গাড়ি ও ফল আমদানির আড়ালে অর্থপাচার

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক:

বিলাসবহুল গাড়ি ও ফল আমদানির আড়ালে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে। মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখিয়ে এ টাকা পাচার করেছেন অসাধু আমদানিকারকরা। ডলার সংকটেও অর্থপাচার থেমে নেই। যেখানে ডলার সংকটে ঋণপত্র বা এলসি খুলতে হিমশিম খাচ্ছেন শিল্প মালিকরা, সেখানে আমদানির আড়ালে চলছে অর্থপাচার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে ভোগ্য পণ্যের দাম এখন নিম্নমুখী। নানা পদক্ষেপের পরও আমদানি ব্যয় তেমন কমেনি। অথচ বাড়েনি কাস্টম ও কর থেকে সরকারের আয়। এই তথ্য আমদানির আড়ালে অর্থপাচার বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডলার সংকট না কাটলে প্রায় সব শিল্পে কাঁচামালসংকট দেখা দেবে। তাই ডলারের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থপাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা দরকার। ডলার সংকটে আমরা তিন মাস এলসি করতে পারিনি। পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নানা অভিনব উপায়ে অর্থপাচার হয়ে যাচ্ছে। খোলাবাজার থেকে অনেকে ডলার কিনেও পাচার করছে। যারা বিদেশ যাচ্ছে, তারাও নির্ধারিত কোটার বাইরে বেশি ডলার নিয়ে যাচ্ছে। এটা দেখা হচ্ছে না। রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়ালে এই সংকট শিগগিরই কাটবে না।’

বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে অর্থপাচার : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে চট্টগ্রাম ও মোংলা কাস্টম হাউস দিয়ে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে আনা সাত থেকে আটটি চালানের কাগজপত্র জব্দ করেছেন গোয়েন্দারা।

সূত্র জানিয়েছে, গত বছর দেশে প্রায় ২৫ হাজার গাড়ি আমদানি করা হয়। এর মধ্যে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা গাড়িগুলোর মধ্যে মিত্সুবিশি, মার্সিডিজ বেঞ্জ, নিউ হোন্ডা সিভিক, এক্সপ্যান্ডাও আছে। এসব গাড়ি আমদানিতে গড়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম মূল্য ঘোষণা করে টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। শুল্ক গোয়েন্দার তদন্তে এ রকম ৩০ থেকে ৪০টি গাড়ি আমদানিতে টাকা পাচারের ঘটনা বেরিয়ে এসেছে। রিকন্ডিশন্ড গাড়িগুলো আসে প্রধানত জাপান থেকে। নতুন গাড়ি আনা হয় জার্মানি, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশ থেকে। অল্প কিছু নতুন গাড়ি আসে জাপান থেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার জানিয়েছেন, এক লাখ ডলারের মার্সিডিজের দাম ঘোষণা করা হয় মাত্র ২০ হাজার ডলার। বাকি অর্থ হন্ডিতে পাঠানো হয়।

শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের একটি সূত্র বলেছে, আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের অভিযোগে চট্টগ্রাম, কমলাপুর আইসিডি ও মোংলা কাস্টম হাউসের বেশ কিছু বিলাসবহুল গাড়ির চালান আটকে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারক ও পরিবেশক সমিতির (বারভিডা) সভাপতি হাবিব উল্লাহ ডন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে বছরে প্রায় ২৫ হাজার রিকন্ডিশন্ড গাড়ি বিক্রি হয়। বর্তমানে নতুন ও রিকন্ডিশন্ড মিলিয়ে গাড়ির বাজার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার। বাজারের ২৫-৩০ শতাংশ নতুন গাড়ির দখলে। ডলার সাশ্রয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে এলসি মার্জিন শতভাগ করায় গাড়ি আমদানি একেবারেই কমে গেছে। এতে ব্যবসার পরিসর কমে আসছে এবং গাড়ির দাম বেড়ে যাচ্ছে।’

অভিনব উপায়ে ফল আমদানি : এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ফল আমদানি বেড়েছে প্রায় ৯৭ শতাংশ। ২০২২ সালে পাঁচ হাজার ১৭ কোটি টাকার ফল আমদানি করা হয়েছে, যা ২০২১ সালে ছিল দুই হাজার ৫৫০ কোটি টাকা।

এনবিআর সূত্র বলছে, ফল আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অর্থ পাচার করা হচ্ছে। ফল আমদানিতে নিরুৎসাহ করতে আমদানি শুল্ক বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও এখনো কার্যকর হয়নি। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এলসিতে ঘোষণা ছিল ফল আমদানির, আমদানি হয়েছে সিগারেট। এলসি খোলা হয়েছে তিন হাজার ডলারের (প্রায় দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা), কিন্তু আমদানি করা হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকার। আরব আমিরাতে পাচার করা হয়েছে সেই টাকা। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক কোনো ঠিকানা যাচাই ছাড়াই খুলেছে হিসাব। আর সেই হিসাব থেকে একে একে চারবার এলসি করে পাঠানো হয়েছে টাকা। প্রতিবারই ফল আমদানির নাম করে পাঠানো হয়েছে টাকা। আর আমদানি করা হয়েছে সিগারেট।

অর্থপাচার প্রসঙ্গে মানোয়ার হোসেন বলেন, ‘ডলার সংকট মোকাবেলায় আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তার পরও অর্থপাচার চলছে। আন্ডার ইনভয়েসিং-ওভার ইনভয়েসিং ঠেকানো এই ডিজিটাল যুগে কঠিন কিছু নয়। আমরা শুনি খেজুর আমদানি হয় ১২ টাকা কেজিতে, আর বিক্রি হয় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে। যে কাস্টমস কর্মকর্তা খেজুরের অ্যাসেসমেন্ট করেন তিনিও তো খেজুর কেনেন। তাঁর মনে কি কোনো প্রশ্ন আসে না? অর্থপাচার ঠেকাতে এনবিআরসহ সবাইকে তৎপর হতে হবে। বাংলাদেশিরাই যদি বিদেশে টাকা নিয়ে যায়, তাহলে বিদেশিরা কেন এ দেশে টাকা নিয়ে আসবে।’

যেভাবে অর্থ পাচার করা হচ্ছে : পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য অতিরিক্ত দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণেও ধরা পড়েছে। আমদানি-রপ্তানির আড়ালে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অর্থপাচারের কথা সম্প্রতি আবারও বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

গত কয়েক মাসের আমদানির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি জানান, ‘বেশি দামের পণ্য কম দামে এলসি খুলে বাকি অর্থ হুন্ডিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এক লাখ ডলারের মার্সিডিস বেঞ্জ গাড়ি মাত্র ২০ হাজার ডলারে আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে। বাকি অর্থ হুন্ডিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার আমদানি করা বিভিন্ন পণ্যে ২০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত ওভার ইনভয়েস (আমদানি মূল্য বাড়িয়ে দেখানো) হয়েছে। গত জুলাই মাসে এমন আশ্চর্যজনক প্রায় ১০০টি ঋণপত্র বন্ধ করা হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পণ্য আমদানিতে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ মানেই হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংক চ্যানেলেই বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। পণ্যের মূল্যের নামে পাঠানো অতিরিক্ত অর্থ পরবর্তী সময়ে বিদেশেই আমদানিকারকের পক্ষে কেউ গ্রহণ করছে। অন্যদিকে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ ব্যবহার করা হয় পণ্য রপ্তানিতে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ওভার ইনভয়েসিংয়ের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে বহির্বিশ্বের বছরে গড়ে ৭৫৩ কোটি ডলারের গরমিল রয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা।

অর্থপাচার রোধে করণীয় : সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দেশে অর্থপাচারের যেসব মামলা হচ্ছে, তার কোনো কূলকিনারা নেই। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে অর্থপাচার থামবে না। অর্থপাচার মামলায় আইনি ব্যবস্থা জোরদার করতে পৃথক ট্রাইব্যুনাল করতে হবে। যারা বিদেশ পালিয়েছে, তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেশে এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

সূত্র: কালের কণ্ঠ