ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদনেই আসার আলো দেখছেন বহরমপুরের ৩২ কৃষক

April 17, 2017 at 9:29 am

নিজস্ব প্রতিবেদক:
অব্যাহতভাবে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে ফসলের জমি ক্রমেই হারিয়ে ফেলছে তার প্রকৃতিক শক্তি। এতে করে যেমন ফসল ফলাতে গিয়ে কৃষকদের বাড়তি রাসায়নিক সারের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে, তেমনি দিনের পর দিন বাড়ছে খরচ। এই অবস্থায় জমির উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে কৃষি বিভাগ নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জমিতে কম্পস্ট সার এবং কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট এখন দিন দিন জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছে। তবে ভার্মি সার উৎপাদন এখনো ততটা সহজলোভ্য হয়ে উঠেনি সারাদেশে। এর প্রস্তুত প্রণালী অনেকটা সহজ হলেও কেঁচো সংগ্রহ এবং সার উৎপদান প্রক্রিয়া সম্পর্কে কৃষকদের এখনো তেমন ধারণা নাই। তবে আসার কথা হলো, এই কেঁচো সার উৎপাদন করেই আসার আলো দেখছেন রাজশাহীর দুর্গাপুরের বহরমপুর গ্রামের কয়েকজন কৃষক।

 
প্রায় ১৫ বছর আগে গড়ে তোলা তাঁদের কৃষিভিত্তিক একটি ক্লাবের মাধ্যমেই সম্প্রতি কেঁচো সারের উৎপাদন শুরু করেন তারা। বহরমপুর আইপিএম ক্লাবের ৩২ সদস্য মিলে এ সার উৎপাদন করে এরই মধ্যে এলাকায় বেশ সাড়া ফেলেছেন তারা।


দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্র মতে, উর্বর মাটিতে পাঁচ ভাগ জৈব পদার্থ থাকতে হয়। মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা ও বায়ু চলাচল বাড়াতে ওই পরিমাণ জৈব পদার্থ থাকতে হলেও আমাদের দেশের মাটিতে রয়েছে ১ দশিমক ৮০ থেকে ২ ভাগ। কোন অঞ্চলে আরও কম। এতে করে জমিতে চাষীরা পর্যাপ্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহারে নির্ভশীল হয়ে পড়ছে। ফলে বিভিন্ন ফসলের উপর রোগ ও  পোকামাকড়লের আক্রমণ বৃদ্ধিসহ ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে। সেহেতু জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়াতে ভার্মি কম্পোস্ট এর ভূমিকা অপরিসীম। এটি বিবেচনা করে দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা অফিসার ড. বিমল কুমার প্রামানিকের পরামর্শে এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমানের সহযোগিতায় ভার্মি কম্পোস্ট তৈরীর কাজ হাতে দেন বহরমপুর আইপিএম ক্লাবের সদস্যরা।

 
এটি করতে প্রথমে কৃষি ভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে একত্রিত করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর সম্প্রতি ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরীর কাজ শুরু করেন বহরমপুর আইপিএম ক্লাবের সদস্যরা। যার নাম দেওয়া হয় ‘সয়েল হেলথ ভার্মি কম্পোস্ট ফার্ম’ পরিদর্শন করি।

 
সরেজমিন ঘুরে দেকা গেছে, বহরমপুর গ্রামের একটি আম বাগানের পাশে এই ফার্মটি তৈরী করা হয়। এখানে ওপরে টিনের ছাউনি আর নিচে বেড়া দিয়ে দিয়ে তৈরী করা একটি ঘরের মধ্যে পাশাপাশি চারটি লাইনে ২৫০ টি মাটির চাড়ি বসানো হয়েছে। প্রতি মাটির চাড়িতে ১৫ কেজি গোবর সার ও ২০০ গ্রাম করে অস্ট্রেলিয়া জাতের কেঁচো দেওয়া আছে। কেঁচোগুলো গবর খেয়ে ফেলে। এরপর তারা যে মল পরিত্যাগ করে, সেগুলোই পরের ১৫ দিনের মধ্যে ভার্মি কম্পোস্ট সারে পরিণত হয়।

 
জানতে চাইলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমান বলেন, ভার্মি কম্পোস্ট সার প্রতি শতক পাঁচ কেজি হারে প্রয়োগ করলে রাসায়নিক সার শতকরা ৫০ ভাগ প্রয়োগ করতে হবে। আর পর পর তিন বছর একই জমিতে বিভিন্ন ফসলে ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করার ফলে বাসায়নিক সারের ব্যবহার আর প্রয়োজন হবে না। তখন শুধু ভার্মি কম্পোস্ট সার দিয়েই ফসল ফলানো সম্ভব হবে।

 
ওই ক্লাবের সভাপতি মাইনুল ইসলাম জানান, ‘তাঁরা প্রথমে অস্ট্রেলিয়া জাতের ১৬ কেজি কেঁচো কিনে এনে এ সার উৎপাদন শুরু করেন। প্রতি কেজি কেঁচো ১ হাজার টাকা করে তারা কিনে আনেন। তবে বর্তমানে তাঁদের ফার্মে প্রায় ৫০ কেজি কেঁচো উৎপাদন হয়েছে। কারণ যে কেঁচো মাটির চাড়িতে রাখা হয়, সেগুলো আবার বাচ্চা দেয়। এরপর যখন সারে পরিণত হয়, সেগুলো ছাকনা দিয়ে চেলে নিয়ে কেঁচোগুলোকে আলাদা করে নেওয়া হয়। আর সারগুলো হয়ে যায় আলাদা। এরপর সেই কেঁচোগুলো আবারো চাড়িতে ছেড়ে দেওয়া হয় গবরের মধ্যে। এভাবেই কেঁচো থেকে কেঁচো উৎপাদনের পাশাপাশি সারও উৎপাদন হচ্ছে। এতে করে দুইদিক থেকেই লাভ হচ্ছে।


মাইনুল ইসলাম আরো বলেন, ‘এই সার ক্লাবের সব সদস্যরা তাঁদের বিভিন্ন ফসলে এরই মধ্যে ব্যবহার শুরু করেছেন। পাশাপাশি গ্রামের অন্য কৃষকরাও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে সারের জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেইসঙ্গে রাসায়নিক সার ব্যবহারও কমিয়ে দিয়েছেন। আশা করা যায় আগামী ৫ বছরের মধ্যে বহরমপুর ছাড়িয়ে উপজেলার অন্তত ৭৫ ভাগ কৃষক ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহার করতে শিখবে। আর এটি শুরু হলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমের দিক থেকে দুর্গাপুরই হবে দেশের একটি মডেল উপজেলা। সেই সঙ্গে পরিবেশ দূষনমুক্ত হবে ও প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাসায়নিক সার কেনা থেকে কৃষকরা রেহায় পাবেন।

 
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসরাণ কর্মকর্তা ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরী ও বিক্রি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দুর্গাপুরে। এটি তৈরী করেই বছরে লাখ লাখ টাকা আয় করতে পারবে কৃষকরা। আবার ফসলে রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কমে যাবে কয়েকগুন। একসময় হয়তো এ উপজেলায় আর রাসায়নিক সারের প্রয়োজনই হবে না। যদি কৃষকদের মাঝে এটি সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে দুর্গাপুরে শুধু ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহার করেই সব ধরনের ফসল আমরা উৎপাদন করতে পারবো বলে আশা করছি।’
স/আর

Print