আড়ানীতে দুই প্রার্থীর দ্বন্দ্বে ব্যাপক ক্ষতির শিকার ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহীর বাঘা আড়ানী পৌর সভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে গত বুধবার রাতে। এ ঘটনার সময় আড়ানী বাজারের প্রায় ৩০টি দোকানে হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়। এতে প্রায় ৫০-৬০ লাখ টাকার ক্ষতির শিকার হোন ওই বাজারের ব্যবসায়ীরা। সংঘর্ষের পর গতকাল দিনভরও ওই ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে দোকানপাট খুলতে পারেননি।

ফলে গতকাল দিনভর রাস্তার ধারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিলো দোকানের মালামালগুলো। বাংলাদেশের একটি জাতীয় পতাকা রাস্তায় পড়ে ধুলোই লুটপুটি খাচ্ছিল। এছাড়াও গতকাল সকাল থেকেই উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাও ছিলো ব্যাপক। উভয়পক্ষই লাঠি-সোঠা নিয়ে সকাল থেকেই বাজারে অবস্থান নেয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এর আগে বুধবার রাত নয়টার দিকে আড়ানী পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী শহিদুজ্জামান শাহিদের পথসভা শেষে তার কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা করে বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান মেয়র মুক্তার আলীর লোকজন। এরপর উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা, গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ ও দোকানপাট ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বিদ্রোহী প্রার্থী মেয়র মুক্তার আলীকে প্রধান আসামি করে বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাতে শাহিদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মতিউর রহমান মতি বাদী হয়ে বাঘা থানায় বিস্ফোরক আইনে ৫০ জনের নাম উল্লেথসহ অজ্ঞাত অন্তত ৬০০ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় বিদ্রোহী প্রার্থী মেয়র মুক্তার আলীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও মিলন নামের একজনকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গতকাল সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, আড়ানী বাজারে থমথমে অবস্থা। বাজারে তেমন লোকজন নাই। আতঙ্কে সাধারণ মানুষ বাজারে আসছিলেন না। শুধু আওয়ামী লীগের দুপক্ষের লোকজন দুইদিকে অবস্থান নিয়ে ছিলেন। ফলে বাজারের মাঝখানে একেবারে ফাঁকা অবস্থায় বিরাজ করছিলো। আগের দিন রাতে দোকান পাট ভাংচুর করার পরে সেই দোকানগুলোর মালামাল এবং আসবাবপত্র দোকানের ভিতরে, বাইরে ও রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলো। বাজারের ভিতরে একটি মুরগির দোকানে গিয়ে দেখা যায়, একটি জবাইকৃত মুরগি পড়ে আছে। দোকানের ভিতরে শ খানেক মুরগি খাঁচার মধ্যে ডাকাডাকি করছে। কিন্তু মুরগিগুলোর কাছেও ভয়ে ভিড়তে পারছেন ওই দোকানের মালিক।

ওই দোকানের পাশে একটি ছোট চায়ের দোকানের চুলাসহ চিমনিটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে। এমনকি দোকানটির ভিতরের বসার টুলগুলোও ভেঙে তছনছ করা হয়েছে। ওই দোকানের পাশের বাড়িতেই থাকেন সুইপার সৈতন্য। তিনি বলেন, রাত নয়টার দিকে সংঘর্ষ, গুলাগুলি, বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু আমরা ভয়ে বাড়ি থেকে বের হয়নি। যখন হামলা চালানো হয়, তখন বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতারা দৌড়াদৌড়ি করে যে যার মতো পালিয়ে যায়। এরপর ভয়ে সকালেও আর কেউ বাজারে আসেনি।’

ওই বাজারের ব্যবসায়ী হযরত আলী বলেন, আমার সবজি দোকানের অন্তত ৩০ হাজার টাকার মালামাল তছনছ করে দিয়েছে হামলাকারীরা। তবে কারা এই হামলা করেছে বলতে পারব না।’

সকাল ১১টার দিকে আড়ানি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, তখনো শহিদুজ্জামান শহিদের কর্মী-সমর্থকরা একজোট হয়ে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে বাজারের দক্ষিণ পাশে অবস্থান করছিলেন বিদ্রোহী প্রার্থী মুক্তারের কর্মী-সমর্থকরা। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে টানটান উতেত্জনা বিরাজ করছিলো। আর মাঝখানে শতাধিক পুলিশ দুই ভাগে ভাগ হয়ে পরিস্থিতি দেখভাল করছিলেন। বাজারের ভিতরে তখনো কয়েকটি বিস্ফোরিত ককটেল পড়েছিলো। দুটি নির্বাচনী অফিসে ভাংচুরকৃত মালামালও পড়েছিলো। রাস্তায় পড়েছিলো বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। সেটি ধুলায় মিশেছিলো। কিন্তু তখনো পতাকাটি কেউ তুলেনি। পতাকার ওপর দিয়েই চলছিলো যানবাহন, হেঁটে যাচ্ছিলেন মানুষ। গণমাধ্যমকর্মীরা সেখানে গিয়ে পতাকাটি ওঠানোর ব্যবস্থা করেন।

এদিকে মেয়র প্রার্থী শহিদুজ্জামান শাহিদ দাবি করেন, তাঁর নির্বাচনী পথসভা শেষেই বর্তমান মেয়র মুক্তার আলীর কর্মী-সমর্থকরা অতর্কিত হামলা করে শাহিদের নির্বাচনী অফিসসহ দোকানপাট ভাংচুর চালাতে থাকে। এসময় বাধা দিতে গেলে মুক্তারের লোকজন শাহিদের কর্মী-সমর্থকদের ওপর ধারালো অস্ত্র, লাঠি-সোঠা, পিস্তল ও ককটেল নিয়ে হামলা করে। হামলায় শাহিদের অন্তত ৩০ জন কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনকে পুঠিয়া থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। মুক্তার এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে।

অন্যদিকে মুক্তার আলী অভিযোগ করেন, শাহিদের লোকজনই আগে মুক্তারের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা করে। এসময় তারা মুক্তারের নির্বাচনী অফিস ভাংচুর করে। অফিস থেকে সাড়ে ২২ লাখ টাকাও লুট করে নিয়ে যায় শাহিদের লোকজন। এছাড়াও বাজারের দোকানপাটও ভাংচুর করা হয়।হামলা মুক্তারের অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনইকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে বাঘা থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান, উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষের পরে একটি মামলা হয়েছে। মামলায় ৬০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মুক্তারের পক্ষেও একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

স/আর

শর্টলিংকঃ

প্রিয় পাঠক, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, silkcitynews@gmail.com ঠিকানায়। অথবা যুক্ত হতে পারেন @silkcitynews.com আমাদের ফেসবুক পেজে। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।