‘কী মজার স্কুল’

‘এই দিন দিন নয় আরও দিন আছে/এই দিনেরে নিবে তোমরা সেই দিনেরও কাছে’। সুপ্রিয় কুদ্দুস বয়াতির এই দারুণ সুন্দর গানটি কদিন ধরেই গুনগুন করছি। আমি বিশ্বাস করি, করোনাক্লিষ্ট এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে। তবে যারা এই বিষাদময় দিনকে ভবিষ্যতের সূর্যকরোজ্জ্বল দিনে নিয়ে যাবে, গানের সেই ‘তোমরা’ গত প্রায় দেড়টি বছর যাবৎ নেতিয়ে পড়া গোলাপকলির মতো চুপসে ছিল। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা—১২ সেপ্টেম্বর স্কুল-কলেজ খুলবে—অনেকটা সেই ম্রিয়মান চুপসে পড়া গোলাপকলির ওপর বারিসিঞ্চনের মতো। ‘আবার জমবে মেলা, বটতলা-হাটতলা’। তবে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, পাজী ভাইরাসটা যেন আনন্দোচ্ছল কোমলমতি শিশু-কিশোরকে খোদা-না-খাস্তা বাগে পেয়ে আবার না আক্রমণ করে বসে।

শুধু আমাদের নয়, সারা বিশ্বের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অকল্পনীয় ক্ষতি হয়ে গেল গত দুই বছরে। কারো কম, কারো বেশি। যেসব দেশ করোনা মোকাবেলায় সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়েছে, যাদের পর্যাপ্ত অর্থবিত্ত আছে, যাদের লোকেরা বিশেষজ্ঞদের আদেশ-নির্দেশ-উপদেশে মোটামুটি কর্ণপাত করে, শহর-বন্দর-গ্রামের সব ছেলেমেয়েদেরই কম্পিউটার-স্মার্টফোন ইত্যাদি আছে, সেসব দেশের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বিঘ্নিত হলেও অন্তত আট আনা ক্ষতি তারা এরই ভেতর পুষিয়ে নিয়েছে। বিদ্যাশিক্ষার ব্যাপারে ওসব দেশে কোনো ছাড় দেওয়া-দেওয়ি নেই, নেই কোনো প্রকার দুই নম্বরি ব্যাপার-স্যাপার—না সরকার, না শিক্ষার্থী, না শিক্ষক কোনো পর্যায়েই না। আর ওসব দেশের নাগরিকরা তো বিদ্যাশিক্ষাকে ঐতিহ্যগতভাবেই অগ্রাধিকার দিতে অভ্যস্ত।

মুশকিল হলো, আমাদের মতো ‘সারা অঙ্গে ব্যথা, মলম লাগাই কোথা’ মার্কা দেশে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করাই একটা কঠিন কাজ। এখানে শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে গেলে স্বাস্থ্য বলবে আমাকে বাদ দিলে কিন্তু তোমাদের পল্লী অঞ্চল এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া এলাকার কোটি কোটি মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে। ঠিক আছে, তা হলে যোগাযোগ খাত, কৃষি খাত এবং শিক্ষা খাতের মতো কিছু কিছু বড় বড় খাতে কাটছাঁট করা হোক। অমনি কেউ বলবে এই অসুবিধা হবে, কেউ বলবে ওই অসুবিধা হবে এবং শেষ পর্যন্ত সেই যে বলে ‘ভাগের মা গঙ্গা পায় না,’ অবস্থা তাই দাঁড়াবে। আরও খোলাসা করে বললে বিভিন্ন খাতের আয়-উন্নতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের এবং কম্পিউটারের মগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কথা উঠলেই বলা হবে : অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হোক। মোসাহেবরা বলবে অবশ্যই। আজই অনলাইন চালু করা হোক। কেউ যদি বলে কিন্তু, স্যার, অনলাইন কি তা তো আমাদের দপ্তরেরই বেশির ভাগ লোক জানে না। আর তার জন্য যে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও প্রশিক্ষিত লোকবলের দরকার তাও তো নেই। মফস্বলের একজন ওভারস্মার্ট সবজান্তা শিক্ষক যদি বলেন, অনলাইন মানে হচ্ছে, স্কুল বন্ধ তো তাই ‘অন দ্য রেলওয়ে লাইন’ (রেললাইনের ওপর) ছেলেমেয়েদের ‘সামাজিক দূরত্ব’ (শারীরিক নয়) বজায় রেখে বসিয়ে ক্লাস নিতে হবে। এক ভালো মানুষ সহকারী শিক্ষক বেচারা জানতে চাইলেন, সামাজিক দূরত্ব মানে কী? প্রধান শিক্ষক ধমক দিয়ে বললেন, তাও বোঝেন না? সামাজিক দূরত্ব হচ্ছে চেয়ারম্যান সাহেবের ছেলের পাশে চৌকিদারের ছেলে, মিয়া বাড়ির মেয়ের পাশে ঘুঁটে কুড়ানির মেয়ে বসবে না। ফলাফল? কয়েক মাস পর দেখা গেল মফস্বলের শতকরা ৮০ ভাগ স্কুলে করোনাকালে কোনো লেখাপড়াই হয়নি। শহরের অনগ্রসর এলাকাগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। কম্পিউটার-স্মার্টফোন জীবনে চোখে দেখেনি, ইন্টারনেট কী জানে না, এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যাই গ্রামাঞ্চলে ও বস্তি এলাকায় বেশি।

২.

ছ’সাত বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে স্কুলের ওপরের ক্লাসের সব ছাত্র-ছাত্রীর মনে ক্ষোভ একটাই : আজ কতদিন হয়ে গেল স্কুলে যাই না। কতদিন ধরে মন্টু-শন্টু-পিন্টুদের সঙ্গে দেখা হয় না, খেলাধুলা-মারামারি-খুনসুটি হয় না, শেফালি যে রঙিন চুলের ফিতা পরদিন সালেহাকে দেবে বলেছিল তা আর দিতে পারেনি—তার মা-বাবা ওই ক্লাস এইটে পড়ুয়া পুঁচকিকে নাকি চুপি চুপি বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। ইস্, সে বেচারি প্রত্যেক বছর ওই দামড়া আব্বাসটাকে পেছনে ফেলে পরীক্ষায় ফার্স্ট হতো। তার লেখাপড়া জন্মের মতো বন্ধ হয়ে গেল।

গত দেড় বছর স্কুল বন্ধ থাকলেও কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের অটো প্রমোশন দিয়ে দিয়েছেন। এতে করে তা ছেলেমেয়েরা ফুর্তিতে আনন্দ-মিছিল বের করার কথা। কিন্তু হচ্ছে তার উল্টো। এ জন্যও তাদের মন খারাপ। তারা জানে বাকি সারা জীবন এই ‘অটো’ ব্যাপারটা তাদের নানাভাবে জ্বালাবে। ‘অটো’ তাদের সব ব্যাপারে খাটো করে রাখবে। কথায় কথায় খোঁটা শুনতে হবে : হবেই তো। দেখতে হবে না, এরা কোন ব্যাচ? এরা তো সেই করোনা ব্যাচ। আর করোনা মানেই তো কিছুই ‘করো না,’ কাজকর্ম-লেখাপড়া-খেলাধুলা, পরীক্ষা সবই তো এদের মাফ ছিল। এরা তো স্কুলে কিছুই শিখেনি।

করোনাকালে স্কুল-কলেজ পুরোপুরি বন্ধ রাখাটা কেন জানি মনে হয় অনেকটা হাতের আন্দাজে করা হয়েছিল। অনেকটা মাথা ধরার ভয়ে মাথা কেটে ফেলার মতো। এ ব্যাপারে হয়ত অনেক চিন্তা-ভাবনা, বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবু কথা থেকে যায়। যে-দেশে বিকল্প অনলাইন ইত্যাদি ব্যবস্থা চালু করার জনবল ও উপকরণের অভাব তীব্র, বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় যে দেশের বেশির ভাগ অভিভাবকের কম্পিউটার ল্যাপটপ (শীতে একটা লেপই জোটে না, তার আবার ল্যাপটপ!), স্মার্টফোন ইত্যাদি অতীব প্রয়োজনীয় উপকরণকে বিলাস-সামগ্রী মনে করাই বাস্তবচিত্র সেখানে অনলাইন-রেললাইন নয়, কড়াকড়িভাবে স্বাস্থ্যবিধি পালন, অর্ধেক ক্লাস রুম-অর্ধেক শিক্ষার্থী, মুক্তাঙ্গন, গাছতলা ইত্যাদি নানা বিকল্প ব্যবস্থা অন্তত পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে দেখা যেত। এতে করে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী হতাশাক্রান্ত রাম গরুড়ের ছানা না হয়ে শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর থাকত। আর নবীনদের-তরুণদের এই প্রাণচাঞ্চল্যই হচ্ছে একটি জাতির জীবনীশক্তি, যা জাতির চলার পথে গতিসঞ্চার করে। প্রাণচাঞ্চল্য ফুরিয়ে গেলে জাতির মৃত্যু অনিবার্য।

আমি বলে রাখলাম, দেখবেন দেড় বছর পর স্কুলে ফিরে-গিয়ে প্রত্যেকটি শিশু-কিশোর-কিশোরী প্রথমেই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে একচোট হাসাহাসি নাচানাচি করবে, আনন্দাশ্রু ঝরাবে, করোনাসৃষ্ট শোকবার্তাগুলো শুনবে ও শোনাবে। প্রথম দিনটা কাটবে বহুদিনের অদেখার পর প্রিয়জনকে দেখার আনন্দ-বেদনার মধ্য দিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে আবার ফিরে যাবে ক’দিনের জন্য পালিয়ে যাওয়া হাসি-কান্নার রোদে-বন্যায় কলকলানো ক্লাসরুম, খেলার মাঠ, খুনসুটি, মারামারি, কিলাকিলি, নালিশা-নালিশির দিনগুলোতে। বিকেলে যখন ঘরে ফিরবে তখন মা দেখবেন তার দশ বছরের যে ছেলেটি বা মেয়েটি চল্লিশ বছরের বুড়োটি-বুড়িটি হয়ে দেড় বছর হৈ-চৈ হাসি ভুলে সারাক্ষণ মনমরা হয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকত, ক’ঘণ্টার স্কুল জীবনের পর সে আবার তার প্রাণোচ্ছল সোনামনি হয়ে নেচে-গেয়ে, আনন্দ-ফুর্তি করে ভাইবোন পাড়াপ্রতিবেশী সবাইকে মাতিয়ে তুলেছে। ওর মা যেমন খুশি হয়েছেন তাঁর পুষ্পবৎ সন্তানকে আবার প্রস্ফুটিত হতে দেখে, তেমনি সারা জাতি আজ আনন্দিত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসতে দেখে। বিদ্যালয়গুলোর চেয়ার-টেবিল-বেঞ্চে যেমন ধুলা জমেছে দীর্ঘদিন ধরে, মানুষের মনের ঈশান কোণেও জমাট বেঁধেছে হতাশা, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার কৃষ্ণমেঘ। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের কর্মহীন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন গৃহবন্দি জীবন, চারপাশের অন্তহীন মৃত্যুর মিছিল, সমস্যার জাঁতাকলে পিষ্ট অস্তিত্ব, দিন দিন যেন পৃথিবী নামক চিরচেনা আবাসস্থলটিকে অচেনা করে তুলছে। দুঃসংবাদ নির্বাসনে পাঠিয়েছে সুসংবাদকে। এরই মধ্যে খুলছে স্কুল। সুপ্রিয় কুদ্দুস বয়াতির গানের ‘কী মজার স্কুল’।

৩.

এই যে স্কুল-কলেজ, মক্তব-মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে এ যেন পৃথিবীর আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে ওঠার লক্ষণ। যেন হারানো ছন্দ ফিরে পাওয়ার পূর্বাভাস। যেন ‘তৃণ ক্ষুদ্র অতি/তারেও বাঁধিয়া বক্ষে মাতা বসুমতী/ কহিছেন প্রাণপণে, যেতে নাহি দিব’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘যেতে নাহি দিব’ : সোনার তরী)—এই বিধিদত্ত বিশাল দায়িত্ব ভুলে গিয়ে পৃথিবী করোনাকে তার ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার ও জি এল (ওপেন জেনারেল লাইসেন্স) দিয়ে সুপ্তিমগ্ন হয়ে পড়েছিল, হঠাৎ জেগে উঠে আবার নিজ রাজ্যপাট গুছিয়ে নিতে মনোযোগী হচ্ছে। এবং আমার বিশ্বাস, পৃথিবী শিগগিরই করোনা নামক এই দৈত্যটাকে বলবে : ‘ইনাফ ইজ ইনাফ’, যথেষ্ট হয়েছে, এবার তুই মানে মানে আবার ওই বোতলে ঢুকে পড়। নইলে আর কোনোদিন তোকে আমার জল-হওয়া চাখতে বাইরে বের হতে দেবো না।… সবই হবে, সব কিছুই ফিরে যাবে আগের ধারায়, শুধু ফিরে আসবে না, আসবে না কোনোদিন যারা চলে গেছে তারা। এই নির্মম সত্যকে মেনে নিয়ে, পুরাতনের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করতে হবে এই গ্রহের মানুষকে। আর তার সম্মুখ সারির অভিযাত্রী হবে আজকে যারা স্কুলে ফিরে এসেছে নতুন দিনের সূর্যের আলোয় অবগাহন করতে করতে তারা। যারা প্রবীণ, যারা জরাক্রান্ত, বয়সের ভারে ন্যুব্জদেহ যারা, তারা তাদের পালা শেষ করে বিশ্রামপর্বে চলে যাবে, ধড়াচূড়া-উষ্ণীষ রেখে যাবে নবীন সেনাপতিদের জন্যে। তোমরাই সেই সেনাপতি, নবীন বন্ধুরা আমার।

৪.

বহুদিন পর স্কুলে গিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছ দেহমনে এক দারুণ পুলকানুভূতি নিয়ে। ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসছে না তোমার। বারবার মনে পড়ছে বন্ধুদের কথা, স্যারদের কথা, শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, বৃক্ষতলের কলকাকলি, এমনকি ঘণ্টা পেটানো দারোয়ান ভাইয়ের কথা। এরা সবাই মিলে সলা করে তোমার চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, বলছে : ‘এতদিন পরে এই যে আবার ফিরে এলে, জানো তুমি কেন এলে?’ তুমি বলবে, ‘জানি না আবার। স্কুলে এসেছি লেখাপড়া করতে, বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে খেলাধুলা করতে, পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে ওপরের ক্লাসে উঠতে। তারপর একদিন চাকরিবাকরি না হয় ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। সবচেয়ে বড় কথা দেশের ও দেশের মানুষের সেবা করতে চাই।’ তোমার জবাব শুনে সবাই করতালি দেবে। তাদের সঙ্গে আমিও যোগ দেবো অদৃশ্য থেকে।

আর তোমার অনুমতি নিয়ে, বন্ধু, নিবেদন করব কয়েকটি কথা : তোমার জীবনের যে দেড়টি-দু’টি বছর করোনার কারণে লেখাপড়ার জগত থেকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত অবস্থায় হারিয়ে গেল, যে দারুণ ক্ষতি হয়ে গেল তোমার জীবনে, এর জন্য তুমি কিন্তু মোটেই ভেঙে পড়বে না। তুমি ভাববে, এর চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছুও তো হতে পারত। তোমার পরিচিত জগতের অনেকেই—কেউ কেউ অকালে—চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে, তুমি তো আল্লাহর অশেষ কৃপায় বেঁচে আছ। অতএব তুমি এখন থেকে লড়াই করবে সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। তুমি পারবে সেই লড়াইয়ে জিততে। কারণ একাত্তরে তোমার পূর্বপুরুষেরা করোনার চেয়েও এক ভয়ঙ্কর রাক্ষসের বিরুদ্ধে প্রায় খালি হাতে লড়াই করে এক চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল, ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। সেই বীর মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই করেছিল, শহীদ হয়েছিল বলেই আজ তুমি তোমার প্রিয় স্কুলে যেতে পারছ, স্বপ্ন দেখছ একদিন দেশের, দেশের মানুষের সেবা করবে। অতএব সোনা, আজ থেকে প্রতিজ্ঞা করো নিজেকে একজন যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মনপ্রাণ দিয়ে লেখাপড়া করবে। আর একটুও সুযোগ ও সময় নষ্ট হতে দেবে না। মনে রাখবে, দেশের লক্ষ লক্ষ সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোর সুযোগ ও সামর্থ্য না থাকার কারণে স্কুলে যেতে পারে না। আজকে তোমার ঘুম আসছে না অনেক সুন্দর স্বপ্ন তোমার চোখে ভিড় করছে বলে, আর ওইসব শিশুরাও, কিশোর-কিশোরীরাও ঘুমাতে পারছে না রাতে পেটে দানাপানি কিছু পড়েনি বলে। তোমার শপথ হবে, এ দেশের গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর। তোমাকে একদিন ‘কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়’ হতে হবে, সোনা। তুমি অন্যায়-অত্যাচারকে, দুর্নীতিকে, সততা-প্রবঞ্চনাকে নরকের কীটের চেয়েও বেশি ঘৃণা করবে। আর সত্য ও ন্যায়ের জন্য, ইনসাফের জন্য, অসহায় দুর্বলের জন্য জীবন বিসর্জন দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হবে না তুমি।

আর শোনো, আরেকটি কথা বলে শেষ করি। আজ তুমি শিশু, কিশোর, দু’দিন পর তুমি পা দেবে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে। সেটা কী? সেটা যৌবন। ওই সময়টাতে তুমি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা পার করবে। এরপরেই তো শুরু হবে তোমার কর্মজীবন। মনীষীরা যার নামকরণ করে গেছেন জীবনযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ধনী-গরিব, শক্ত-অশক্ত সকলকেই নামতে হবে। এতে কোনো ছাড় নেই। আর সেই সমরাঙ্গনে অবতীর্ণ হওয়ার আগে নিজেকে ‘অস্ত্রশস্ত্রে’ সজ্জিত করতে হবে যৌবনকালেই। কাজেই প্রিয় বন্ধুরা, এখন থেকেই প্রস্তুত হও জীবনযুদ্ধের জন্য।

শেষ তো করব কিন্তু শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও অভিভাবকবৃন্দের প্রতি সামান্য আরজ না করে যাই কী করে। বেআদবি হয়ে যাবে না? এই অশীতিপর আমি ষাটের দশকে জীবন শুরু করেছিলাম একজন শিক্ষক হিসেবে। (প্রথমে হরগঙ্গা কলেজ, মুন্সিগঞ্জে নয় মাস ও পরে সিলেট এম. সি. কলেজে তিন বছর।) তখন আমার একটা উপলব্ধি হয়েছিল : একজন শিক্ষককে রোজ পড়াশুনা করতে হবে তার ছাত্রের চেয়েও বেশি। আর শিক্ষকতা কোনো পেশা নয়, এটা একটা ‘প্যাশন’, প্রবল অনুরাগ বা বিশেষ প্রেম। আর শিক্ষার্থী লেখাপড়ায় ভালো হোক আর মন্দ হোক শিক্ষকের সন্তানবৎ। তার ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর শিক্ষক। তবে হ্যাঁ, সেই কারিগর আগে নিজেকে অবশ্যই দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।

আর শ্রদ্ধেয় অভিভাবকগণ, আপনাদের কী আর বলব। করোনা কিন্তু কিছু বিষয় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়ে গেল। যেমন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। আসুন না, এগুলো আমরা নিজ নিজ পরিবারে খাবার খাওয়া, কাপড় পরার মত অভ্যাসে পরিণত করি। আর ছেলে বা মেয়েটির সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করে সে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশে, এসবের খোঁজ-খবর নেই। মনে রাখবেন, নীড় ছেড়ে পাখি একবার উড়ে চলে গেলে আর ফিরে নাও আসতে পারে।

আজকের লেখাটি তো নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নিবেদিত। তাই শেষ করি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে আমার প্রিয় কয়েকটি পঙিক্ত উচ্চারণ করে : যৌবন বসন্তসম সুখময় বটে/দিনে দিনে উভয়ের পরিণাম ঘটে।/কিন্তু পুনঃ বসন্তের হয় আগমন/ফিরে না ফিরে না আর ফিরে না যৌবন। অতএব বন্ধুরা, জীবনের মধুরতম সময় শৈশব, কৈশোর ও যৌবনকে কিছুতেই বৃথা যেতে দেবে না, অবশ্যই অর্থবহভাবে কাজে লাগবে।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি
mkarim06@yahoo.com

 

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ