রবিবার , ১৬ জুন ২০২৪ | ২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আজও মধুর বাঁশরী বাজে…

Paris
জুন ১৬, ২০২৪ ৬:৪৫ অপরাহ্ণ

।। আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ ।।

নলখাগড়ার কাণ্ড কেটে ছোট ছোট বাঁশি বানানো হয়। তার এক মাথায় রঙিন বেলুন বাঁধা থাকে। ফুঁ দিয়ে বেলুন ফুলাতে হয়। তারপর দম দেওয়া বাঁশিটি একা একাই অনেক্ষণ ধরে বাজতে থাকে। সে বাঁশির সুর আলাদা। জীবনে অনেক বাঁশি শুনেছি। নলখাগড়ার বাঁশি আমার শৈশবকে যেখানে বেঁধে ফেলেছে, হরিপদ চৌরাশিয়াও সেখানে যেতে পারেনি। জানি না, আদৌ সেই বাঁশির সুরে কোনো জাদু মিশে আছে, নাকি শৈশব জীবনের সেই অধ্যায়, যাকে অতিক্রম করা যায় না। মনে হয়, মানুষ যতটুকু বড় হয়, শৈশবেই হয়। তারপর শুধু বয়স বাড়ে।

শৈশবের ঈদের স্মৃতির কথা ভাবতে গিয়ে নলখাগড়ার বাঁশির সুর যেন প্রথমেই কানে এসে লাগল। ছোটবেলায় আমাদের ঈদের আনন্দ বলতে ওই একটা জিনিসই ছিল। মেলা থেকে চার আনা দিয়ে বাঁশি কিনে সারাপথ ধরে বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফেরা। এর চেয়ে কোনো আনন্দভ্রমণের স্মৃতি সারাজীবনে আর কোথাও মেলেনি। এটা শুধু কথার কথা নয়, একটু উদাহরণ দিলে শৈশবের এই কাঁচা আবেগের বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

তখন বয়স কত বা কোন ক্লাসে পড়ি, ঠিক মনে  নেই। তবে এইটুকু মনে আছে, বাড়ি থেকে একাই পাঁচ-ছয় কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বাঘায় ঈদমেলায় যেতে পারি।

আমার টাইফয়েড জ্বর। আগের দিনে এই জ্বর হলে চিকিৎসকেরা রোগীকে ১৫-২০ দিন ধরে না খাইয়ে থাকার পরামর্শ দিতেন। না খাওয়ার এই পর্বটিকে গ্রামের মায়েরা ‘রঙ্গনা’ বলতেন। রঙ্গনা শেষ হলে রোগীর মুখে পথ্য তুলে দিতেন। পথ্য বানানো হতো বার্লি আর পানি জ্বাল  দিয়ে। ঠিক স্যুপের মতো একটা জিনিস, মাছের ঝোল দিয়ে রোগীর মুখে এক-আধা চামচ করে দেওয়া হতো। কয়েকদিন পরে মিলত নরম ভাত ।

আমার সবে রঙ্গনা শেষ হয়েছে। মা পথ্য রেঁধে দিচ্ছে। ১০-১৫ দিন ভাতের দেখা মেলেনি। এরই মধ্যে ঈদের বাঁশি বেজে উঠল। মানে, ঈদের প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই আমার কানে বাজতে থাকে নলখাগড়ার বাঁশি। সেবার বাঁশি বাজতে শুরু করেছে কিন্তু মা ভাত দিচ্ছে না। আরও কয়েকদিন পথ্যতেই থাকতে হবে। এই নিয়ম অমান্য করলে ফের টাইফয়েড ফিরে আসতে পারে। তাহলে আবার না খেয়ে থেকে চিকিৎসা নিতে হবে। এভাবেই ঈদ চলে এলো। মা ঘোষণা দিয়েছে, কিছুতেই বাইরে যাওয়া যাবে না। গেলেই টাইফয়েড ফিরে আসবে, কিন্তু বাঁশি আমাকে কিছুতেই স্থির থাকতে দিচ্ছে না। বাঁশির সুর আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মেলায়। আমি দেখতে পাচ্ছি গাঁয়ের ছেলেরা দল বেঁধে বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছে। আর দেখাচ্ছে, কার বাঁশির দম কত বেশি। তখন আমার দেহটাই শুধু বিছানায় পড়ে রয়েছে। মনটা উড়ে গেছে।

আমার মতিগতি বুঝতে পেরে আমাকে ঘরে শিকল দিয়ে রাখা হলো। আমিও তক্কে তক্কে রইলাম, কোনো কাজে কেউ একবার ঘরে ঢুকলেই আমি পালাব। সেই সুযোগ পেয়ে গেলাম এবং সফলভাবে কাজে লাগালাম। যে কাপড়ে ছিলাম সেই কাপড়েই বেরিয়ে চলে গেলাম, কিন্তু বাড়ি থেকে ৫০০ গজ দূরে না যেতেই ধরা পড়ে গেলাম। আজ আর মনে নেই, কে আমাকে ধরেছিলেন। হয়তো বড় ভাই অথবা চাচারা কেউ হবেন। প্রায় ১৫-২০ দিনের না খাওয়া টিংটিঙে, শরীর কিছুতে তাদের বাহুর বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলাম না। আমাকে চ্যাংদোলা করে এনে ঘরে তালা দিয়ে রাখা হলো। মনে আছে, সারাজীবনে কোনো দিনই এত দীর্ঘ সময় ধরে আমি কাঁদিনি। বড় হয়ে একদিন মায়ের কাছে শুনেছিলাম সেই দীর্ঘ কান্নার ভেতরেই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

পরিবারের সবাই ভেবেছিলেন, এই দীর্ঘ কান্নার পরে আমি থিতু হয়েছি। ঝড়ের পরে যেমন গাছপালা থ হয়ে থাকে। কিন্তু বাঁশি আমার ভেতরের ঝড় থামাতে দেয় না। পরের দিন আমি আবার সুযোগ পেলাম। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চলে গেলাম মেলায়। চার আনায় নলখাগড়ার বাঁশি কিনলাম। বাঁশিতে দম দিতে দিতে কড়া রোদের মধ্যে ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটে বাড়ি ফিরলাম। জীবনে এই প্রাপ্তির সঙ্গে আজও আর কিছু মেলাতে পারি না।

তবে চিকিৎসকের ভবিষ্যদ্বাণীই সঠিক হলো। সেদিন সন্ধ্যায় আমার জ্বর এল। আমি দ্বিতীয়বারের মতো টাইফয়েডে আক্রান্ত হলাম। সেবার কতদিন রঙ্গনা চলেছিল। কতদিন পরে বার্লির পথ্য পেটে পড়েছিল, মনে নেই। কিন্তু বুকের ভেতরে সেই বাঁশি আজও বেজে যায়। হায়! মধুর বাঁশি।

 

 

সর্বশেষ - শিল্প ও সাহিত্য

...