্টার জুস বেশি পান করতে হবে।

► লবঙ্গ, দারচিনি, গোলমরিচ, আদা, একচিমটি হলুদ গুঁড়া দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ফুটিয়ে মধু মিশিয়ে এই পানীয় গরম করে পান করলে গলা ব্যথা, শুকনো কাশির অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

► আক্রান্ত রোগীর কোনো উপসর্গ না থাকলে ভিটামিন ‘সি’ ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।

► প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের জ্বর, সর্দি ও কাশির সমস্যা থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্যারাসিটামল, ফেক্সোফেনাডিন, মনটিলুকাস্ট খাওয়া যেতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন ভিটামিন ‘সি’ ট্যাবলেট খেতে হবে।

► প্রথম সপ্তাহে ডায়রিয়া, বমি দেখা দিতে পারে। এ সময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, জিংক ট্যাবলেট দিতে হবে।

► হোম আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় সাত দিনের পরও জ্বর না সারলে, কাশির তীব্রতা বেড়ে গেলে, শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা বা শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ অনুভব করলে, হঠাৎ অচেতন হয়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

 

আরো যা করণীয়

► কডিভ-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি দিনে কয়েকবার সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোবেন এবং হাঁচি ও কাশির শিষ্টাচার মেনে চলবেন।

► এই সময়ে উদ্বিগ্ন থাকা স্বাভাবিক, তবে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা করতে হবে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।

► দিনে কয়েকবার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে হবে।

► ঘরের মধ্যে হাঁটা, যোগাসন অথবা হালকা ব্যায়াম করা উচিত।

► সারাক্ষণ টিভিতে করোনাবিষয়ক সংবাদ, আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা দেখলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দিনে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট এসব সংবাদ দেখা যেতে পারে।

► ধর্মকর্মে মনোনিবেশ করলে এই সময়ে দুশ্চিন্তা কম হবে। নামাজ পড়লে, কোরআন তিলাওয়াত করলে মানসিক শক্তি ফিরে আসবে। পাশাপাশি গল্পের বই পড়া, পছন্দসই গান শোনা যেতে পারে।

► পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম এই সময়ে খুব বেশি প্রয়োজন, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়ক।

► একাকিত্ব কাটানোর জন্য এবং মানসিকভাবে নিজেকে চাঙ্গা রাখার জন্য অবসরে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা যেতে পারে।

 

পরিচর্যাকারীর করণীয়

► পরিচর্যাকারীর দায়িত্ব যিনি পালন করবেন তাঁকেও বাড়ির অন্য সদস্যদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। সম্ভব হলে পরিচর্যাকারী একটি পৃথক ঘরে থাকবেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাওয়ার জন্য ডাইনিং টেবিলে না গিয়ে তাঁর রুমে খাবেন। ব্যবহৃত তোয়ালে, টয়লেট্রিজ সামগ্রী, যেমন—টুথপেস্ট, সাবান, শ্যাম্পু অন্য কারো সঙ্গে শেয়ার করবেন না।

► পরিচর্যাকারীকে রোগীর সংস্পর্শে যাওয়ার সময় প্রতিবার প্রয়োজন অনুযায়ী পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট, যেমন—গ্লাভস, মাস্ক, হেড কাভার, গগল্স, জুতার কাভার পরে যেতে হবে।

► পরিচর্যাকারী রোগীর ঘরে যখন প্রবেশ করবেন তখন রোগীকে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

► রোগীর রুম থেকে বেরিয়ে পরিচর্যাকারী একটি নির্দিষ্ট স্থানে তাঁর প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট সাবধানে খুলে প্লাস্টিকের ব্যাগে ঢুকিয়ে ব্যাগের মুখ বন্ধ করে জীবাণুনাশক ব্লিচিং সলিউশন ব্যাগে এবং যে স্থানে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন সেই স্থানের মেঝেতে ছিটিয়ে দেবেন।

► রোগীর সংস্পর্শ থেকে ফিরে ভালো করে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে এবং গোসল করে নিজের কাপড় গরম পানি, সাবান দিয়ে ভালো করে ধুতে হবে।

► পরিচর্যাকারী গ্লাভস পরে আক্রান্ত ব্যক্তির ঘরের বাইরের দরজার নব, হ্যান্ডেল ৭০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত সলিউশন দিয়ে প্রতিদিন কয়েকবার মুছে রাখবেন।

 

কভিড সংক্রমণ নেই বোঝার উপায়

► কভিড সংক্রমিত রোগী, যাঁদের জ্বর ছিল তিন দিন (৭২ ঘণ্টা), কোনো জ্বরের ওষুধ ব্যবহার ছাড়াই এখন তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রায় থাকলে।

► আক্রান্তদের কাশি, শ্বাসকষ্ট ছিল অথচ এখন আর নেই।

► প্রথম উপসর্গ প্রকাশের দিন থেকে অন্তত সাত দিন অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু জটিলতা দেখা দেয়নি।

► পর পর দুইবার অন্তত ২৪ ঘণ্টার বেশি বিরতিতে যদি ‘নেজোফেরিনজিয়াল সোয়াব’-এর পিসিআর রিপোর্ট নেগেটিভ আসে।

 

মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেই মৃত্যু বিভীষিকা, আইসিইউ বা ভেন্টিলেটরের আতঙ্ক নয়। সব নেতিবাচক ভাবনা ছেড়ে সাহস আর ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা আর দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে করোনা মহামারিকে মোকাবেলা করা উচিত। এই ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার এবং এর সাফল্যজনক প্রয়োগের প্রতীক্ষায় এখন বিশ্ব; হয়তো সেটি সফলও হবে।

 

সুত্রঃ কালের কণ্ঠ