সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয় শিশুরা, অথচ এর সবচেয়ে কঠিন মূল্য দিতে হচ্ছে তাদেরই। তীব্র তাপপ্রবাহ, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে বিপর্যস্ত হচ্ছে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা।
গত দুই বছরে বাংলাদেশের ৩৮ জেলার ৯৬ শতাংশ শিশু অন্তত একটি দুর্যোগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। দুর্যোগ বা তাপপ্রবাহের পর অসুস্থ হয়েছে ৮০ শতাংশ শিশু। আবহাওয়াজনিত কারণে গত এক বছরে বিদ্যালয়ে পড়ুয়া ৪৯ শতাংশ শিশুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছিল। শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের এমন উদ্বেগজনক প্রভাব উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের এক জরিপে।

আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলন কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজের (কপ৩১)। এ সম্মেলন সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জরিপের তথ্য তুলে ধরে সেভ দ্য চিলড্রেন। একই সঙ্গে জলবায়ু আলোচনায় শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং তাদের কাছে পৌঁছায় এমন অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বিশ্বনেতা ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
জরিপটি পরিচালিত হয় গত ৯ থেকে ১৭ অক্টোবর।
এতে ৩৮টি জেলার জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১ হাজার ৩৭৫ শিশুর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। জরিপ পরিচালনায় অংশ নেয় ন্যাশনাল চিলড্রেনস টাস্কফোর্সের (এনসিটিএফ) ১৭২ জন শিশু গবেষক। জরিপের আওতায় ছিল উপকূলীয় গ্রাম, নদীবেষ্টিত চর, হাওর, পার্বত্য অঞ্চল, চা-বাগান ও শহরের বস্তি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে অংশগ্রহণকারী ৯৬ শতাংশ শিশু অন্তত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। সবচেয়ে বেশি শিশুর অভিজ্ঞতায় এসেছে তীব্র তাপপ্রবাহ, যার হার ৫৫ শতাংশ।
এরপর রয়েছে বন্যা, ৪২ শতাংশ।
জলবায়ু দুর্যোগের প্রভাব পড়ছে শিশুদের শিক্ষাজীবনেও। গত এক বছরে দুর্যোগ বা আবহাওয়াজনিত কারণে বিদ্যালয়ে পড়ুয়া ৪৯ শতাংশ শিশুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছিল। অনুপস্থিতির হিসাব দেওয়া ৬১৭ শিশু মোট ৭ হাজার ৫৬৭ শিক্ষাদিবস হারিয়েছে। অর্থাৎ দুর্যোগের কারণে শুধু বিদ্যালয় বন্ধ থাকছে না, দীর্ঘ হচ্ছে শিশুদের শিক্ষার ক্ষতিও। অথচ মাত্র ৩৫ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তাদের বিদ্যালয়ে দুর্যোগের সময় কী করণীয়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম নয়। জরিপে অংশ নেওয়া ৮০ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, দুর্যোগ বা তাপপ্রবাহের পর তারা অসুস্থ হয়েছে। এ ছাড়া ৫৩ শতাংশ শিশু নিরাপদ পানীয় জল পেতে সমস্যার মুখে পড়েছে। অর্থাৎ দুর্যোগের অভিঘাত কাটার পরও বিশুদ্ধ পানির অভাব ও অসুস্থতা শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সতর্কবার্তা পৌঁছায় না শিশুদের কাছে
দুর্যোগ মোকাবেলায় আগাম সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অধিকাংশ শিশুর কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না। জরিপে দেখা গেছে, সর্বশেষ দুর্যোগের আগে মাত্র ২৫ শতাংশ শিশু আগাম সতর্কবার্তা পেয়েছে এবং তা বুঝতে পেরেছে। বিপরীতে ৪৮ শতাংশ শিশু কোনো সতর্কবার্তাই পায়নি। ফলে দুর্যোগের আগে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে অনেক শিশু।
দুর্যোগের প্রভাব শিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ তৈরি করছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৭ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, দুর্যোগের পর তাদের এলাকায় বাল্যবিবাহ বেড়েছে। উপকূলীয় এলাকায় এ হার ৭২ শতাংশ। অন্যদিকে দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার করা ৫৬১ শিশুর মধ্যে ৬৩ শতাংশ জানিয়েছে, সেখানে মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার বা নিরাপদ স্থান ছিল না।
জলবায়ু পরিবর্তনের মানসিক প্রভাবও উঠে এসেছে জরিপে। এতে অংশ নেওয়া ৬৪ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কথা ভাবলে তারা ভয় পায়। বিপরীতে মাত্র ৪ শতাংশ শিশু আশাবাদী বোধ করে। অথচ বিদ্যালয় বা স্থানীয় সরকার কখনো দুর্যোগ পরিকল্পনা নিয়ে তাদের মতামত জানতে চায়নি, এমন শিশুর হার ৮১ শতাংশ। একই সঙ্গে ৮১ শতাংশ শিশু জলবায়ু কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিজেদের কাছে অর্থায়ন পৌঁছানোর দাবি জানিয়েছে।
ঝুঁকিতে পিছিয়ে থাকা শিশুরা
জরিপে দেখা গেছে, জলবায়ু সংকটের প্রভাব সব শিশুর ওপর সমানভাবে পড়ছে না। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় ৮৩ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, দুর্যোগের পর তাদের পরিবারের আয় কমে গেছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাজীবন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও অন্য শিশুদের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। জরিপে প্রতিবন্ধী শিশুদের ৫৪ শতাংশের শিক্ষা বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সব শিশুর ক্ষেত্রে এ হার ২৫ শতাংশ।
সেভ দ্য চিলড্রেনের মতে, শিশুরা জলবায়ু সংকট তৈরি করেনি, কিন্তু এর প্রভাব মোকাবেলার জন্য তাদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। নিরাপদ বিদ্যালয়, বিশুদ্ধ পানি, শিশুদের বোধগম্য আগাম সতর্কবার্তা, অসুস্থ হলে চিকিৎসা এবং নিজেদের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে মতামত দেওয়ার সুযোগ তাদের প্রধান চাহিদা।
কপ৩১-এ পাঁচ দফা দাবি
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠেয় কপ৩১ সম্মেলনে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ফলাফল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ুবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিশুদের অধিকার, চাহিদা ও মতামত অন্তর্ভুক্ত করে স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ; স্বাস্থ্য, পানি, পুষ্টি, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় শিশু-কেন্দ্রিক অভিযোজন কার্যক্রম; জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা; দুর্যোগে শিশুদের শিক্ষাজীবন, বাস্তুচ্যুতি, বাল্যবিবাহ ও মানসিক ক্ষতিকে লস অ্যান্ড ড্যামেজের আওতায় স্বীকৃতি দেওয়া এবং শিশুদের কাছে পৌঁছানো জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০০৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রধান বহুপক্ষীয় জলবায়ু তহবিলগুলোর মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থায়ন শিশু-সংবেদনশীল উদ্যোগে সহায়তা করেছে। এ অর্থায়ন অন্তত দ্বিগুণ করা এবং শিশু ও তরুণদের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের জন্য বিশেষ অর্থায়নের সুযোগ তৈরির আহ্বানও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ৫ প্রস্তাব
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দাবির পাশাপাশি দেশের ভেতরেও পাঁচটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। এগুলো হলো তীব্র তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করে দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশে অন্তর্ভুক্ত করা, জলবায়ু-সহনশীল বিদ্যালয় গড়ে তোলা, দুর্যোগের পর শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, দুর্যোগের আগে ও পরে শিশুদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং জলবায়ুবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিশুদের অংশগ্রহণ ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
সংস্থাটির প্রস্তাব অনুযায়ী, তাপপ্রবাহের সতর্কতা ও বিদ্যালয়ের সময়সূচি নির্ধারণের পাশাপাশি শিশুদের বোধগম্য ভাষায় আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে হবে। দুর্যোগে বিদ্যালয় বন্ধ থাকলে শিক্ষার ক্ষতি পূরণে অর্থায়ন করতে হবে। প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার ও নিরাপদ স্থান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আগাম সতর্কবার্তার সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম যুক্ত করে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুসন্তান রয়েছে এমন পরিবারকে সাত দিনের মধ্যে নগদ অর্থ বা খাদ্য সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত বলেন, ‘বাংলাদেশের শিশুরা এই সংকট সৃষ্টির জন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়, অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। জরিপে তাদের সুনির্দিষ্ট চাহিদাগুলো উঠে এসেছে; এসব চাহিদা ও সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের।’
তিনি বলেন, গত দুই বছরে ৯৬ শতাংশ শিশু অন্তত একটি দুর্যোগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। শুধু এই পরিসংখ্যানই পদক্ষেপ নেওয়ার জরুরি আহ্বান জানায়। কপ৩১ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে জাতীয় প্রেক্ষাপটগুলো বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো কিভাবে বৈশ্বিক অঙ্গীকারের অংশ হতে পারে, তা দেখতে হবে। যাতে জলবায়ু ও অর্থায়নবিষয়ক সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে শিশুদের কাছে পৌঁছায়।
সুমন সেনগুপ্ত আরো বলেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি দায়িত্ব।









