সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

গভীর সমুদ্রে যাত্রার প্রস্তুতির সময় নিজেদের ঝুঁকি, ভয় ও বিড়ম্বনা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন শঙ্কর কুমার বিশ্বাস (৫৫)।
শঙ্কর একজন বহদ্দারও (নৌকার মালিক)। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই দুর্যোগের কথা মনে হলে এখনো শিউরে ওঠেন তিনি। তারপরও সাগরে যাচ্ছেন।
চলতি মৌসুমে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) বা আগামীকাল মঙ্গলবার নৌকা ভাসাবেন হাজার হাজার জেলে। চলমান নিষেধাজ্ঞা শেষে সব প্রস্তুতি নিয়ে ৩০ অক্টোবর থেকে সাগরে নামবেন তারা।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার মাহামুদকাঠি, হেতামপুর, কাটাখালী, হাবিবনগর, নোয়াকাঠি, রামনাথপুর, কাঠিপাড়ার জেলেপল্লী ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথায় উঠে এসেছে গভীর সাগরে মাছ শিকার, নিরাপত্তাসহ তাদের নানা সীমাবদ্ধতা।
জেলেদের অভিযোগ, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের মৎস্য সেক্টরে অবদান রাখছেন তারা। তবু দীর্ঘদিনেও অবস্থার খুব পরিবর্তন হচ্ছে না। জলদস্যু, ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশ, জলবায়ূ পরিবর্তন ও ঘন ঘন দুর্যোগে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে গত চার বছর ধরে বেসরকারি সংস্থার উদ্যেগে লাইফ জ্যাকেট, রেডিও, জিপিআরএস, বয়া, কম্পাস ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি কিছুটা হলেও সুরক্ষা দিচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ মোট জলসীমার আয়তন এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে মাছধরা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ২০০ মিটার গভীরতার মধ্যে। প্রায় ২৩৭টি শিল্প ট্রলার ও ২৮ হাজার ৫৭৫টি যান্ত্রিক ও প্রচলিত মাছ ধরার নৌযান মাছধরায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামুদ্রিক উৎস থেকে মোট মাছ উৎপাদিত হয়েছে ৬ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ মাছ সমুদ্র থেকে আহরণ করা হয়।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ছিল ৬ দশমিক ২৯ টন, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ৬ দশমিক ৭৯ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৬ টন। এর মধ্যে খুলনায় সামুদ্রিক মাছ আহরণের পরিমাণ ৯ শতাধিক মেট্রিক টন।
বর্তমানে জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪১ হাজার ৬৪৫জন। এর মধ্যে জেলার পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ, রূপসা, ডুমুরিয়া উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে যান। প্রতিবছরই এই সংখ্যা বাড়ছে। শুধু পাইকগাছার ১০টি গ্রামে এ সংখ্যা দেড় হাজার।
বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় প্রায় তিন লাখ জেলের বসবাস। এদের অধিকাংশই ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় সমুদ্র ও উপকূলবর্তী এলাকায় মাছ শিকার করেন।
বোয়ালিয়া গ্রামের মহাদেব বিশ্বাস (৫৬) প্রায় ৪০ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরেন। এবারও সাগরে নামার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে ছুরি, ভেটকি, লইট্ট্রা, চিংড়ি, কাঁকড়া, রূপচাঁদা, বাটা, বাচা, চন্দনা, খল্লা, চেলা, টুনাসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যেতো, কিন্তু দিন দিন এসব মাছের সংখ্যা কমছে।
রাউলির গ্রামের নূর ইসলাম বলেন, এখন আমরা বয়া, লাইফ জ্যাকেট, কম্পাস, রেডিওর ব্যবহার করি। কিন্তু দুর্যোগের চেয়ে বড় ভয় জলদস্যু ও ভারতীয় ট্রলার। অধিকাংশ জেলে বহদ্দরের নৌকায় এক লাখ ২০ হাজার টাকার জায়গায় দুই লাখ চুক্তিতে পাঁচ মাসের জন্য সাগরে যান। এ সময় প্রাণ হাতে থাকে। অথচ জেলেদের জন্য কিছু করা হচ্ছে না।
মাহমুদকাটির মঙ্গল বিশ্বাস, মোংলার মো. ইয়াসিন মোরসালিন এবং বহদ্দার (নৌকার মালিক) প্রদীপ বিশ্বাসের বক্তব্য অনুযায়ী, সাগর থেকে আয় দিন দিন কমছে। জেলেদের বেঁচে থাকা এখন কঠিন। মাছ শিকারে তাদের নিরাপত্তা, আধুনিক কৌশল ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যে না আনলে এ পেশার মানুষের সংখ্যা কমবে।
খুলনা উপকূলীয় এলাকায় পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে সমুদ্রগামী জেলের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে খুলনার বেসরকারি সংস্থা অ্যাওসেড।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালন শামীম আরফীন কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের নানা উদ্যোগে সুনীল অর্থনীতিতে ব্যাপক সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। জলবায়ূ পরিবর্তন মোকাবেলায় সাগরে যাওয়া জেলেদের শতভাগ নিরাপত্তা, ভেটেল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু ও মাছ আহরণে দক্ষ করে তোলা জরুরি।
ইলিশসহ মাছের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ও উৎপাদন বাড়াতে সাগরে মাছ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা চলবে আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। ৩০ অক্টোবর বঙ্গোপসাগরসহ দেশের নদ-নদীতে মাছ ধরতে নামবেন জেলেরা।









