নতুন আমেরিকা গড়ব : বাইডেন

  • 10
    Shares

কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতা জো বাইডেন। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে স্থানীয় সময় বুধবার দুপুর ১১টা ৪৮মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ৪৮ মিনিট) শপথ পাঠ করেন তিনি। এর প্রায় পাঁচ মিনিট আগে শপথ নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।

 

শপথ নেওয়ার আগ মুহূর্তে টুইট করেন বাইডেন। এতে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন দিনের শুরু হলো। আর শপথ নেওয়ার পর ভাষণে তিনি বলেন, সবাই মিলেই নতুন আমেরিকা গড়ে তুলব।

 

শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে ক্যাপিটল হিলে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকদের ভয়াবহ তাণ্ডবের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা ছিল, এ নিয়ে ছিল অনেক উৎকণ্ঠাও। তবে শেষ পর্যন্ত স্বস্তিতেই শেষ হয়েছে শপথ অনুষ্ঠান।

 

এ অনুষ্ঠানে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপস্থিত ছিলেন না। ১৮৬৯ সালের পর এবারই প্রথম কোনো প্রেসিডেন্ট উত্তরসূরির শপথ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকলেন। খবর বিবিসি, সিএনএন, এএফপি ও রয়টার্সের।

 

৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজিত করে বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে বাইডেনের বিজয় ট্রাম্প পুরোপুরিভাবে মেনে নিতে পারেননি। আদালত পর্যন্ত তিনি যান। এছাড়া কংগ্রেসে বাইডেনের বিজয় অনুমোদনের দিন ৬ জানুয়ারি উগ্রপন্থি সমর্থকদের তিনি উসকানি দিয়েছিলেন।

 

ওইদিন ক্যাপিটল হিলে সন্ত্রাসী হামলায় এক পুলিশ সদস্যসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়। ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই সপ্তাহের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসাবে বাইডেন শপথ নিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি একনিষ্ঠভাবে শপথ গ্রহণ করছি যে, আমি বিশ্বস্ততার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের দায়িত্ব সম্পাদন করব এবং আমি আমার সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও প্রতিপালন করব।’

 

এ শব্দগুলো উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্টে পরিণত হন। শপথ নেওয়ার পর জো বাইডেন হোয়াইট হাউজে চলে যান। হোয়াইট হাউজই তার আগামী চার বছরের কর্মস্থল ও বাসস্থান।

 

করোনাভাইরাসে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি, মহামারির ধাক্কায় নাজুক অর্থনীতি, ভেঙে পড়া পররাষ্ট্র নীতি, ক্ষমতা হন্তান্তর নিয়ে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অসহযোগিতা আর সহিংসতার আশঙ্কার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন। কংগ্রেস ভবন পেছনে রেখে নির্মিত সুউচ্চ মঞ্চে দাঁড়িয়ে শপথ নেন বাইডেন। এর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন কমলা হ্যারিস। তাদের শপথ পড়ান যথাক্রমে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস ও বিচারপতি সোনিয়া সটোমাইয়র। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি প্রেসিডেন্টের ৫৯তম শপথ অনুষ্ঠান।

 

শপথ অনুষ্ঠানে বাইডেনের স্ত্রী জিল বাইডেন ও কমলা হ্যারিসের স্বামী ডাউ এমহফসহ দুই পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হাজারখানেক অতিথি, যাদের অধিকাংশই কংগ্রেস সদস্য ও বাইডেন-হ্যারিস পরিবারের লোকজন।

 

শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিদায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। তবে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ অনুষ্ঠানের তিন ঘণ্টা আগে স্ত্রী মেলানিয়াসহ ওয়াশিংটন ছেড়ে চলে যান। ১৮৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্র– জনসনের পর এবারই প্রথম বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার উত্তরসূরির অনুষ্ঠানে থাকলেন না। অবশ্য অনেক আগেই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে থাকবেন না।

 

সাধারণত প্রেসিডেন্টের অভিষেক হয়ে থাকে আনন্দ-উল্লাসমুখর পরিবেশে। হাজার হাজার মানুষ অভিষেক অনুষ্ঠান উদযাপন করতে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে জড়ো হন। কিন্তু ৬ জানুয়ারিতে কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের ভয়াবহ হামলার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেদিকেই এবার বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে কর্তৃপক্ষকে।

 

এবার ডিসিতে ২৫ হাজার ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়। বেশকিছু রাস্তা বন্ধ করে ও উঁচু সব বেষ্টনী দিয়ে ক্যাপিটল ভবন সুরক্ষিত করা হয়। চলাফেরাতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। ওয়াশিংটনে বিপুলসংখ্যক সেনা সমাবেশ ঘটনানো হয়।

৬ জানুয়ারি মার্কিন পার্লামেন্ট ভবন ক্যাপিটল হিলে উগ্র ট্রাম্প সমর্থকদের তাণ্ডবের কথা মাথায় রেখে শপথ অনুষ্ঠানস্থল কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়। তল্লাশি থেকে নিরাপত্তারক্ষীদেরও ছাড় দেওয়া হয়নি। এমনকি প্রত্যেক সদস্যের অতীত রেকর্ড পরীক্ষা করা হয়। এ পরীক্ষা চালাতে গিয়ে ১২ নিরাপত্তারক্ষীকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়েছে।

 

সহিংস বিক্ষোভের শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্যের সবকটিতে এবং ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ায় বিশেষ সতর্কতাও জারি করা হয়। আট রাজ্যের পুলিশকে ওয়াশিংটন ডিসির নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়। বুধবার নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শপথ নিয়েছেন জো বাইডেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র জানান, ১২ জন ন্যাশনাল সিকিওরিটি গার্ডকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

প্রত্যেকেই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিলেন। এর মধ্যে একজনের সঙ্গে চরমপন্থি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের যোগাযোগ আছে বলে জানানো হয়েছে। আরেকজন সম্প্রতি চরমপন্থি মন্তব্য করেছেন সোশ্যাল নেটওয়ার্কে। বাকি ১০ জনের সঙ্গেও বিভিন্নভাবে চরমপন্থিদের সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের সবাইকে ওয়াশিংটন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

 

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের জন্য শুধু ওয়াশিংটনে ২৫ হাজার ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়। ওয়াশিংটনে কারফিউ জারি করা হয়। প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ মানুষকে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়। রাস্তায় রাস্তায় কংক্রিটের গার্ড ওয়াল রাখা হয়েছে। ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা গোটা শহরে ফ্ল্যাগ মার্চ করছে।

 

বাইডেনের জন্য চিঠি রেখে গেছেন ট্রাম্প : যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার উত্তরসূরি জো বাইডেনের জন্য একটি চিঠি রেখে গেছেন। তবে চিঠিটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে এখনো কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। এছাড়া ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্পও তার উত্তরসূরি জিল বাইডেনের জন্যও একটি চিঠি রেখে গেছেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসের প্রথা অনুযায়ী প্রেসিডেন্টরা অভিষেকের দিনই তার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়ে আসছেন। এসব চিঠিতে সাধারণত শুভেচ্ছা বার্তা এবং পরামর্শ লেখা থাকে। সাধারণত এসব চিঠি রাখা থাকে হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসের ডেস্কে। যাতে নতুন প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেই সেই চিঠিটা হাতে পান।

 

বারাক ওবামার কাছ থেকে একই রকম চিঠি পেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই চিঠিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছিলেন ওবামা। তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রাত্যহিক রাজনীতির টানাপোড়েনের পরও আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী রাখার দায়িত্ব আমাদের, অন্ততপক্ষে যেমনটা পেয়েছিলাম, তেমনটা রেখে যাওয়াটা জরুরি।’

 

বিল ক্লিনটনকেও চিঠি দিয়ে গিয়েছিলেন জর্জ এইচডব্লিউ বুশ। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘আপনার মঙ্গল কামনা করি। আপনার পরিবারের মঙ্গল কামনা করি। আপনার সফলতা এখন আমাদের দেশের সফলতা। আপনার ভিত্তি মজবুত রাখার জোরালো চেষ্টা করেছি আমি।’

 

হার না-মানা বাইডেন হোয়াইট হাউজে : ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্রের যেসব নীতি বদলে ফেলা হয়েছিল, সেগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বাইডেনের কাজ শুরু হবে দায়িত্বের প্রথম দিন থেকেই। ট্রাম্পের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব নীতি বদলে ফেলা হয়েছিল, সেগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বাইডেনের কাজ শুরু হবে দায়িত্বের প্রথম দিন থেকে।

 

ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির আমলে বিশেষত শেষ সময়ের বিশৃঙ্খল দিনগুলোয় দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে চরম বিভক্তি এবং অগণতান্ত্রিক আচরণও দেখা গেছে। এসব হয়েছে করোনাভাইরাস মহামারির কঠিন সময়ের মধ্যেও। মহামারিতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নাজেহাল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

এ রোগের সংক্রমণ এবং মৃত্যু উভয় তালিকাতেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এক নম্বরে। মহামারি মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসনের যে লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছে, তার খেসারত দিতে হচ্ছে নাগরিকদের। অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে ভারসাম্যহীনতা। ট্রাম্পের অবজ্ঞার কারণে দেশটিতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেড়েছে বলে অভিযোগ আছে আগে থেকেই।

 

দেশে কোভিড-১৯ টিকাদান শুরু হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের অবহেলায় এ কর্মসূচিতে সমন্বয়হীনতাও চোখে পড়ার মতো। ফলে টিকাদান কার্যক্রমও প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। এ কর্মসূচিতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের ধারেকাছেও নেই দেশটি। এমন পরিস্থিতিতে দেশের দায়িত্ব নেওয়া বাইডেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোভিড-১৯ মহামারি।

 

ট্রাম্প সমর্থকদের সমাবেশ প্রত্যাহার : যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকরা যে প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। জরুরি অবস্থার কথা উল্লেখ করে সমাবেশ বাতিল করেছে পাবলিক অ্যাডভোকেট নামে গ্রুপটি।

 

ট্রাম্পপন্থি অন্যান্য গ্রুপের নেতারা বলেন, তারা ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন না। তাদের একজন বলেন, ‘কংগ্রেস সদস্য, বাইডেনের কর্মকর্তা এবং ৬০ হাজার ন্যাশনাল গার্ড ছাড়া সেখানে আর কেউ থাকবে না। এদিকে ওয়াশিংটন ডিসিতে বুধবার উৎসব করেছে ডেমোক্র্যাটরা। তবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অনেক সমর্থকই শহরটিকে এড়িয়ে চলেছেন।

 

 

 

 

শর্টলিংকঃ

প্রিয় পাঠক, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, silkcitynews@gmail.com ঠিকানায়। অথবা যুক্ত হতে পারেন @silkcitynews.com আমাদের ফেসবুক পেজে। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।