ফোকাসটা ঠিক করতে হবে

রাস্তাঘাটে ভিক্ষুকের সংখ্যা সম্প্রতি কেমন বেড়েছে লক্ষ করেছেন? সম্প্রতি বলতে গত দুই বছরের কথা বলছি। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় মার্চ ২০২০-এ। ৮ মার্চ ২০২০। সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের আলাপ-আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে করোনা। সন্ধ্যাকাশে একটি-দুটি করে যখন তারা ফোটে তখন তা সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। সেই গুটিকতক তারা কারণে-অকারণে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে যখন একদিকে অন্ধকার গাঢ় হতে থাকে, আর আরেক দিকে সমস্ত আকাশের আঙিনা ছেয়ে যায় তারায় তারায়, তখন কোনো একটি তারা নিয়ে বিভোর হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় না কাউকে। আকাশজুড়ে তখন লক্ষ লক্ষ তারার মেলা। দৃষ্টি ডুবে যায় সেই মেলায়। ৮ মার্চ ২০২০-এর একজন করোনাক্রান্ত রোগী তেমনি দ্রুত হারিয়ে গেলেন সারা দেশের অসংখ্য করোনা রোগীর মাঝে। আমরা হঠাৎই যেন আবিষ্কার করলাম সারা দেশ করোনার ছোবলের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে ফেলেছে। আর তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় নানাবিধ আধিব্যাধি যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে দেশটাকে। কোনো এক জাদুকরের জাদুকাঠির ছোঁয়ায় যেন এক লহমায় বদলে গেল জীবন। হারিয়ে গেল জীবনের ছন্দ। প্রতিদিন মৃত্যু হানা দিতে লাগল মহাবিক্রমে। কত মূল্যবান জীবন যে ঝরে গেল, কত আপনজন যে চলে গেল না ফেরার দেশে এই করোনার আক্রমণের শিকার হয়ে। মহামারি শব্দটা দিয়ে তার ব্যাপকতা বোঝানো যাচ্ছে না দেখে আমদানি হলো নতুন শব্দ অতিমারি। করোনা এই নতুন অভিধাতেও যেন সন্তুষ্ট নয়। তার করাল মূর্তি আজ দুই বছর পরেও এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফিরছে পুরো পৃথিবীকে।

২.

বছর দুয়েক আগে যে বাংলাদেশ তার চিরন্তন দারিদ্র্যক্লিষ্ট রূপ ঝেড়ে ফেলে গায়ে-গতরে মোটামুটি একটা চেকনাই ভাব ধারণ করতে শুরু করেছিল, সেই দেশটাই যেন আচমকা একটা ধাক্কা খেয়ে পঙ্কিল দুর্গন্ধময় নর্দমায় পড়ে গেল। আমরা এ দেশের জন্মলগ্ন থেকে শুনে এসেছি বাংলাদেশ পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার কোনো উপায়ই নেই এই দেশের। ১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া এই দেশটি যে আঁতুড়ঘরেই মারা যাবে এরূপ শঙ্কাও প্রকাশ করেছিল অনেকে। আর তখন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বলতে গেলে ললাটলিখনই ছিল দেশটির। এক মার্কিন কূটনীতিবিদ তো কূটনৈতিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশকে ‘তলাহীন ঝুড়ি’ খেতাবই দিয়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ এই দেশটি এতই গরিব, এতই হাড়-হাভাতে যে একে যত সাহায্য-সহযোগিতাই দেওয়া হোক না কেন, কোনো লাভ হবে না। বাংলাদেশ নামক এই ঝুড়িটাতে সাহায্যের অর্থবিত্ত, খাদ্যশস্য যাই দেওয়া হবে তাই তলাহীন ঝুড়িটাতে থাকবে না, কারণ তার তো তলাই নেই। এত খারাপ অবস্থা এই সদ্যঃস্বাধীন দেশটার। সেটা স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের কথা। তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটাতে সমস্যার পাহাড়। প্রথমে ইংরেজ আমলের ২০০ বছর, পরে পাকিস্তানের সিকি শতাব্দী ধরে লুণ্ঠিত-বঞ্চিত দেশটার মাথা তুলে দাঁড়াবার জো ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস বা তার আগে থেকেই যে ঐক্য ছিল শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর বাঙালির মূল অস্ত্র, সেই ঐক্যও দ্রুত বিনষ্ট হতে চলল স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে। কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে হয়তো অনেক কিছুই বলা যাবে বা বলা হয়ে থাকে, তবে এককথায় বলতে হলে বোধ হয় বলতে হয় ক্ষমতার লোভ। এতে বাইরে থেকে অনেক সুবিধাবাদী সুহৃদও তখন ইন্ধন জুগিয়েছেন। ফলে দেশের অবস্থা শুরুতেই, গ্রাম্য কথায় বলতে হয়, ‘কেরাসিন’ হয়ে পড়ে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, তীব্র খাদ্যাভাব, প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতা, বিশ্বব্যাপী তৈল সংকটজনিত মন্দা নবলব্ধ স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াল। সেই সঙ্গে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার প্রবণতা দেখা দিল এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে। তারা দেখল তাদের চারপাশে সৌভাগ্যের ষাঁড় লাঙ্গুল উঁচিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, অতএব ঝুলে পড় এই লাঙ্গুল ধরে। পাকিস্তানি আমলে পশ্চিমা প্রভুরা ওই ষাঁড়ের ধারে-কাছেও ভিড়তে দেয়নি তাদের। এখন আর ঠেকায় কে। ফলে শুরু হলো কনুই মারামারি, দখলবাজি ও নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখানোর কালচার। আর সেই কালচার বাঙালিকে এমন মোহাবিষ্ট করে ফেলল যে পরবর্তীকালে নানা ক্ষেত্রে দেশে মাশাল্লাহ যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে ঠিকই—সামাজিক প্রায় সব সূচকে এসেছে তাক লাগানো সাফল্য; কিন্তু ধান্ধাবাজি, ফেরেববাজি নামক বাবাজিদের সঙ্গসুখ কিছু কিছু লোক কিছুতেই ছাড়তে পারেনি। এদের সংখ্যা কিন্তু বেশি না। বড়জোর শতকরা ১০ জন। কিন্তু এরাই টাকার জোরে সব ব্যাপারে ছড়ি ঘোরায়। এদের হাত থেকে দেশকে না বাঁচালে বাকি শতকরা ৯০ জনের হাড়মাস কালি করা পরিশ্রমের বাংলাদেশকে অচিরেই বড় রকমের মূল্য দিতে হবে।

প্রশ্ন হলো, এসব লুটেরা বাহিনীকে ঠেকানো যাবে কী করে? এককথায় উত্তর : আইনের শাসন দ্বারা। আমরা যেকোনো ব্যাপারে যখন আইনের শাসনের অভাব দেখি তখন আক্ষেপ করে বলি, ‘দেশে কি আইন-কানুন নেই?’ এর উত্তর : অবশ্যই আইন আছে, কানুন আছে। আমাদের দেশের আইনের মতো এত সুন্দর সুন্দর আইন, এত ভালো আইন পৃথিবীর অনেক দেশেই নেই। এত চমৎকার আইন এলো কোত্থেকে? না, এর সবগুলো যে আমরা একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জনের পরে করেছি তা নয়, এগুলোর গোড়াপত্তন করে গেছে ব্রিটিশরা। আমরা হয়তো সময়ের প্রয়োজনে কিছু কিছু খোলনলচে পাল্টিয়েছি, করেছি সংযোজন-বিয়োজন। কিন্তু ভিতটা মজবুত করে গড়ে দিয়ে গেছে ওই ব্রিটিশ রাজই। মুশকিল হলো আমরা আমাদের আইন নিয়ে গর্ব করি, কথায় কথায় আইনের দোহাই দেই, কিন্তু দুঃখের বিষয়, এর প্রয়োগের ব্যাপারে আমরা প্রায়শই উদাসীন। প্রয়োগ করতে গিয়ে আমরা নিজের অথবা নিজের দল বা গোষ্ঠীর লাভ-ক্ষতির কথা চিন্তা করি। তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে কীভাবে? মুখে বলব ‘আইনের চোখে সবাই সমান’, আর আইন যখন প্রয়োগ করতে যাব তখন দেখব কার বিরুদ্ধে ওটা প্রয়োগ করা হচ্ছে, তাহলে তো হবে না। এই দ্বিচারিতা বাদ দিতে হবে। দৃঢ়হস্তে, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করুন, দেখবেন অপরাধ দ্রুত কমে আসছে।

আরেকটি কথা। শরীরের কোনো একটি অঙ্গের অস্বাভাবিক স্ফীতি যেমন সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়, বরং বেরিবেরি রোগের লক্ষণ, তেমনি সমাজের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হঠাৎ বড়লোক হয়ে সমাজপতি সেজে বসাও দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সঠিক পরিচায়ক নয়। অভ্যাসমতো একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা খোলাসা করি। মনে করুন, এক বস্তির সব অধিবাসীই হতদরিদ্র শ্রেণির মানুষ, নুন আনতে তাদের পান্তা ফুরায়। সেখানে হঠাৎ দেখা গেল কোনো অদৃশ্য জাদুবলে একটি পরিবার দারুণ ঠাটবাটের মালিক হয়ে গেল : দুবেলা পোলাও-কোর্মা, কালিয়া-কোপ্তা সেবা করে, সাতমহলা দালান তুলছে বস্তিতে, পাজেরো আর প্রাডো গাড়িতে চলাফেরা করে, বৌ-ঝিরা সকাল-বিকাল জড়োয়া বদলায় ইত্যাদি ইত্যাদি, আর এদিকে তার আশপাশের লোকগুলোর চেহারা-সুরত আগের মতোই আছে, এক বেলা খায় তো দুই বেলা উপাস। তখন কি বলবেন এই বস্তি অর্থনৈতিক দিক দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়ে গেছে? না, বলবেন না। কারণ ওই হঠাৎ বড়লোকের দৈনিক আয় এক কোটি টাকা হলেও তাতে তার প্রতিবেশীদের জীবনে তা অর্থহীন। ওই ব্যক্তি ছাড়া বাকি ৯৯ জনের সবার দৈনিক আয় যোগ করলেও হয়তো ১০ হাজার টাকাও হবে না। তখন যদি কেউ ওই নব্য কোটিপতির এক কোটির সঙ্গে বাকি সবার ১০ হাজার টাকা যোগ করে মোট জন্যসংখ্যা ১০০ দিয়ে ভাগ করে বলে এই বস্তিবাসীদের প্রত্যেকের মাথাপিছু আয় দৈনিক এক লক্ষ টাকা, তাহলে সেটা মানবেন? ওই কোটিপতি হুজুর ছাড়া বাকি সবাই লাঠি নিয়ে মারতে আসবে এমন আজগুবি হিসাবের কথা শুনে। কাজেই বলছিলাম, তোষণ-পোষণ প্রণোদনা-প্রেরণাভোগী সৌভাগ্যের বরপুত্রদের তেলা মাথায় তৈলমর্দন করুন আপত্তি নেই, কারণ অবশ্যই ওটারও দরকার আছে; কিন্তু বাকি শতকরা ৯৯ জনের মধ্যে যে ১০-১৫ জনের নাভিশ্বাস উঠেছে করোনাজনিত কারণে, ফর গডস্ সেইক, তাদের কথা ভুলে যাবেন না। তা না হলে এখন দেখছেন রাস্তায়, ফুটপাতে, মসজিদের সামনে এরা হাত পাততে শুরু করেছে, কিন্তু গড ফরবিড, এভাবে চললে কিছুদিন পর এরা আপনার-আমার বাড়ির দেয়াল টপকে, গেট ভেঙে যে ঢুকে পড়বে না তার নিশ্চয়তা কী?

৩.

তাই বলছিলাম, সময় থাকতে সাধু সাবধান। প্রণোদনা-প্রেরণা সাহায্য-সহায়তার ফোকাসটা এবার ওই সব ‘মূঢ় ম্লান মূক মুখে’-র মানুষগুলোর ওপর পড়ুক।

এ প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলা জরুরি মনে করি। দেশের সজ্জন বিত্তশালী মানুষ যাঁরা মুসলমান, তাঁরা তাঁদের জাকাতটা ঠিকমতো দিলে হতদরিদ্র লোকগুলো এই দুঃসময়ে খুবই উপকৃত হবে। তেমনি পাড়ায় পাড়ায় অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা গরিব-দুঃখীদের পাশে বেশি বেশি করে দাঁড়াতে পারেন। এবং তাতে নেতৃত্ব দেবে তরুণতররা।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি
[email protected]

 

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ