জীবন যাঁর বাংলাদেশের ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশ অভিভাবকশূন্য হয়ে গেল। জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার নেই! লেখক-চিন্তক-গবেষক আনিসুজ্জামানকে আমরা তাঁর বইগুলোয় পাব, তাঁর জীবনস্মৃতি গ্রন্থগুলোয় পাব মানুষ আনিসুজ্জামানকে। ১৯৩৭-এ চব্বিশ পরগনার বশিরহাটে জন্ম, শৈশব কেটেছে কলকাতায়। ১০ বছর বয়সে হোমিওপ্যাথি ডাক্তার আব্বার হাত ধরে চলে এলেন পূর্ব বাংলায়, ১১ বছর বয়সে ঢাকায়। আর ১৫ বছর বয়সে যোগ দিলেন ভাষা আন্দোলনে। প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, প্রবাসী সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন, ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা অনুবাদের কাজ করেছেন, তেমনি জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণ–আদালতে যোগ দিয়ে মাথায় পরেছেন রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার আসামির তিলক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মামলায় সাক্ষ্য দিতে গেছেন, আবার সড়ক দুর্ঘটনায় স্কুলশিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর তিনি বিবৃতি দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পোস্ট ডক্টরাল ফেলো ছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের (১৯৬৪-১৯৬৫), লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ বিভাগে পুরোনো বাংলা গদ্য নিয়ে গবেষণা করেন ১৯৭৪-৭৫ সালে। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক। ছিলেন বাংলা একাডেমির সভাপতি। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭০–এর বেশি। দেশে-বিদেশে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার, যেমন দেশে পেয়েছেন সর্বোচ্চ স্বাধীনতা পুরস্কার, ভারত থেকে পেয়েছেন পদ্মভূষণ।

২. বাংলাদেশের ইতিহাসভিত্তিক কিছু লিখতে গেলে আনিসুজ্জামান স্যারের কথা বারবার আসবে।

আমার লেখা উষার দুয়ারে উপন্যাসে আছে, ‘স্মৃতিস্তম্ভটা ভেঙে ফেলেছে মা।’

ঠান্ডা ভাত মুখে তুলে আনিসুজ্জামান বলেন। মা তাঁর পাতে তরকারি তুলে দেন চামচে, বলেন, ‘তরকারিটা গরম। তরকারি মেখে ভাত খাও।’

 ১৭ বছরের আনিসুজ্জামান। জগন্নাথ কলেজে পড়েন। যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। কতই না কাজ তাঁর। সারা দিন তাঁর কাটে বাইরে বাইরে। বাড়ি ফিরেছেন মধ্যরাতে। ঠাটারীবাজারে ৮৭ বামাচরণ চক্রবর্তী রোডের দোতলায় এই বাড়ি। খাবার টেবিলে বসে রাস্তা দেখা যায়।…

আনিসুজ্জামান মায়ের মুখের দিকে তাকান। তিনি নীরব।

 ‘আমাদের চোখের সামনেই ভাঙল’…আনিসুজ্জামান বলেন।

ভাত মেখে নিচ্ছেন তিনি তরকারিতে। মা সব সময়ই চান ভাতটা তরকারির সঙ্গে ভালো করে মেখে নিয়ে আনিসুজ্জামান মুখে তুলুক। আনিসুজ্জামানরা পাঁচ ভাইবোন। তাঁর বড় তিন বোন, ছোট একটা ভাই, আখতারুজ্জামান স্কুলে পড়ে। দোতলা বাড়ির নিচতলায় তাঁদের একটা বোন থাকেন, সংসার পেতে। ছোট ভাইটা নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে। আব্বাও শুয়ে পড়েছেন। বাসাটা নীরব। শুধু একা জননী জেগে ছিলেন ছেলের আসার প্রতীক্ষায়।

খুব ভয়ার্ত এখন ঢাকার পরিবেশ। দুই দিন আগেও গুলি হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি, বাইশে ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিতে দিতে কতজন মারা গেল। কতজন আহত হলো। এখন চলছে সাধারণ ধর্মঘট। আবার কারফিউ। রাস্তা পাহারা দিচ্ছে পুলিশ আর মিলিটারি।

মাধবীলতার ঝাড় থেকে সুগন্ধ আসছে।

আনিসুজ্জামান পানির গেলাস তুলে নিলেন। মা বললেন, ‘ভাত খাওয়ার সময় পানি খেতে হয় না বাবা।’

আনিসুজ্জামান বললেন, ‘পুলিশ আসছে, এই খবর শুনে আমরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। তুমি তো স্মৃতিস্তম্ভটা দেখে এসেছ, মা। আমরা সবাই যতটা পারি, স্তম্ভটার কাছেই ভিড়েছিলাম। লোহার রেলিংটা ধরে। ইমাদুল্লাহ আছে না, ওই যে লম্বা ছেলেটা, শেরওয়ানি-পাজামা পরে থাকে, ও তো কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করছিল, ক্যামেরা, ক্যামেরা। কেউ একজন ক্যামেরা নিয়ে এসো। ওরা শহীদ মিনার ভেঙে ফেলছে। একটা একটা করে ইট খুলে ফেলল। আমাদের মনে হচ্ছিল যেন আমাদের পাঁজরের হাড় ভেঙে ফেলছে।’

মা টেবিল ছেড়ে উঠে অন্য ঘরে চলে গেলেন।

মা কি খুব দুঃখ পেলেন?

আনিসুজ্জামানেরও আর খেতে ইচ্ছে করছে না। তিনিও উঠে পড়লেন।

মা গতকাল স্মৃতিস্তম্ভে গিয়েছিলেন। আব্বাকে সঙ্গে নিয়ে। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক আব্বাও হয়তো গিয়েছিলেন নিজের গরজেই। বাংলা ভাষার প্রতি টান তো সবারই আছে। তবে মা-ই তাঁকে বলেছিলেন, ‘চলো, শুনলাম শহীদ স্মৃতি মিনার হয়েছে। ওখানে যাই। দেখে আসি।’

ধর্মঘট চলছিল। কাজেই গাড়ি আর নেওয়া হলো না। রিকশা ভাড়া করে গিয়েছিলেন আনিসুজ্জামানের পিতা ডাক্তার এ টি এম মোয়াজ্জেম আর মা সৈয়দা খাতুন।

তোয়ালেতে হাত মুছছেন আনিসুজ্জামান। বারান্দায় তাঁর ছায়া পড়ে। নাতিদীর্ঘ তরুণ, নাকের নিচে প্রজাপতির মতো গোঁফ, হালকা-পাতলা অবয়ব, চোখে চশমাটা স্থায়ী হয়ে আছে। ছায়ায় চশমাটার এক কোনা দেখা যায়। এ সময় আব্বার চপ্পলের আওয়াজ। আব্বা কি ঘুম থেকে উঠে এলেন?

তিনি বারান্দায় দাঁড়ালেন। বললেন, ‘তোমার মা বলছিলেন, স্মৃতি মিনারটা ভেঙে ফেলেছে পুলিশ?’

 ‘জি আব্বা।’

 ‘তোমার মা কথাটা শুনে একটু আঘাত পেয়েছেন।’

শুনে আনিসুজ্জামান ঘরের খোলা দরজা পথে মায়ের মুখের দিকে তাকালেন। চশমাটা একটু ঠিক করে নিলেন। মা কি কাঁদছেন?

 ‘তোমার মা একটু বেশি ইমোশনাল হয়ে পড়েছেন। তুমি কি জানো, কালকে যখন আমরা বিকেলবেলা শহীদ মিনারে যাই, তখন খুব একটা আবেগঘন দৃশ্য তৈরি হয়েছিল। সবাই সাধ্যমতো সাহায্য করছিল। টাকাপয়সা, ফুল। ওঁরা বলাবলি করছিলেন, এই সাহায্য আন্দোলনের তহবিলে জমা করা হবে। যেখানে যা খরচ লাগছে, দেওয়া হবে। তোমার মা সোনার হার দিয়ে দিলেন। আমি তো অবাক। এই হারটা তিনি আমাকে না বলেই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। জিগ্যেস করলাম, কোন হার। তোমার মা বললেন, নাজমুনের।’

আনিসুজ্জামানেরও চোখটা ছলছল করে উঠল। নাজমুন তাঁর ছোট বোন। মাত্র ১১ মাস বয়সে তঁাদের এই ছোট বোনটি বছর দুয়েক আগে মারা যায়।

মা তাকে ভোলেননি।

 (উষার দুয়ারে থেকে, প্রথমা প্রকাশন)

আমার মা উপন্যাসে আছে:

ফারুক বলে, ‘চল দোস্ত, বিকালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে যাই।’

 ‘ক্যান? ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে কী?’

 ‘ফাংশান আছে। লেখক সংঘের অনুষ্ঠান।’

ফারুকের আবার লেখালেখির বাতিক আছে। সে লেখক সংঘের অনুষ্ঠান থেকে বঞ্চিত হতে চায় না।

আজাদ বলে, ‘লেখকদের ফাংশানে গিয়ে আমি কী করব? আমি তো লেখক না। আমি বড়জোর দলিল লেখক সমিতির মেম্বার হতে পারি।’

 ‘আরে মেয়ে আসবে অনেক। চল যাইগা।’

মেয়ে দেখার লোভেই আজাদ, ফারুক, ওমর সবাই মিলে বিকেলে গিয়ে হাজির হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে। পাকিস্তান লেখক সংঘের আয়োজনে এই অনুষ্ঠান হচ্ছে। পাঁচ দিন ধরে হবে। অনুষ্ঠানের নাম মহাকবি স্মরণ উৎসব। রবীন্দ্রনাথ, ইকবাল, গালিব, মাইকেল মধুসূদন আর নজরুলকে নিয়ে একেক দিন অনুষ্ঠান হবে। আজকে পালিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ দিবস, আগামীকাল ইকবাল দিবস, পরশু ৭ই জুলাই ১৯৬৮ গালিব দিবস, ৮ই জুলাই মাইকেল দিবস আর ৯ই জুলাই নজরুল দিবস পালিত হবে পরপর।

বর্ষাকাল। আজকে সারা দিন বৃষ্টি হয়নি, তবে আকাশে মেঘ থাকায় গরমটা বেশি লাগছে।

আজাদরা যখন ঢোকে তখন আনিসুজ্জামান প্রবন্ধ পড়ছেন। ফারুক মন দিয়ে বক্তৃতা শোনে। আনিসুজ্জামান চমৎকার সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে এসেছেন, তাঁকে দেখতেও লাগছে নায়কের মতো। ফারুক আনিসুজ্জামানের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ। যেমন সুলিখিত, তেমনি সুপঠিত। আনিসুজ্জামানের গলার স্বরও মাশাল্লাহ লা-জবাব।’ (মা, সময় প্রকাশনী)

যারা ভোর এনেছিল, কিংবা উষার দুয়ারে উপন্যাসে আনিসুজ্জামানের কথা বেশ কবারই আছে। মা উপন্যাসে আছে।

 ৩. আমি যখন বঙ্গবন্ধু, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, তাজউদ্দীন প্রমুখকে নিয়ে লিখতে শুরু করব যারা ভোর এনেছিল, স্যারকে ফোন করলাম। স্যার, ভয়ে লিখব, নাকি নির্ভয়ে লিখব? স্যার বললেন, নির্ভয়ে লিখবে। এই কথাটা আমি ভুলতে পারি না।

স্যারের সেন্স অব হিউমারের কোনো তুলনা হয় না। আমি তাঁর সঙ্গে একবার এক মাস আমেরিকায় ট্যুর করেছি, নিউইয়র্ক মুক্তধারার আমন্ত্রণে। এমন মজার মানুষ আমি আর দ্বিতীয়টা দেখিনি।

‘আনিসুল হক, শোনো, একবার হলো কী!’ মানে স্যার এখনই একটা কৌতুককর সত্য ঘটনা বলবেন। কত যে গল্প শুনেছি তাঁর মুখে। এমনি একটা: একবার আমেরিকায় স্যারের প্রবন্ধ পাঠ ছিল। সভাপতি এক পাদরি। কিন্তু কোনো শ্রোতা নেই। হঠাৎ বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো। কিছু লোক বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে হলে ঢুকল। তাঁরা অনুষ্ঠান শুরু করতে যাবেন। সবাই বেরিয়ে গেল। বৃষ্টি থেমে গেছে। তখন সভাপতি অনুষ্ঠান শুরু করলেন। একজন বক্তা, একজন সভাপতি। ব্যস। সভাপতি বললেন, এবার প্রবন্ধ পাঠ করবেন আনিসুজ্জামান।

এই গল্প স্যার আমাকে শুনিয়েছেন।

৪. এই সেদিন, ফেব্রুয়ারির ২৭, ২০২০, দিল্লির সহিংসতার বিরুদ্ধে আনিসুজ্জামান স্যারসহ ১২ জন বিবৃতি দিয়েছেন। আর মাত্র সেদিন, ২৬ মার্চ ২০২০, আনিসুজ্জামান প্রথম আলোয় ‘মুজিব বর্ষে স্বাধীনতা দিবস’ শীর্ষক লেখায় লিখেছেন:

‘আগামী বছর এই সময়ে আমরা স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উদ্‌যাপন করব। তখন আমরা কেউ মাথা নিচু করে থাকব না। তখন সমস্বরে সকলে মিলে বাংলাদেশের জয়ধ্বনি গাইব। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যাঁরা জাতিকে অকুতোভয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের সকলকে শ্রদ্ধা নিবেদন করব।’

আগামী বছর স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী এই দেশে মাথা উঁচু করেই পালিত হবে। শুধু আনিসুজ্জামান, জীবন যঁার বাংলাদেশের ইতিহাস, তিনি থাকবেন না।

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

 

সুত্রঃ প্রথম আলো

শর্টলিংকঃ

প্রিয় পাঠক, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, [email protected] ঠিকানায়। অথবা যুক্ত হতে পারেন @silkcitynews.com আমাদের ফেসবুক পেজে। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।