গরুর মাংস না পেয়ে কুকুরের মাংস রান্না করে খাওয়ায় বাবুর্চি

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম 

 

সারদা পুলিশ একাডেমিতে ৪২ দিনের প্রিলিমিনারি স্টাফ কোর্স ( পিএসসি ) প্রশিক্ষনের সময়ে জানতে পারি, আমাকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অর্থাৎ কুড়িগ্রাম জেলা থেকে বান্দরবান জেলায় বদলি করা হয়েছে। বাংলাদেশের তিন পাহাড়ি জেলার মধ্যে বান্দরবান একটি। অপর দুটি হলো রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি। প্রথমে খারাপ লেগেছিল, ভয়ও পেয়েছিলাম। কারণ প্রায় শুনতাম সেখানকার শান্তি বাহিনি এবং ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কথা। তাছাড়া বান্দরবান দেশের আরেক প্রান্তে হওয়ায় তখনকারদিনে সেখানে যেতেই তিনদিন সময় লেগে যেত।

একসপ্তাহ পর চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে যোগদান করার পর আমাকে বান্দরবান জেলার রুমা থানার ওসি হিসেবে বদলি করা হয়। পরেরদিন বান্দরবানে আসি। বান্দরবান শহরটি ছিমছাম সুন্দর। শহরের একপাশে শংখ নদী এবং চারিদিকে পাহাড়। নদীর দু’ধারে সু-উচ্চ সবুজ পাহাড়। শহর থেকে রুমা থানার দূরত্ব ৫০ কিমি। তখন পাহাড়ের ওপর দিয়ে রাস্তা না থাকায় যাতায়াতের একমাত্র উপায় ছিল শংখ নদী। নৌকাযোগে রুমা থানায় যেতে সময় লাগে প্রায় ৫/৬ ঘন্টা।

পরেরদিন সকাল ০৮টার সময় বান্দরবান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে বান্দরবান জেলা সদর থেকে রুমা থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। যেতে যেতে দেখা যায় বেতছড়া বাজার। বাজারটির একপাশে সেনাবাহিনির একটি চেক পোস্ট। নৌপথে যেতে হলে এই চেক পোস্টে নাম নিবন্ধন করতে হয়। কিছু দূরে রয়েছে কেউচ্যারাং ছড়া। ছড়াটির কোনো অংশে পানির গভীরতা ১০-১২ ফুট। অসংখ্য ছোট-বড় ঝরনা থেকে সৃষ্টি হওয়া ছড়া মিশেছে শংখ নদীতে। এগুলোর মধ্যে পাইনছড়া, শুয়ালকছড়া, দুপা ছড়িছড়া, ঘেরাওছড়া, পালংছড়া, চেমাছড়া, পানতলাছড়া, ক্যারাংছড়া, খুলিমছড়া অন্যতম। যাওয়ার পথে শংখ নদীর দু’ধারে বিশাল পাহাড়ের সৌন্দর্য এবং নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। বাংলাদেশ যে এতো পাহাড় আছে তা আমার জানা ছিল না।

বান্দরবানের পাহাড় আর ঘন অরণ্য প্রকৃতির অপার বিশ্বাস। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ, যা দু’চোখে প্রশান্তি এনে দেয়। প্রকৃতির দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর চোখ বন্ধ করলেও চোখে থেকে যায় সবুজের আভা। দেখা যায় সবুজ পাহাড়ের সাথে ঝরনার অপূর্ব মিলনমেলা আর পাহাড়ের জঙলের মাঝে গয়াল(বনগরু). বনমোরগ আর হরিন। শোনা যায় মন উদাস করা কোকিলের কহুতান। বাংলাদেশ যে কত সুন্দর একটি দেশ তা ঘুরে না দেখলে বোঝাই যায় না। তাইতো কবির ভাষায় বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতে হয় — বিশ্ব কবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রুপসী বাংলা রুপেই যে তার নেই কো শেষ।

দুপুরের দিকে রুমা থানার ঘাটে আমাদের নৌকা পৌঁছে যায়। থানাটি একটি ছোট পাহাড়ের ওপর মাটি কেটে সমতল ভূমিতে অবস্হিত। থানার মধ্যে এবং চারিপাশে সেগুনগাছ সারিবদ্ধভাবে লাগানো। থানাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। থানার সামনে নিচে শংখ নদী এবং চারিদিকে বিশাল বিশাল পাহাড়। বর্ষার দিনে পাহাড়ি ঢলে শংখ নদী ডুবে গিয়ে প্রচুর খরস্রোতা এবং ভয়ঙ্কর রুপ ধারন করত। রুমা থানাটি ভারতের মিজোরাম, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসংলগ্ন। থানায় ফোর্সের সংখ্যা ছিল ১৫০ জন। ঘাটে নেমে পাহাড় কেটে বানানো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে যেতেই বদলি হওয়া ওসি পরিচয় পেয়ে আমাকে স্বাগত জানান। পরেরদিন তিনি আমাকে রুমা থানার দায়িত্বভার অর্পণ করে নতুন কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। একদম নতুন পরিবেশ ও জায়গায় খাপ খাওয়াতে যে কতদিন লাগবে তা চিন্তা করতে থাকি। কারন এখানে কখনও আসিনি এবং এই প্রথম পাহাড়ি এলাকায় আমার চাকরি। কিন্তু আস্তে আস্তে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে ফেলি।

একদিন থানার অফিসে বসে কাজ করার সময় সংবাদ পাই যে, রুমা উপজেলা Magistrate সাহেবের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। তাঁকে হাসপাতালে জরুরিভাবে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর অবস্হা ভালো নয়, অনবরত বমি করেই যাচ্ছেন। তাঁকে দেখার জন্য তৎক্ষনিক উপজেলা হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সেখানে গিয়ে দেখি লোকে লোকারন্য। তিনি অনবরত বমি এবং ওয়াক থু করেই যাচ্ছেন। ঔষধ খাওয়ানোর পরও তার বমি বন্ধ হচ্ছে না। কর্তব্যরত চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, তাঁর বাসার উপজাতি বাবুর্চি গরুর মাংস না পেয়ে তাঁকে কুকুরের মাংস রান্না করে খাইয়েছে। বিষয়টি জানার পর থেকে তাঁর এই বেহাল অবস্হা। ঘটনার পর থেকে বাবুর্চি পলাতক রয়েছে।

বিস্তারিতভাবে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ওইদিন সকালে Magistrate সাহেব বাজার থেকে গরুর মাংস আনার জন্য তাঁর বাবুর্চিকে পাঠান। বাবুর্চি বাজার থেকে ঘুরে এসে জানায়,’ ওইদিন মিটলেস ডে ‘ তাই গরু জবাই হয়নি। একথা শোনার পর তিনি রেগে গিয়ে বাবুর্চিকে বলেন, যেভাবেই হোক পাহাড়ি গ্রাম থেকে গরুর মাংস এনে রান্না করো। তা-নাহলে তোমাকে চাকরি থেকে থেকে বাদ দিব। চাকরি হারানোর ভয়ে বাধ্য এবং কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বাবুর্চি ওইদিন পাহাড়ি গ্রাম থেকে কুকুরের মাংস কিনে এনে মশলা দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে ভুনা করে রান্না করে খেতে দেয়।

খাওয়ার একপর্যায়ে মাংসের স্বাদ অন্য ধরনের হওয়ায় এবং চিকন হাড় পাওয়ায় Magistrate সাহেবের মনে সন্দেহ হয়, এটি গরুর মাংস না অন্য কিছু? জিজ্ঞাসায় বাবুর্চি বলে, স্যার আপনি নিশ্চিন্তে খেতে পারেন। এটি গরুর মাংস। কিন্তু একটি হাড় চিবানোর সময় হাড়টি সলিড হওয়ায় এবং হাড়ের ভেতর কোন ক্যালসিয়াম না থাকায়, তদুপরি হাড়টি নরম হওয়ায় Magistrate সাহেব বুঝতে পারেন যে এটি গরুর মাংস নয়। বেশ কয়েকবার ধমক দিলেও বাবর্চি স্বীকার করে না। বরং বারবার জোর দিয়ে তার দেবতার দোহাই দিয়ে বলতে থাকে এটি গরুর মাংস। কিন্তু Magistrate সাহেব নাছোড়বান্দা। তিনি কিছুতেই বাবুর্চির কথা মেনে নিতে পারেন না। অবশেষে পুলিশে ধরিয়ে দিবেন বলায় বাবুর্চি Magistrate সাহেবের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরে নিজের দোষ স্বীকার করে বলে,স্যার ভুল হয়েছে। আমাকে মাফ করে দিন । আমি আর কখনও এধরণের কাজ করব না। গরুর মাংস না পেয়ে সে চাকরি বাঁচানোর জন্য কুকুরের মাংস কিনে এনে রান্না করেছে। একথা শোনার পর তিনি সেই যে বমি করা শুরু করেন, আর থামার নাম নেই। অসুস্থ হয়ে তাঁকে উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এদিকে এরই এক ফাঁকে সেই বাবুর্চি ভয়ে পালিয়ে যায়। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ঘটনাটি এলাকায় আলোড়ন ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। এর কিছুদিন পর Magistrate সাহেব বদলি নিয়ে অন্যত্র চলে যান।

চাকরি জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটতে দেখেছি যা সবসময় লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। এসব ঘটনা আমি ধারাবাহিকভাবে বর্ননা করব। এসব ঘটনা আমার স্মৃতিপটে অম্লান হয়ে থাকবে।

 

লেখক ও কলামিস্ট :

শর্টলিংকঃ

প্রিয় পাঠক, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, silkcitynews@gmail.com ঠিকানায়। অথবা যুক্ত হতে পারেন @silkcitynews.com আমাদের ফেসবুক পেজে। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।