বন্দি জঙ্গির সঠিক তথ্য নেই কারা কর্তৃপক্ষের কাছে

April 21, 2017 at 4:08 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

কারাগারে কী পরিমাণ জঙ্গি রয়েছে, তার কোনও সঠিক তথ্য নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। অনেক জঙ্গিই কারাগারে বসে পালিয়ে থাকা জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে বলেও বিভিন্ন সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে। কত জঙ্গি কারাবন্দি আছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারা কর্মকর্তারা এটি স্পর্শকাতর উল্লেখ করে তথ্য দেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান।

 

জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে গঠিত কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, গত ১৩ এপ্রিল রাতে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এর আগে তিনি কারাগারে বসেই দেশব্যাপী জঙ্গি হামলা ও নাশকতার ছক আঁকতেন। ব্যবহার করতেন এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন। মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে ‘হুজাইফা’ নামে ফেসবুক আইডিও চালাতেন। বর্তমানে এই ফেসবুক আইডিটি বন্ধ রয়েছে। শীষ্যদের সঙ্গে কথা বলতে ব্যবহার করতেন বিশেষ অ্যাপস। বিকাশ একাউন্ট করা সিমও ছিল তার কাছে। নিজের মুক্তির জন্য কিংবা কিভাবে পালানো যায়, সেসব পরামর্শও চালাতেন বাইরে পালিয়ে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী টঙ্গিতে তাকে বহনকারী প্রিজনভ্যানে হামলা চালায় বাইরে থাকা তার সহযোগীরা। কয়েক বছর আগে ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাটিও হয়েছিল কারাগারে বসেই। এত কিছুর পরও কারা কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। যদিও কারা কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতো এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

 

মুফতি হান্নানের মোবাইল ফোন ব্যবহার প্রসঙ্গে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ‘মুফতি হান্নান আমাদের কাছে যতদিন ছিলেন, ততদিন এমনটি হয়নি। কারণ তাকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হতো। আদালতে হাজিরা দেওয়ার সময় থাকতেন পুলিশ হেফাজতে। তখন কারও সঙ্গে কোনও মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন কিনা, তা জানি না।’

 

দেশের বিভিন্নস্থানে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবে জঙ্গিরা বার বার কৌশল পরিবর্তন করে পাল্টা হামলা চালানোর চেষ্টা করছে। যে কারণে গত ২৫ মার্চ রাতে সিলেটের আতিয়া মহলে অভিযান চালানোর সময়েই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে টার্গেট করে পাল্টা হামলা চালায়। এরপরই সারাদেশের পুলিশ সুপারদের বিশেষ বার্তা পাঠিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সেই নির্দেশনা এখনও বহাল আছে বলেও জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।

 

পুলিশ সদর দফতর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, জঙ্গিবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন ঘটনায় জঙ্গিদের আসামি করে এ পর্যন্ত ৬১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে সারাদেশে। এরমধ্যে তিনটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ১৮টি মামলার। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে একটিতে। তদন্ত চলছে আরও ৩৮টির। ৫৭টি মামলার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। তিনটি ঘটনার রহস্য পুলিশ এখনও উদঘাটন করতে পারেনি।

 

জঙ্গিবিরোধী অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ২৪৩ জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ৮৭ জন। গুলশানের হলি আর্টিজান, কল্যাণপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেটসহ বিভিন্ন অভিযানে নারীসহ মারা গেছে ৫০জন জঙ্গি। বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে আরও ২২ জঙ্গি।

 

র‌্যাব সদর দফতর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ৫১ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার ২৮২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গুলশানে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত র‌্যাবের হাতে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ১০১ জন সদস্য গ্রেফতার হয়েছে।

 

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে কোনও আসামি কারাগারে পাঠানোর তার বিস্তারিত তথ্য দিয়ে একটি ফরোয়ার্ডিং পাঠান। দুর্ধর্ষ কোনও জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হলে সেটাও তারা কারা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেন।

 

কারা অধিদফতরের ডিআইজি (প্রিজন্স) তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ যখন কোনও আসামিকে আদালত থেকে কারাগারে পাঠায়, তখন তারা প্রত্যেক আসামির বিপরীতে মামলার বিবরণীও পাঠায়। ওইসব মামলার ধারা অনুযায়ী জঙ্গিদের চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া কারা কর্তৃপক্ষের কাছে আসামিদের হস্তান্তরের সময়েই পুলিশ জানিয়ে দেয়, কে জঙ্গি, কে সাধারণ সন্ত্রাসী। জঙ্গি উল্লেখ না থাকলেও ওয়ারেন্টের কাগজের ওপরে জঙ্গি সংগঠনগুলোর নাম লেখা থাকে।’ কী পরিমাণ জঙ্গি কারা হেফাজতে রয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি স্পর্শকাতর।’

 

কারাগারে কী পরিমাণ জঙ্গি আছে, জানতে চাইলে কারা অধিদফতরের অতিরিক্ত আইজি (প্রিজন্স) কর্নেল ইকবাল বলেন, ‘বিষয়টি ফাইলপত্র দেখে বলতে হবে।’ এ সময় তিনি এই প্রতিবেদককে তার অফিসে যাওয়ার অনুরোধ করেন। এরপর গত কয়েকদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নানা কারণ দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

 

সিলেটে নিহত পুলিশ সদস্যের স্বজনদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অনুষ্ঠানে আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন দেশে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা একটি অশুভ শক্তি। ঘরে-বাইরে সম্মিলিতভাবে এদের মোকাবিলা করতে হবে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে পুলিশ সর্বাত্মক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

Print