বৃহস্পতিবার , ২৭ জুন ২০২৪ | ২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ছাদ ও বারান্দার গল্প । নূরুননবী শান্ত

Paris
জুন ২৭, ২০২৪ ৫:৫০ অপরাহ্ণ

ঘরের জানালা কোনো সময়েই না-খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কবি তাহের তাসকিন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছিল। ঘরআলার সাথে যতো কথা, তাহেরের। অপরাপর ঘরপ্রার্থীদ্বয় ঘর বিষয়ক যেকোনো আলাপ তাহের ব্যাতীত এমনকি নিজেদের মধ্যেও তুলবে না। এদিকে, সাকুল্যে ৫ হাজার টাকা ভাড়ার ১ হাজারমাত্র তাহের বহন করবে বলে শর্তে একঘরে থাকা। তারা একই পত্রিকার তিনজন। একজন সহকারী সম্পাদক, একজন ফটোগ্রাফার, আরেকজন নাইটগার্ড। ছাদের ঘর।

একমাত্র বাহ্যিখানাটি ঘরের বাইরে, কাপড় শুকানোর বারান্দা লাগোয়া, সেখানেই ধোয়াধোয়ির যাবতীয় কাজ সারতে হয়। তাহের ঘুমায় রাত ২ ঘটিকায়। কেননা মধ্যরাতে তার কর্মঘণ্টার পরিসমাপ্তি। অফিস থেকে বেরিয়ে ফলপট্টির কোণা থেকে এক পুটলি গাঞ্জা নিয়ে ঘরে ফিরতে মিনিট বিশেক যায়। আপরাপরের মধ্যে নাইটগার্ড বিরহ বয়াতি সকাল ৭টায় কাজঘরে এসে নীরবে শয্যা নেয়। বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি কথাশিল্পী বিষাদ বিবাগি বিছানার অধিকারী হন। ঘরে তাহের সশব্দে প্রবেশ নিলে বিষাদের ঘুম ভেঙে যায়। ঘরে এসেই তাহের কাইত হয়ে ঘুমায়। বিষাদ গল্প তখন লেখে, ফেসবুকে। সকালে বেরিয়ে যাবার সময় বিরহের সাথে নিঃশব্দ হাসি বিনিময় হয়, বিষাদের। বিরহ বয়াতি দেরি না করে ছদে গিয়ে এক কোণায় ধ্যানে বসে। এইভাবে, বাহ্যিখানায় লাইন দিতে হয় না, পারস্পারিক বাক্য বিনিময়ের সম্ভাবনাশূন্য প্রেক্ষাপটে সম্প্রীতির ভাব রক্ষা করা সম্ভব হয়। বাক্য বিনিময় মানেই মতবিরোধ, ও তার প্রভাবে সংঘাতের আশঙ্কা, তাহের বলে, এবং আশঙ্কা আয়ু কমিয়ে দেয়! ঘরআলা অবশ্য ভাড়াটিয়া বাসিন্দাদের সংখ্যা, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতে নাক গলান না। এই গল্পে তার ভূমিকা নিতান্ত ঘরমালিকের। তেনার সম্বন্ধ মাত্র তাহেরের সাথে। বাইরে থেকে কলিংবেলে ইশারা করার মাধ্যমে তাহেরের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন এমনভাবে তিনি করেন যেন তাহেরমেটরা তাহেরের উপভাড়াটে ছাড়া আর কেউ নয়। আর,ঘরের ভেতরের কোন দৃশ্যই ভাড়াটিয়ারা পরস্পরের থেকে আড়াল করার ফন্দি না করার শর্ত পালন করে। লোডশেডিং বাদে ঘরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ধবধবে আলো জ্বলে, ছাদের ঘরটিতে।

বিছানায় কাইত হওয়ামাত্র তাহের নাক ডাকতে থাকে। তবে তার নাকডাকা উপভাড়াটেদের জানারই কথা ছিল না, যদি পত্রিকা থেকে বিষাদ বিবাগির ফটোগ্রাফারের পোস্ট ক্লোজ না হয়ে যেতো করোনা মহামারী উপলক্ষে! এপ্রিল ২০২০। বিষাদ ছাঁটাই হবার পরদিনই, তাহেরের হোম অফিস শেষ হয়। অফিস থেকে বরাদ্দ করা নভোচারির পোশাক পরে অফিসে সে যায়। বিষাদ বিবাগি বিষণ্ন মনে ঘরেই থাকে স্থায়ীভাবে। তাহেরের মেজাজ খারাপ হয়। যেন ছাদের ঘরে আর ঘুম তার হবে না কোনদিন, এই ভেবে। অথচ, বিরহ বয়াতি ছেলেটা অমায়িক, এই কথা মনে হয় তার, সব রকম পরিস্থিতিতে নাইটগার্ডের চাকরিটা করে এবং সুন্দর সুন্দর গান গলায় তোলে! নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়ে, কেন যে কথাশিল্পী পরিচয় বিবেচনায় নিয়ে নিজের হাতে বিষাদ ডেকে আনা নির্ঝঞ্ঝাট জীবনে— বকতে বকতে অনলাইন বিভাগের সহকারী সম্পাদক তাহের তাসকিন নিজের লম্বা চুল ধরে আনমনে টানে খানিকক্ষণ, ঘরে ফিরে, মেঝেয় পাতা বিছানায় বসে, গভীর রাতের উজ্জ্বল আলোয়। ঘরের মধ্যে একটা লোক মুখ কালো করে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা বসে-শুয়ে আছে ভাবতেই গা গরম হয়ে যায়। সাত তলার ছাদ থেকে লাফ দিতে ইচ্ছে করে তাহেরের। রাত তিনটায় টিনের দুয়ারের তালা খুলে ছাদে এসে উবু হয়ে বসে মাথা নিচু করে। তারপর, বসে বসে বামহাতের তালুর ওপর ডান হাতের বুড়ো আঙুল ঘষে ঘষে গাঞ্জার বিড়ি বানায়। লম্বা টান দেয়। ইচ্ছেমতো সিদ্ধি সেবনের পর মন যেন শান্ত হয় সম্পাদক সাহেবের। তারপর চারপাশে চেয়ে দেখে। দূরের উজ্জ্বল বাতিগুলো চোখে লাগে। ফলে, চোখ বন্ধ করে একবার। তারপর, চোখ খুললে পরে, সামান্য চক্কর দেয় মাথাটা। অফিসের ক্যান্টিনে লাঞ্চ করার পর থেকে আর কিছু খায় নাই সে রাতে। ঘরে খাবার রাখতে চায় না। ভয়ে। বিষাদ মিয়া তিনমাস ধরে ভাড়া তো দেয়ই না, উপরন্তু তাহেরের বিস্কুট চুরি করে খায়। বিষাদকে খাওয়াবে না আর সে। তাই, নিজেও না খেয়ে মনে মনে হাসে। মধ্যরাত পার হয়ে গেলে, খালি পেটে গাঞ্জা খানিক বেশিই ধরে যায়। বসা থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই দেহ তার টাল খায়। সামলে নিতে এক হাত দিয়ে ছাদের রেলিং ধরে থাকে। কে যেন কাঁদছে কোথাও। আকুলিবিকুলি বিলাপ করছে কাছেই কোথাও! ভারী চোখের পাতা কচলিয়ে হালকা করে তোলে তাহের। দেখে, পড়শি দালানের সাততলার বারান্দায় ফোন কানে চেপে ধরে চাপা স্বরে ইনিয়ে বিনিয়ে কেঁদে চলেছে সেই মেয়েটা, যাকে সে প্রতিদিন ভোরবেলা বারান্দায় ভেজা কাপড় মেলতে দেখে। মেয়েটা চাপা স্বরে বিলাপ করে চলেছে— মা, মা গো, কিছু কও না ক্যানো মা, আমার জীবনটা এরকম হয়ে গেলো কেন মা? আজ আমি কতো যে একা, মা, কেউ তো নাই এই দুনিয়ায়! মা, মা গো, কিছু কও গো, মা, আমি এখন কি করবো, মা, কার কাছে যাব— তারপর একটানা উঁ উঁ উঁ করে কেঁদেই চলে মেয়েটা। তাহেরের বুকের ভেতরে হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যেতে থাকে। মেয়েটা এমন উদ্ভট স্বর বের করছে গলা দিয়ে যেন দম আটকে মরে যাবার মুহূর্ত এসে গেছে জীবনে তার। খুব জানতে ইচ্ছে করে তাহেরের, কী ঘটেছে মেয়েটার জীবনে। কিন্তু সে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ছাদের উল্টোদিকে গিয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটা যেন আর পারে না। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। ও মা গোওওওহো। তাহের আবার তাকায় বারান্দার মেয়েটার কান্নাকাটির দিকে। ঘোলা ঘোলা লাগে, পড়শি দালান, বারান্দা, মেয়েটার মুখ। কেবল একটানা আওয়াজ হতে থাকে বিশ্ব চরাচরে— উঁ উঁ উঁ উঁ উঁ! সান্ত্বনা দিতে ইচ্ছে করে দুঃখী মেয়েটাকে। ইচ্ছে তার করে জিজ্ঞেস করে কাছে গিয়ে, কিসের আঘাতে বুক ভেঙে তোমার টুকরো টুকরো হয়ে ঝুলে আছে গো বারান্দার রেলিংয়ে? কিন্তু, জিজ্ঞাসা সে করে না। কাজটা ঠিক হবে না, তার মনে হয়। উপযাচক হয়ে কিছুই করা ঠিক না। প্রতিদিন সে দেখে বটে মেয়েটাকে। ভোরবেলা। বারান্দার তারে কাপড় মেলে দিতে। তবু, চেনে তো না সে তাকে। মুখচেনা তো বড় কোনো কথা নয় এই জনারণ্যে। কথা বলতে গেলেই যদি সে মেয়ে ভেবে বসে যে, তাহের একটা সুযোগসন্ধানী ছোটলোক! যদি হট লাইনে তাহেরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ দেয়! জেন্ডার পাতার মেঘনা দি কিছুতেই ছাড়বে না এসব জানতে পেলে। জিরো টলারেন্স। না, সে চাকরিটা খোয়াতে চায় না করোনার দুর্বিপাকে। না, কথা সে বলবে না কিছুতেই। তাছাড়া, এমনও তো হতে পারে, তাহেরের মনে হয়, যে, মেয়েটার স্বামী আসলে করোনায় মরে গেছে। লাশ পড়ে আছে ঘরে। এবং সে কাছে যেতে পারছে না স্বামীর মরদেহের। সহমরণের ভয়ে আতঙ্কে একটানা কেঁদে কেঁদে নিজের মন শান্ত করছে— করুক। এ তাদের অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়। ফিসফিস করে একবার উচ্চারণ করে তাহের— ইয়া নাফসি! বাইরের মানুষ হয়ে কারো অভন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে দুর্দৈবে নিজেকে রক্ষা করাই ফরজ দায়িত্ব। হতে পারে যে, মেয়েটার দুই কামরার ফ্ল্যাটে কেউ আর নাই, তাই, মায়ের কাছে আকুলিবিকুলি করে বলা! কিংবা কে জানে হয়তো মায়ের কাছে নয়, নিজের কাছেই নিজের ভার লাঘব করা ‘মা’ডাক ডেকে! কিন্তু, থাক সে মেয়ে তার প্রাইভেসি সাথে নিয়ে। তবু, আহা, রাতের শেষদিকে কান্না গিলে ফেলতে কোনভাবেই পারছে না মেয়েটা, আহা, দেখতে সুন্দর সে, তাহের দেখেছে দূরত্ব বজায় রেখে কতোবার, ভোরবেলা, বারান্দার তারে কাপড় মেলে দিতে, বারান্দায় অনবরত জ্বলতে থাকা সাদা আলোয়! সুন্দর মেয়ে বিপদে পড়লে কিছুতেই সাহায্য করার কথা চিন্তা তাহের করে না। লোকে সন্দেহ করবে নির্ঘাত! বলবে, সুন্দর মেয়ের চোখে পানি দেখলেই মায়া জেগে ওঠে লুচ্চা ব্যাচেলর লোকটার চোখে। লোকটার চোখ ভালো না— কেউ না কেউ সকালবেলা বাড়িওয়ালাকে বলবে এই কথা। বলবে, বয়স্ক ব্যাচেলর ছেলেদের চিলেকোঠার ঘর থেকে বের করে দিতে। ফলে, মন খারাপ সে করে। মাথা তার আরও ভারী হয়ে আসে, যেন গলে পড়ে যাবে ওর সারাদেহ ছাদের ওপরে। আর মেয়েটা তা দেখে ফেললে পরে ভালো হবে না মোটেও। তাই, টিনের দুয়ার ঠেলে, আবার লাগিয়ে, তালা ঠিকমতো টিপে দিয়ে, ঘরে গিয়ে দেখে, শুকনো মুখ হা করে কাইত হয়ে ঘুমায় বিষাদ বিবাগি। বিচ্ছিরি ফটো। একজন কথাসাহিত্যিক কাম ফটোগ্রাফার এমন বাজে ভঙ্গিতে ঘুমাবে কেন! বিষাদের হা-মুখ দিয়ে লালা ঝুলে পড়ছে বিছানায়। তাহের তাসকিনের বমনেচ্ছা জাগে। বারান্দার রেলিং ধরে বাহ্যিখানায় গিয়ে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিতেই তার বমির বেগ বাড়ে। বাহ্যিখানার ভেজা মেঝেয় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা এক ধারি তেলাপোকার মরদেহের ওপর বমি করতে গিয়ে গা গুলিয়ে ওঠে। গলার কাছে খিল লেগে যায়। বমি হয় না কিছুতেই। বুকের ভেতরে বমি আটকে দম বন্ধ হয়ে আসে তাহের তাসকিনের। হাঁটু ভাঁজ করে বাহ্যিখানার মেঝেতে কাইত হয়ে শুয়ে পড়ে। সারা দেহ তার তেলাপোকার মতোই এমন হালকা লাগে যেন সে বাহ্যিখানার মেঝেয় জমে থাকা ছিপছিপে পানিতে ভেসে ছাদের ঘর ছেড়ে কোথাও দূরের দিকে যেতে থাকে। চোখ বন্ধ করে ওড়ে একা একা ভাসতে ভাসতে। বাইরে থেকে ভেসে আসা রাতের পাহারাদারের বাঁশির শব্দে ভয় পেয়ে আরও বেগে পাথা ঝাপটায়ে উড়তে উড়তে আকাশ থেকে নিচের দিকে পড়ে যেতে থাকে তাহের তাসকিন। নিচে, ছিপছিপে পানির সমুদ্রে সহস্র তেলাপোকা কিলবিল করে। তাহেরের কানের ভেতরে সহস্র তেলাপোকার পাখা ঝাপটানির শব্দ হতে থাকে। ফরফর ফরফর ফরফররর। শব্দটা বাড়ে।

বাইরে থেকে ভেসে আসা পাহারাদারের বাঁশির বিকট শব্দে ধরফর করে জেগে ওঠে বিষাদ বিবাগি। তাহেরের দেখা না পেয়ে ভাবে, ভাই হয়তো ছাদে গিয়ে তামুক খাচ্ছে আকাশের দিকে চেয়ে। আর, শুনতে পায়, কে যেন আকুলিবিকুলি করে কাঁদছে— মা, মা গো, কিছু কও না ক্যানো মা, আমার জীবনটা এরকম হয়ে গেলো কেন মা? আজ আমি কতো যে একা, মা, কেউ তো নাই এই দুনিয়ায়! মা, মা গো, কিছু কও গো, মা, আমি এখন কি করবো, মা, কার কাছে যাব, আমি তো কোন পাপ করি নাই। উঁ উঁ উঁ— মেয়েলি বিলাপ। সেও ছাদে গিয়ে দেখবে বলে ওঠে। দেখে, টিনের দুয়ার বন্ধই আছে। তালা ঝুলছে ঠিকঠাক। কী যে অসভ্যতা হচ্ছে আজকাল, ভাবে বিষাদ, এরকম নিস্তব্ধ সময়ে কেউ কি করে উচ্চসুরে কাঁদতে পারে! বিষাদ ছাদে যাবার টিনের দুয়ারের তালা খুলে ছাদ লাগোয়া পড়শি দালানের বারান্দায় একটি মেয়েকে কানে ফোন চেপে বিষন্ন সুরে গান গাইতে দেখে। কোনদিন দেখে নাই সে তাকে। বিষাদ বিবাগি কাছে গিয়ে দুর্বল গলায় বলে— এই যে, এতো রাতে কি হচ্ছে এসব? মেয়েটি কান্না থামায়। বিষাদের দিকে বিস্মিত হয়ে তাকায়। গালের ওপর তার অশ্রুবিন্দু ঝুলে থাকে। বারান্দার আলোয়। মেয়েটার বিস্ময় দেখে বিষাদ বিবাগি বিভ্রান্তবোধ করে। অথবা হঠাৎ করে একটা বিষণ্ন সুর থেমে যাওয়ায় বিষাদ বিবাগি আর কোনো কথা খুঁজে পায় না। তার মনে হয়, ঠিক হলো না কাজটা। সে বলে, সরি, আপনে কাঁদেন। চোখ মুছতে মুছতে মেয়েটা বলে, আপনার মুখটা এত শুকনা ক্যান, ভাই? এই কথা শুনে বিষাদের কান্না পায়। সে মাথা নিচু করে। নিচের দিক থেকে কয়েকটা কুকুরের বিচ্ছিরি ঘেউ ঘেউ এমনভাবে কানে লাগে যে বিষাদ কুকুর-কীর্তনের দিকে মাথা ঘুরিয়ে বলে ওঠে, কি অবস্থা দেখেন, পাহারাদাররা সব বাঞ্চোত একেকটা, বাঁশি বাজানো ছাড়া আর কিছু দায়িত্ব তারা বোঝে না! মেয়েটা ভাঙা গলায় বলে, সারাদিন কিছু খান নাই, তাই না? ইস, একটু আগেই সব খাবার নিচে ফেলে দিলাম! কুকুরগুলো তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি করতেছে মনে হয়! বিষাদ আবার বারান্দার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে— ফালায়ে দিলেন! মেয়েটা রেগে ওঠে, তো কি করবো? কুত্তার বাচ্চাটারে মুখে তুলে খাওয়াব? আইজ ঘরে আইসা দেখি, কুত্তার বাচ্চাটা একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে শুয়ে আছে দুয়ার খোলা রাইখা! মাথা ঠিক থাকে? হিল জুতা দিয়া কোমরের উপর দিছি ডলা। কুত্তার বাচ্চা ঘুইরা আমারে দেমাগ দেখায়, কয়, আমি নাকি খানকি! আমার খায়, আমার পরে, আবার আমারে কয়, আমি নাকি ভাড়া খাটি! আরে, কামাই তো করি আমি, তুই কি বুঝবি! তারপরে কি করি আমি কি করি? দুইটারেই বটি দিয়া আচ্ছা মতো কোপাইছি। আপনেই বলেন, ভাই, এখন দুইটা বডি নিয়া আমি কি করি, কার কাছে যাই! নিচে নামছিলাম একবার। দেখি, মেইন গেট বন্ধ। সকালের আগে খুলবে না। ছাদে যাইতে নিছিলাম একবার, লাফ দিব ভাবছিলাম, দেখি, ছাদের দরজা তালাবন্ধ। এখন তো ভয় লাগতেছে আমার। একলা লাগতেছে, ভাই! ঠিক তখন, ফজরের আজান হয়। আজানের পর আজান চলতে থাকে, কাছে এবং দূরে। মেয়েটা মাথার ওপর ওড়না তুলে দেওয়ার জন্য উল্টোদিকে ঘোরে। বিষাদ বিবাগি ঘুরে দৌড়ে ছাদের ঘরে প্রবেশ নিতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় টিনের দরোজার কাছে।

তারপর রাত শেষ হয়। ছাদের উপর, সকালে, সূর্যের আলো এসে পড়ার খানিক পড়ে বিরহ বয়াতি ডিউটি শেষ করে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতেসাততলার ছাদের দিকে উঠে যায়। ছাদে যাবার টিনের দুয়ারের পাশে বিষাদকে তেড়াবেকা হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস স্বাভাবিক করে নেয়। ভাবে, হায়রে, না-হয় চাকরি নাই একটা মানুষের, তাই বলে সব আশা ছাইড়া দিয়া এইরকম যত্রতত্র পইড়া থাকবে মানুষ! মানুষের দিল থাইকা বিশ্বাস উইঠে গেছে গা। কিন্তু ডাক দিয়ে বিষাদের ঘুম ভাঙ্গায় না। ঘরে গিয়ে লুঙ্গি পরে নিয়ে বাহ্যিখানায় গিয়ে ভেজা মেঝের উপর দেখে তাহের শুয়ে আছে, কাইত হয়ে। থাকুক। কারো বিষয়ে নাক গলানোর নিয়ম পেহেতু নাই, তাই, নিয়ম মেনে গোসল করা হয়ে ওঠে না বিরহ বয়াতির। দেয়াল থেকে দোতারা নিয়ে বিষাদকে ডিঙিয়ে ছাদের এক কোণায় বসে নিত্যকার গুণ গুণ রেওয়াজ সে করতে থাকে। দুপুর পর্যন্ত ছাদেই এভাবে রোদ বুঝে জায়গা বদল করে করে নিচু স্বরে রেওয়াজ করাও সেদিন হয়ে ওঠে না শেষ পর্যন্ত। পড়শি দালানের সাততলার বারান্দা থেকে এক পুলিশ ধমক দেয়, বলে, আপনে কেমন মানুষ মিয়া, এইখানে দুইটা বডি পড়ে আছে, আর আপনে দোতারা নিয়ে বসে আছেন? বিরহ বয়াতির প্রথমে মনে হয়, তাইলে তারা দুইজনা মইরে গেলো নিহি! ভাবতেই মাথার ভেতরে শন্ শন্ করে বদ হাওয়া বয়ে যেতে থাকে। আর, তার মনে হয়, পুলিশ কি তাকে সন্দেহ করতেছে! ফলে, সব ভাবনা-চিন্তা ঝেরে ফেলার জন্য বাবরি চুলে ঝাকি দেয় একবার। তারপর, চোখেমুখে নির্দোষভাব বজায় রেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়, মুখের উপর থেকে চুলের ঝুলে পড়া গোছা একপাশে সরিয়ে মুখের হাসি দেখিয়ে পুলিশকে বলে— কি কন! মরে নাই তো! ঘুমাইতেছে। চাকরি হারায়া হুঁসহারা হইছে, ভাই, শৃঙ্খলা কম, কিন্তু মানুষ ভালো।

আরে! বোকাচোদা নাকি! রক্তে দুনিয়া ভাসতেছে, আর সে বলে কিনা ঘুমাইতেছে! ডালমে কুচ কালা হ্যায়! কথাগুলো কাকে যে পুলিশ বলে, ঠিক বোঝা যায় না। তারপর, ‘ছার, ছার’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে বারান্দা থেকে পুলিশ সরে যায়। সাততলার ছাদ তখন নির্জন এক বিরাট শূন্য মনে হয়। শূন্যের কিনারায় ঝুলে সূর্যের আগুনে জ্বলেপুড়ে ভস্ম হয়ে যায় বিরহ বয়াতির দোতারার মাথায় বসে থাকা কাঠের টিয়াপাখি।

অলংকরণ রাজিব রায়

 

সর্বশেষ - শিল্প ও সাহিত্য

...