রাজশাহীর হ্যাকার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত সারাদেশে

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক:

রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট ও নাটোরের লালপুর এলাকায় গড়ে উঠা হ্যাকার চক্রের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মানুষ। সারা দেশে বিস্তৃত এই হ্যাকার চক্রের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন লেনদেন পরিষেবা।

বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন প্রায়ই। রাজশাহী জেলা ডিবি, র‌্যাব ও বিভিন্ন থানা পুলিশ ইতিমধ্যে ৫০ জনের বেশি হ্যাকার প্রতারককে গ্রেফতার করলেও তাদের অপতৎপরতা থামেনি। তারা বিকাশ প্রতারণা ছাড়াও ইমো হ্যাকিং করে প্রতিদিনই সর্বশান্ত করছে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে। পুলিশ বলছে, চক্রটি শুধু স্থানীয় লোকজনই নয়, সারা দেশে গড়ে তুলেছে প্রতারণার নেটওয়ার্ক। গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ এমনই তথ্য পেয়েছে।

রাজশাহীর শাহমখদুম থানার চৈতালী দাসের স্বামী স্বপন দাস চট্টগ্রামের সিতাকুন্ডে জাহাজ ভাঙা শ্রমিকের কাজ করেন। মাঝে মধ্যে পরিবারের জন্য বিকাশে টাকা পাঠান। ১৭ জুন চৈতালী দাসের বিকাশের পিন হ্যাক করে প্রতারক চক্র হাতিয়ে নেয় ১৬ হাজার টাকা। প্রতারিত চৈতালী ওইদিনই থানায় অভিযোগ করেন। পুলিশ মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে নাটোরের লালপুর থেকে দুই হ্যাকারকে গ্রেফতার করেন। ৭ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের খলিলুর রহমান স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে রাজশাহী ইসলামি ব্যাংক মেডিকেল হাসপাতালে আসেন। স্ত্রীর অপারেশনের জন্য নিজের বিকাশ নম্বরে আত্মীয়-স্বজনের কাছে ৩৫ হাজার টাকা নেন। হ্যাকার চক্র কৌশলে তার পিন নম্বর হাতিয়ে নিয়ে বিকাশের পুরো টাকাই খালি করে দেন।

রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসবি) এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, হ্যাকার চক্রের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট ও সংলগ্ন নাটোরের লালপুরে। এদের নেটওয়ার্ক দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্তৃত। এরা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। শুধুমাত্র রাজশাহীর সীমান্তবর্তী বাঘা উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে এই চক্রের সদস্য সংখ্যা দুই শতাধিক। ২৬ আগস্ট পুলিশ বাঘায় সচেতনতামূলক একটি সভা করেছে। সেখানে হ্যাকার চক্রের প্রতারণার বিভিন্ন কৌশল দেখিয়ে তাদের সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক মাসে বাঘা থানায় হ্যাকার প্রতারণা সংক্রান্ত শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে মামলা হয়েছে ২২টি, গ্রেফতার ৩২ জন। চারঘাট থানায় মামলা হয়েছে সাতটি, গ্রেফতার ১১ জন। একই চক্রের আরও ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। ২৪ আগস্ট বাঘার জোতকাদির গ্রাম থেকে হ্যাকার গোলাম রাব্বী (১৯) ও সেলিম ওরফে সাদ্দামকে (২৬) গ্রেফতার করেন ডিবি পুলিশ। এই দুই হ্যাকার প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছেন, তারা গত এক বছরে শতাধিক প্রবাসীর পাঠানো ১০ লক্ষাধিক টাকা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে লোপাট করেছে। ৮ মে সৌদি প্রবাসী ঢাকার উত্তরার মুন্নার ৪৫ হাজার টাকা ইমো হ্যাক করে হাতিয়ে নেয় বাঘার ছাতারী গ্রামের হ্যাকার জুয়েল রানা (২৬)। প্রতারিত মুন্না ডিএমপির উত্তরা থানায় মামলা করেন। সেই মামলার সূত্র ধরে পুলিশ ওই গ্রাম থেকে হ্যাকার জুয়েলকে গ্রেফতার করে ঢাকায় নিয়ে যায়। উত্তরা থানা ও ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সদস্যরা যৌথভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পান। হ্যাকার জুয়েল পুলিশকে জানায়, সে রাজবাড়ীর কাউখালীর একটি চক্রের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে দুই বছর ধরে হ্যাকিং করছে। প্রবাসীরাই তার টার্গেট। বাঘায় দুইশ’র বেশি হ্যাকার সক্রিয় আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিকাশ ও ইমো হ্যাক করে সম্প্রতি রাজশাহীর বাঘা ও চারঘাট এলাকায় হ্যাকার প্রতারক চক্রের সন্ধান করছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়েছেন জেলা পুলিশ। প্রতারণার শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট থানায় অথবা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় অথবা পুলিশের ৯৯৯ নম্বরে দ্রুত অভিযোগ জানাতেও পুলিশ পরামর্শ দিয়েছেন। রাজশাহী জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা আরও বলছেন, এ ধরনের ডিজিটাল প্রতারণায় সাধারণ মানুষ সর্বশান্ত হচ্ছেন যা কারোরই কাম্য নয়। তবে অপরাধীদের ধরতে পুলিশ মাঠে কাজ শুরু করছেন। আপনারা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ দিন। পুলিশ প্রতারকদের দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনবে।

হ্যাকার চক্রের অব্যাহত তৎপরতা সম্পর্কে বাঘা থানার ওসি সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এ এক ভয়ঙ্কর চক্র। প্রথমে তারা প্রবাসীদের সঙ্গে বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ও অ্যাপসে যুক্ত হয়। ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলে কৌশলে পরিবারের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। এরপর কৌশলে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট, বিকাশ ও ইমো হ্যাক করে বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা হাতিয়ে নেয়। ওসি বলেন, ইতোমধ্যে পুলিশ স্থানীয় সব মোবাইল ব্যাংকিং, বিকাশ ও অন্যান্য মানি ট্রান্সফার এজেন্টদের সঙ্গে পৃথক পৃথক সভা করেছি। তাদের সতর্কতার সঙ্গে লেনদেনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ৩ হাজার টাকার বেশি লেনদেন হলে সেই নম্বর পুলিশকে জানাতে বলা হয়েছে।

সূত্র : যুগান্তর/এএইচএস