গেটম্যানের অবহেলায় আর কত প্রাণ যাবে?

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্কঃ

রেল দুর্ঘটনা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এলেও বড় দুর্ঘটনা থামানো যাচ্ছে না। বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে রেললাইনের ত্রুটি বা রেলক্রসিংয়ে গাড়িচালকদের গাফিলতির কারণে। এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে বড় দুর্ঘটনা ঘটছে রেলকর্মীদের গাফিলতিতে।

সম্প্রতি মিরসরাইয়ের রেলক্রসিংয়ে (২৯ জুলাই ২০২২ ) শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে খৈয়াছড়া এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় পর্যটকবাহী মাইক্রোবাসের ১১ যাত্রী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও সাতজন। হতাহতরা সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী এবং তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমান বাজার এলাকায়।

 কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দেখে দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের কোনো শাস্তি বা ক্ষতিপূরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না তাহলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিনিয়োগের কোনো তাগিদ সেই প্রতিষ্ঠানের থাকে না। বিপরীতক্রমে দুর্ঘটনা ঘটলে যদি তার পুঙ্খানুপঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার পূর্বশর্ত ও অন্তরালের বিভিন্ন কাঠামোগত কারণ উন্মোচন করে তার জন্য সংশ্লিষ্টদের সকলকে শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের মুখোমুখি করা হয় তাহলে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সকল ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বনে বাধ্য হয়।

দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনছার আলী জানান, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসছিল ‘মহানগর প্রভাতী’ এক্সপ্রেস। খৈয়াছড়া এলাকায় একটি লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস লাইনে উঠে পড়ে। সংঘর্ষের পর মাইক্রোবাসটি ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে যায়। ওই অবস্থায় মাইক্রোবাসটিকে বেশ খানিকটা পথ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে থামে ট্রেন।সেসময় রেল কর্মকর্তা আনছার দাবি করেন, ‘ট্রেন আসায় সিগন্যাল পেয়ে গেটম্যান সাদ্দাম বাঁশ ফেলে ব্যারিকেড দিয়েছিলেন। কিন্তু মাইক্রোবাসটি বাঁশ ঠেলে ক্রসিংয়ে উঠে পড়ে।’

পরে পূর্বাঞ্চল বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ আবুল কালাম চৌধুরী দাবি করেন, ‘ঘটনার সময় গেটম্যান উপস্থিত ছিলেন। তিনি বার বার লাল পতাকা উঁচিয়ে তাদের বারণ করলেও মাইক্রোচালক শোনেননি। তার অবহেলার কারণেই এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শী মফিজুল হক দাবি করেন, দুর্ঘটনার সময় সেখানে কোনো গেইটম্যান ছিলেন না। তিনি জুমার নামাজ আদায়ে মসজিদে গিয়েছিলেন।

দুর্ঘটনার চালচিত্র
‘রেলপথে দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৯’ অনুসারে ৩৯৩টি রেল দুর্ঘটনায় ৮৯ নারী ও ৪৬ শিশুসহ ৪২১ জন নিহত এবং চার নারী ও ৩৩ শিশুসহ ৩৬৬ জন আহত হয়েছে। আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেব অনুসারে ২০১৯ সালে রেলপথে ৪৮২টি দুর্ঘটনায় ৪৬৯ জন নিহত ও ৭০৬ জন আহত হয়েছে।

২০২১ সালে রেল পথে ২৭০টি দুর্ঘটনায় ২৫৪ জন নিহত ও ৪২ জন আহত।বাংলাদেশে রেল দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে আর সবেচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষে। চলুন দেখা যাক এসব দুর্ঘটনার পেছনে কাঠামোগত সমস্যার ভূমিকা কি।

২০০৮-০৯ থেকে ২০১৭-১৮ এই দশ বছরে মোট ২ হাজার ৪২৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে লাইনচ্যুত হয়ে দুর্ঘটনা ২ হাজার ১৫৫ টি যা মোট দুর্ঘটনার ৮৯ শতাংশ।

ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ: বাংলাদেশ রেলওয়ে ইনফরমেশান বুক ২০১৮ থেকে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৭-১৮ এই দশ বছরে মোট ২ হাজার ৪২৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে লাইনচ্যুত হয়ে দুর্ঘটনা ২ হাজার ১৫৫ টি যা মোট দুর্ঘটনার ৮৯ শতাংশ। আর ট্রেন লাইন চ্যুত হয়ে দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ দায়ী তার মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ রেলপথ, ইঞ্জিন বা বগির যান্ত্রিক সমস্যা, সিগনাল ব্যবস্থার সমস্যা, বিভিন্ন ধরনের মানবীয় ভুল ও নিয়ম অমান্য করা ইত্যাদি।

সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুসারে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় সর্বোচ্চ। ক্ষমতাসীন সরকার ১১ বছরে রেলের উন্নয়নে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। উচ্চব্যয়ে রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প নিতে যতটা উৎসাহ দেখা যায়, ততটাই নিরুৎসাহ বিদ্যমান রেলপথ ও রেলসেতু সংস্কারে। ফলে সারা দেশে মানসম্পন্ন রেললাইন রয়েছে ৭৩৯ কিলোমিটার, যা মোট রেললাইনের মাত্র ২৫.২৩ শতাংশ।

রেলসেতু ঝুঁকিপূর্ণ ৪০২টি। লাইনে পাথরস্বল্পতা, রেলক্লিপ ও নাট-বল্টু চুরি হয়ে যাওয়ায় নড়বড়ে ট্র্যাক মেরামতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও যন্ত্রাংশের অভাবে রেললাইনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথের পাশাপাশি ২৭৮ ইঞ্জিনের মধ্যে ১৯৫টির এবং ১ হাজার ৬৫৬টি কোচের মধ্যে ৯০০টির আয়ু শেষ। আবার এগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজও সঠিক ভাবে করা হয়না। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রেলের পূর্বাঞ্চলে ২০ শতাংশ বগি বার্ষিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মেরামত ছাড়াই চলছে। লোকবলের অভাব এবং বগির স্বল্পতার কারণে এই কাজ হচ্ছে না।

অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলে মিটারগেজের ১২ শতাংশ এবং ব্রডগেজের ৮ শতাংশ বগি সময়মতো মেরামত হয়না। আবার, একটি যাত্রীবাহী ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছালে এর ইঞ্জিন ও বগি ৪৫ মিনিট ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার নিয়ম। এ সময় বগি ধোয়া-মোছা, কলকব্জা পরীক্ষা করার কথা। কিন্তু এই কাজে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এ ছাড়া তিন মাস পরপর মেরামত কারখানায় নিয়ে বগির দিনব্যাপী পরীক্ষা-নিরীক্ষার নিয়ম আছে। এক বছর পর কারখানায় নিয়ে বড় ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মেরামতের কথা। এসবের জন্য বরাদ্দও আছে। কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজটাই ঠিকভাবে হয় না

ট্রেন থামানোর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা না থাকা:
গত ১২ নভেম্বর ২০১৯ ভোর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মন্দবাগ স্টেশনে অপেক্ষমান সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী ‘উদয়ন এক্সপ্রেস’কে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস’। এতে ১৭ জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হন। দুর্ঘটনার কারণে রেল মন্ত্রণালয় এবং রেলওয়ে চারটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে। এর মধ্যে তিনটি কমিটির প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে দুর্ঘটনার কারণ চালকের অসর্তকতা।

‘তূর্ণা নিশীথা’র চালক তাসির উদ্দিন তিনটি সিগন্যাল অমান্য করে স্টেশনে প্রবেশ করে ‘উদয়ন এক্সপ্রেস’কে ধাক্কা দেয়। ট্রেন থামাতে সময়মত ব্রেক করেননি চালক। ভ্যাকুয়াম খুলে দিয়ে ট্রেন থামানোর সুযোগ ছিল গার্ডের কিন্তু গার্ড সেই দায়িত্ব পালন করেননি। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পাঁচটি সুপারিশ করে তদন্ত কমিটিগুলো। এগুলো হলো- ট্রেনের লোকোমোটিভে (ইঞ্জিনে) সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে যুক্তদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত কর্মচারীদের শূণ্য পদ দ্রুত পূরণ করা, স্টেশন ও ট্রেনের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা এবং স্বয়ংক্রিয় ট্রেন থামানো (এটিএস) পদ্ধতি চালু করা।

এখন প্রশ্ন হলো এক ট্রেনের সাথে আরেক ট্রেনের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা তো বাংলাদেশে প্রথম নয়। ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর নরসিন্দীতে গোধূলি ও চট্টলা – এই দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছিল কারণ চট্টলার চালক সিগনাল অমান্য করেছিল। রেলওয়ের তদন্ত রিপোর্টে তখন বলা হয়েছিল চালক ভৈরব স্টেশানে চা পান করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় নাকি এই সংকেত অমান্য করার ঘটনাটি ঘটেছিল! ৫৯ চালক অজ্ঞান হোক, ঘুমিয়ে পড়ুক বা অবহেলা করুক, প্রশ্ন হলো একই ধরনের দুর্ঘটনা দ্বিতীয়বার কেন ঘটবে? এতদিনেও কেন ট্রেন চালনার সময় চালকদের উপর নজরদারি, স্টেশন ও ট্রেনের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা কিংবা স্বয়ংক্রিয় ট্রেন থামানোর ব্যবস্থা চালু করা হলো না?

অরক্ষিত রেলক্রসিং:
রেল দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে আর সবেচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষে। রেলওয়ের হিসাব অনুসারে, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৮৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটে।

এসব দুর্ঘটনায় ১১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। লেভেল ক্রসিংয়ে ৯৬টি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯৯ জন। তাঁদের প্রায় সবাই ক্রসিং পার হতে যাওয়া বাস, মাইক্রোবাস ও ছোট যানবাহনের আরোহী। রেলক্রসিং পারাপারের সময় যেসব পথচারী প্রাণ হারান, সেই হিসাব রেল কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে না।

রেলওয়ের হিসাবে, সারা দেশে রেলক্রসিং আছে ২ হাজার ৫৭৪টি। এর মধ্যে অনুমোদিত রেলক্রসিং ১ হাজার ৪৬৮টি। অর্থাৎ ৪৩ শতাংশ ক্রসিং অবৈধ। অনুমোদিত বলতে, সংশ্লিষ্ট সংস্থা রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের সময় রেলের অনুমোদন নিয়েছে। ক্রসিংগুলোতে প্রতিবন্ধক ও অবকাঠামো তৈরি এবং কর্মী নিয়োগের পর ১০ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দেওয়ার পরই অনুমতি পাওয়া যায়। ফলে অনুমোদিত ক্রসিং সুরক্ষিত রাখা রেলের দায়িত্ব। অথচ প্রতিবন্ধক, পাহারাদার এবং ট্রেন চলাচলের খবরাখবর জানা যায় এমন ব্যবস্থা আছে মাত্র ৫৬৪টি ক্রসিংয়ে। অর্থাৎ বৈধ বাকি ৯০৪টি ক্রসিংয়েও কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। এসব ক্রসিংয়ে সতর্কবার্তা–সংবলিত সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দায় সারছে রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে বার বার দুর্ঘটনা ঘটছে যে দুর্ঘটনাগুলো সহজেই প্রতিরোধযোগ্য।

রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে মোট রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৭৪। এগুলোর মধ্যে অনুমোদন নেই ১ হাজার ৪৬৮ টির। অর্থাৎ ৪৩ শতাংশ ক্রসিং অবৈধ। অনুমোদিত বলতে, সংশ্লিষ্ট সংস্থা রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের সময় রেলের অনুমোদন নিয়েছে। আর এসব ক্রসিংয়ের বেশির ভাগই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়কে। আরও আছে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) সড়কে।

সব মিলিয়ে দেশের ৮২ শতাংশ রেলক্রসিংই অরক্ষিত।রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, রেলপথে দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি হয়, এর ৮৫ শতাংশই মারা যান রেলক্রসিংয়ে। অবশ্য রেললাইনে কাটা পড়ে মৃত্যুর হিসাব রেল কর্তৃপক্ষ রাখে না। মুখোমুখি সংঘর্ষ, লাইনচ্যুতি, এক ট্রেনকে অন্য ট্রেনের ধাক্কা, রেলক্রসিংয়ে গাড়িকে ট্রেনের চাপা—এসবকে দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রেলওয়ের নথিপত্র অনুসারে, ২০১৫ সাল থেকে রেলক্রসিংকে নিরাপদ করতে ১৯৬ কোটি টাকা খরচ করেছে রেলওয়ে। দুটি প্রকল্পের আওতায় রেলের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে ৭০২টি রেলক্রসিং উন্নয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫৩২ জন। রেলক্রসিং উন্নয়নের মধ্যে প্রতিবন্ধক বসানো ও পাহারাদারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এরপরও রেলক্রসিং নিরাপদ হয়নি।

রেললাইনের ওপর উড়ালপথ নির্মাণে এক যুগের বেশি সময় ধরে আলোচনা চলছে। সওজ অল্প কিছু মহাসড়কের উড়ালসড়ক নির্মাণ করেছে। অন্যগুলোতে উড়ালসড়ক নির্মাণ কে করবে, সেটাই ঠিক করতে পারছে না সংস্থাগুলো। ফলে অরক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

এর আগে ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর নরসিংদীতে চট্টগ্রামগামী গোধূলীর সঙ্গে ঢাকাগামী চট্টলার মুখোমুখি সংঘর্ষে চালক জহির মিয়াসহ ১৩ জন নিহত হন। চট্টলার চালক সংকেত অমান্যের কারণে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ নিয়ে রেলের পূর্বাঞ্চল গঠিত। এই অঞ্চলে যাত্রী বেশি পরিবহন হয়। পদ্মা নদীর পশ্চিম পারের জেলাগুলো নিয়ে রেলের পশ্চিমাঞ্চল গঠিত।

পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক কার্যালয়ের এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০১০ সালে ২০৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালে ১৬৫, ২০১২ সালে ১৩৮, ২০১৩ সালে ১৬৭ এবং ২০১৪ সালে ১৪৭টি দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার হার কমে এলেও ২০১৩ ও ২০১৪ সালে নাশকতার কারণে দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। ওই সময় দেশে অস্থিরতা বিরাজ করছিল।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে ২০১৫ সালে দুর্ঘটনা কমে আসে। ওই বছর ৮৮টি, ২০১৬ সালে ৬৭টি, ২০১৭ সালে ৭১ এবং ২০১৮ সালে ৭২টি দুর্ঘটনা নথিভুক্ত করে পূর্বাঞ্চল। আর ২০১৯ সালরর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে দুর্ঘটনা হয় ৫০টি।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাপরিচালকের কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে ৮৮টি রেল দুর্ঘটনায় মারা যান ১৫ জন। ২০১৪ সালে ১৪৭ দুর্ঘটনায় মারা যান ১৯ জন। ২০১৬ ও ২০১৭ সালের দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি ঘটেছে, তার বেশির ভাগই হয়েছে রেলক্রসিংয়ে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত কমিটি প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর গাড়িচালকদের অসতর্কতাকে দায়ী করেছে। দুই বছরে রেলক্রসিংয়ে ২৮টি মাঝারি আকারের দুর্ঘটনার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৫টি দুর্ঘটনার জন্যই যানবাহনচালকদের দায়ী করেছে রেলের তদন্ত কমিটি। কেবল একটি দুর্ঘটনার জন্য গেটম্যানকে দায়ী করা হয়েছে।

বাংলাদেশে নিয়মিত ঘটতে থাকা বিভিন্ন দুর্ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায় এমন সব কাঠামোগত কারণে বার বার মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনা ঘটে যার অধিকাংশ কারণই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা থাকার কথা ঙএবং সুনির্দিষ্ট কতগুলো পদক্ষেপ নিলে সেইসব দুর্ঘটনার হার বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু নানা কারণে এই অতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো না নেয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা চলমান থাকাই বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য লাভজনক, ফলে এসব গোষ্ঠির প্রভাবে কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের পথে বাধা তৈরি হয় । আবার দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য যে বাড়তি বিনিয়োগ করতে হয় তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হলেও তাৎক্ষণিক লাভ লোকসান বিবেচনায় অনেকেই এই বিনিয়োগটুকু করতে চায় না। আর এ কারণেই নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি এক্ষেত্রে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দেখে দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের কোনো শাস্তি বা ক্ষতিপূরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না তাহলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিনিয়োগের কোনো তাগিদ সেই প্রতিষ্ঠানের থাকে না। বিপরীতক্রমে দুর্ঘটনা ঘটলে যদি তার পুঙ্খানুপঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার পূর্বশর্ত ও অন্তরালের বিভিন্ন কাঠামোগত কারণ উন্মোচন করে তার জন্য সংশ্লিষ্টদের সকলকে শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের মুখোমুখি করা হয় তাহলে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সকল ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বনে বাধ্য হয়।

[email protected]

 

সুত্রঃ জাগো নিউজ