উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল হয়ে ঢাকায় গেলো প্রথম ট্রেন


রফিকুল ইসলাম

আন্তঃনগর মধুমতি ট্রেন। রাজশাহী থেকে এতোদিন প্রতিদিন সকালে ছুটে যেত ফরিদপুরের ভাঙা স্টেশনে। বছরের পর বছর ধরে এই ট্রেনটি সকালে রাজশাহী থেকে আবার বিকেলে ভাঙা থেকে যাতায়াত করত। গতকাল শুক্রবার সকালেও চিরাচারিত নিয়মেই সেই ট্রেনটি রাজশাহী স্টেশন থেকে ছাড়ার প্রস্তুতি নেয়। তবে কাল ট্রেনটি ঘিরে যাত্রীদের মাঝে ছিলো যেন উৎসবের আমেজ। অন্যান্য দিন যে পরিমাণ যাত্রী হয়, গতকাল তার চেয়েও ছিলো প্রায় দ্বিগুন। ট্রেনঘিরেও ছিলো যাত্রীদের ছবি ও সেলফি তোলার ভিড়। হঠাৎ কী এমন হলো লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা এই ট্রেনের যে, প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেন নিয়ে যাত্রীদের এতো মাতামাতি? এমন প্রশ্ন ছিলো স্টেশনে আসা অন্য ট্রেনের কিছু যাত্রীর মুখেও। যারা জানতে না এই মধুমতি গতকাল থেকে শুধু ভাঙা পর্যন্ত গিয়েই তার দূরন্ত গতি থামবে না। ভাঙা পার হয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর বুক ছুয়ে যাবে ঢাকায়। এর পর বিকেল ৩ টায় ঢাকার কমলাপুর স্টেশন থেকে আবার ভাঙ্গাসহ ২০টি স্টেশন ছুয়ে ফিরবে গ্রীণসিটি রাজশাহীতে। ট্রেনের ৮টি বগির মধ্যে সবকটি বগিতেই গতকাল ছিলো উপচেপড়া ভিড়।

এই ট্রেনের যাত্রী আমিরুল হোসেন শান্ত বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। কিন্তু আমি দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহীতে বসবাস করি। সেই কারণে মধুমতি ট্রেনে প্রায় যাতায়াত করি। তবে আজকে যাচ্ছি একই ট্রেনে ঢাকায়। মূলত ট্রেনে চড়ে স্বপ্নের পদ্মাসেতু দেখতে যাচ্ছি। অনেকদিন ধরেই পদ্মা সেতু দেখার সখ ছিলো। আজ সেটি পূরণ হচ্ছে। পাশাপাশি ট্রেন ভ্রমণও হচ্ছে। আমরা ৬ জন যাচ্ছি পদ্মা সেতু দেখতে। মনের মাঝে এত ভালোলাগা কাজ করছে যে, সেটি বুঝানো মুশকিল। কেবলই অনুভূতিতে সেই ভালোলাগার বহিঃপ্রকাশ সম্ভব।’

ট্রেনের আরেক যাত্রী ইসলামী ব্যাংকের রাজশাহীর বানেশ্বর শাখার ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকায় বিশেষ কাজে যাচ্ছি। অন্যান্য দিন সিল্কসিটি, পদ্মা, ধুমকেতু বা বনলতায় যায়। কিন্তু আজকে মধুমতিতে যাচ্ছি। একটু সময় বেশি লাগবে, এই ট্রেনটিও ঢাকা-রাজশাহী রুটে যাতায়াতা করা অন্য ট্রেনের মতো ভালো না। প্রায় লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা। তার পরেও উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের পদ্মা সেতু হয়ে যাবে মধুমতি। তাই কিছু কষ্ট স্বীকার করে পদ্মা সেতু দেখতে মধুমতিতেই যাচ্ছি। মনের মনের মাঝ অসাধারণ এক আনন্দ উপলব্ধি করছি।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের রেলের আজ থেকে আরেকটি মাইলফলক রচিত হলো। তবে এই ট্রেনটি পরিবর্তন করে এ পথে আরও উন্নত ট্রেন দরকার। তাহলে দূরের এই পথ পাড়ি দেয়া যাত্রীরা ট্রেনের আধুনিক সুযোগ সুবিধাও পাবেন।’

ট্রেনের টিটিই সাব্বিরুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক ভ্রমনপীপাসু মানুষ উঠেছেন মধুমতি ট্রেনে। শুধুমাত্র পদ্মা সেতু দেখার জন্য, অনেকেই উঠেছেন ঢাকা যাওয়ার জন্য। আবার অনেকেই উঠেছেন পাবনা, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ি, ফরদিপুরের যাত্রী। যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন রাজশাহীতে। তবে ঢাকায় যাওযার কারণে যাত্রী সংখ্যা বেড়েছে। ভাঙা পার হয়ে পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকায় যাওযার কারণে এই রুটে যাত্রী সংখ্যা কখনো কমবে বলে মনে হয় না। বরং আমরা টিকিটই দিতে পারব না।

রাজশাহীর জেষ্ঠ্য সাংবাদিক ৮১ বছর বয়স্ক মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম বলেন, ‘রেলের ইতিহাসে নতুন দিগন্ত ফুটে উঠলো। উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাচল হয়ে ট্রেন যাবে ঢাকায়, এটি ছিলো এতোদিন স্বপ্ন। সেটি পূরণ হলো। এর সঙ্গে বাড়তি পাওয়া হিসেবে যোগ হয়েছে পদ্ম সেতু দর্শণ। শুধু পদ্মা সেতু দেখতেই রাজশাহী থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে যাবে এই ট্রেনে।’

তিনি আরও বলেন, রাজশাহী-ঢাকা রুটে চারটি ট্রেন চালু আছে। তার পরেও টিকিট সঙ্কট লেগেই থাকে। মধুমতি যুক্ত হওয়ায় সেই সঙ্কটও দূর হবে অনেকটা। কিন্তু সব ট্রেন ছাপিয়ে পদ্মা সেতু দেখার জন্য মধুমতির দিকে যাত্রীদের নজর থাকবে বেশি। সে কারণে আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে ট্রেন চালুর যে দাবি করে আসছিলাম, আজ সেটি পূরণ হওয়ায় খুব ভালো লাগছে। নিজেকে গর্বিতবোধও করছি। আর সেই মহেন্দ্রক্ষণের স্মৃতিটুকুর সঙ্গী হতে আমি মধুমতির যাত্রী হয়ে ঢাকায় যাচ্ছি।’

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জিএম অসিম কুমার তালুকদার বলেন, ‘রেলওয়ের ইতিহাসে নতুন আরেকটি পালক যোগ হলো মধুমতি পদ্মা সেতু হয়ে আজ (গতকাল) থেকে ঢাকায় যাতায়াত শুরুর মাধ্যমে। পদ্মা সেতু চালুর আগ থেকেই উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের কিছু অংশের মানুষদের চাওয়া ছিলো পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেনটি ঢাকায় যাতায়াত করুক। স্বাধীনতার মাসের প্রথম দিন থেকেই সেটি পূরণ করতে পেরেছি আমরা। তার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

তিনি জানান, আগে মধুমতি রাজশাহী থেকে সকাল ৮টায় ফরিদপুরের ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যেত। গতকাল থেকে সেটি সকাল ৬ টা ৪০ মিনিটে রাজশাহী থেকে ছেড়ে ভাঙ্গাসহ অন্যান্য স্টেশন ধরে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। ট্রেনটি আবার ঢাকা থেকে বিকেল তিনটায় একই পথে রাজশাহী ফিরবে। এভাবেই চলবে।’