রুপকথা নয়, নির্মম বাস্তবতা!

তাবাসসুম শতাব্দী:

বৃহস্পতিবার (১৯ মে) ক্যাম্পাসে কাজলা গেইট থেকে হল এ আসার পথে University School এর সামনে road side এ একটা দৃশ্যে চোখ আটকে যায়। যদিও দৃশ্যটা চোখে পড়ার মতো কিন্তু অবাক হয়ে খেয়াল করলাম তিনটা মেয়ে ছাড়া আর কারো চোখে পড়ে নাই। আর পড়লেও হয়তো বা দ্রুততার সাথে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে।যে যার রাস্তা মেপেছে।দুপুর তখন সবে মাত্র গড়িয়েছে। তখন ও পূর্ণ বিকাল হয় নি। কত শিক্ষার্থী হেঁটে যাচ্ছিল,, কেউ বা রিকশাতে আবার কেউ বা পারসোনাল কার-এ…।

ঠিক তখন তিনটা মেয়ে একটা রিকশা ঘিরে দাঁড়িয়ে। আমি তাদেরকে ক্রস করতে গিয়ে খেয়াল করলাম, বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা থর থর করে কাঁপতেছে। আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম uncle আপনার কী হয়েছে? তিনি কাঁপতে কাঁপতে বললেন প্রেসার লো। এ জন্যে তার এরকম হচ্ছে। ততক্ষণে সেই তিন জনের কেউ একজন খাবার পানি, কয়েকটা স্যালাইন, একটা ব্রেড, কলা নিয়ে এসেছে। তখন তাদেরকে বললাম আগে স্যালাইন টা বানাও। ওরা স্যালাইন রেডি করছিলো, এই সময় আমার ব্যাগে থাকা কেক বের করে খাইতে বললাম। কিছুটা খাওয়ার পর স্যালাইন খাইতে দেওয়া হলো।

এরপর কলা আর রুটি খাওয়ানো হলো। তখন ও তার শরীর রীতিমতো কাঁপছিল। তখন জিজ্ঞেস করার পর জানলাম প্রেসার লো হওয়ার কারণে তাকে প্রতিমাসে একটা ইঞ্জেকশন নিতে হয় যার দাম ২০০ টাকা।এই ইঞ্জেকশন না নিলেই এমন হয়। এই মাসে টাকার অভাবে তিনি মাত্র ২০০ টাকার ইঞ্জেকশনটা নিতে পারেন নাই। অথচ আমরা উন্নয়ন এর জোয়ারে ভাসতেছি। চোখে রঙিন চশমা পরে এ সব দেখিনা। আজকাল আমরা কেউ খালি পায়ে ঘুরি না। আজকাল উন্নয়ন এর কারণে কেরোসিন এর হারিকেন এর ঠাঁই হয়েছে জাদুঘরে। উন্নয়ন এর বহিঃপ্রকাশ হলো রাস্তা ঘাটে যানযট। আগে রাস্তা ও ছিলো না,গাড়ি ও ছিল না।এখন রাস্তা প্রশস্ত তারপর ও যানযট। আহ কি উন্নয়ন। লোকজন আজকাল আনন্দ নিয়ে বাজার করতেছে। দেশের কোথাও হাহাকার নেই। টিসিবির লাইন আমাদের চোখে পরে না। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমতেছে সে খবর আর কয়জন ই বা জানি। মানুষের দুঃখ দূর্দশা আমরা চোখে দেখি না। গানের কথায় বর্তমানে আমাদের অবস্থা…
“নাকে দিয়েছি সর্ষের তেল আরামের ঘুমে আছি…
খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুরছি ফিরছি আমি বেশ ভালো আছি।
স্বার্থপরের মতো আমি নিজেকে নিয়ে বাঁচি।”

একজন রিকশাওয়ালা মরল না বাঁচল তাতে আমাদের কি। যে যার কাজে চলেছি।তারপর ও তিন জন মেয়ের এগিয়ে আসা দেখে মনে হলো ভালো মানুষ আছে বলেই পৃথিবী আজ ও টিকে আছে। তারা সেই রিকশাওয়লা কে সাহায্য না করলে হয়তো সেন্সলেস হওয়া অসাভাবিক কিছু ছিলো না।কারণ তার পরিস্থিতি অনেকটা খারাপ ছিল।আমি ত রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তার মৃত্যু ও হতে পারত।যাইহোক স্যালাইন, পানি, ব্রেড, কলা,কেক খাওয়ার বেশ কিছুক্ষন পর তার কাঁপুনি থেমে গিয়েছিল। একটু সস্তিবোধ করছিল। তখন জিজ্ঞেস করলাম বাড়ির কারো নাম্বার আছে কি না তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। তিনি জানালেন কারো নাম্বার নেই এবং একাই যেতে পারবেন।

তারপর তাকে ইঞ্জেকশন কিনার টাকা দিয়ে বলা হলো কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে বাড়ি যান। এরপর দুই জন মেয়ে চলে গেলে একজন তখন ও ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম সে ইসলামিক স্টাডিজ ২০২০-২১ সেশন এর শিক্ষার্থী। যাইহোক আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন। এরপর আমরা দুইজন ও নিজেদের পথ দেখলাম। আর সেই রিকশাওয়ালা ও ফিরে যাবে।যাওয়ার পথে হয়তো বা আবার কোন যাত্রী ও তুলবে! জীবন যেখানে যেমন আর কি!

লেখক : তাবাসসুম শতাব্দী:

বি.দ্র. লেখকের ফেসবুকে শেয়ার করা স্ট্যাটাস থেকে নেয়া।

এএইচ/এস