করোনার ধাক্কা রপ্তানি খাতে: লক্ষ্যমাত্রার ৩৬ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট, প্রবৃদ্ধি কমিয়ে ১২ শতাংশ নির্ধারণ

রপ্তানিমুখী শিল্প খাতকে ৬৭ হাজার কোটি টাকার সহায়তা দেওয়া হয় করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় চারটি প্যাকেজের আওতায়। সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের প্রত্যাশা ছিল এসব প্রণোদনা সুরক্ষা দেবে এ খাতকে।

কিন্তু আশঙ্কা থেকেই গেল রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে। এমন শঙ্কা থেকে চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে এসে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমিয়ে ১২ শতাংশ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর ফলে রপ্তানি কমবে ৩৬ হাজার কোটি টাকা (৪২৫ কোটি মার্কিন ডলার)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আগাম পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শুধু চলতি অর্থবছর নয় আগামী ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি খুব বেশি বাড়বে না। চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের সংশোধিত প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ধরা হয়েছে ১২ শতাংশ। সেখানে বলা হয় অভ্যন্তরীণ শিল্পে পণ্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চলতি অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কাটছাঁট করা হয়েছে।

সেখানে আরও বলা হয়, সরকার কোভিড-১৯ এর প্রভাব থেকে রপ্তানি খাতের উত্তরণে কাউন্টারসাইক্লিক্যাল’ ব্যবস্থা হিসাবে আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানিমুখী শিল্পের কর্মীদের বেতন-ভাতার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল।

এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাত উদ্যোক্তাদের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকার মূলধনী ঋণ সুবিধা এবং রপ্তানি উন্নয়ন ফান্ড ১৭ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি। পাশাপাশি প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট ফাইন্যান্সিং প্রকল্পে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

কেমন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন জানতে চাইলে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান বলেন, করোনায় তিন হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি অর্ডার বাতিল হয়েছে। এর পরও ফ্যাক্টরি খোলা রেখে ব্রেক ইভেন্ট মূল্যে পণ্য বিক্রি করছি। তবে তিনি আশা করছেন চলতি অর্থবছরে গার্সেন্টস শিল্পে তিন হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের আয় হবে। ফারুক হাসানের মতে, থেমে যাওয়া পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। তবে আগামী অক্টোবর থেকে পরিস্থিতি ভালোর দিকে যেতে পারে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।

২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় চার হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের আয় ছিল তিন হাজার ৩৬৭ কোটি ডলার। এরপর ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে চলতি অর্থবছরে। কিন্তু এখন সেটি ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। টাকার অঙ্কে এটি তিন হাজার ৬৭৪ কোটি ডলারে নেমে আসে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবির হিসাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে এই ১১ মাসে আয় হয়েছে তিন হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। বাকি এক মাসে অবশিষ্ট ৫৮২ কোটি ডলার অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

করোনার কারণে তৈরি পোশাকের রপ্তানির বাজারও ভালো যাচ্ছে না। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার হিসাবে ২০১৪ সালে বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাকের বাজার ছিল ৪৮ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। সেখানে ২০১৯ সালে কমে ৪১ হাজার ৯০০ ডলারে নেমেছে। তবে ২০২০ সালের তথ্য এখন প্রকাশ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে ২০২০ সালে বাজার আরও কমবে। চলমান মহামারীর কারণে বিশ্ববাণিজ্য এবং পোশাক রপ্তানির বাণিজ্য নেতিবাচক অবস্থায় চলছে। এরই একটি ধাক্কা এসেছে দেশের রপ্তানি খাতের ওপর।

চামড়া রপ্তানিকারক মো. ইব্রাহিম ভুট্টো জানান, করোনার দুটি ধাক্কার কারণে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন। আগামী দিন কেমন যাবে, করোনায় ক্ষতি বাড়বে কিনা এসব পর্যবেক্ষণ করে স্বল্প পরিসরে অর্ডার দিচ্ছে কিছু ক্রেতা। এতে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না।

পাশাপাশি যে ক্ষতি হচ্ছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে আরও দুই থেকে তিন বছর চলে যাবে। কিন্তু ফ্যাক্টরি যেন বন্ধ না হয় সেজন্য সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। ইপিবির হিসাবে জুলাই থেকে মে এই নয় মাসে চামড়া খাতের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমছে ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এদিকে মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক ছোট ও এসএমই পণ্য উদ্যোক্তাদের অবস্থাও ভালো না।

করোনার কারণে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের টুপি রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার নিজপাড়া ও পীরগাছা উপজেলার হাসনা গ্রামসহ কয়েকটি গ্রাম থেকে হাতে তৈরি টুপি মধ্যপ্রাচ্য রপ্তানি করে আসছে দীর্ঘ দিন। এ কাজে গ্রামীণ হতদরিদ্র প্রায় ২৫ হাজার নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে কাজ হারানোর শঙ্কা ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এদিকে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে ৮০টি পান এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই টাকাতে। কারণ একদিকে পান রপ্তানি বন্ধ, অপর দিকে ক্রেতা নেই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, রপ্তানি খাত উন্নয়নে সরকার নানা ধরনের কৌশল নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, নতুন নতুন মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন ও রপ্তানি খাতের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি, বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোসহ সরবরাহের দিকের সমস্যা নিরসনের চেষ্টায় রপ্তানিকারকদের লিড টাইম কমানো, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে।

 

সূত্রঃআমাদের সময়

আপনার মতামত দিন

This website uses cookies.