মুচলেকা আর দেশ বিক্রি, ভারতভীতি আর ভারতপ্রীতি

April 11, 2017 at 11:20 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি আওয়ামী লীগ ভারতপন্থী আর বিএনপি ভারতবিরোধী। কিন্তু বড়বেলায় এসে এ কি দেখছি আমি? আমি আমার কথাই বলছি, কারণ অন্য সবার দায় আমি নিতে পারব না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই দেখছি ভারতপন্থী। তারা সুযোগ পেলেই ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করছে বা মুচলেকা দিচ্ছে। হ্যাঁ, এর সত্যতা তো দুই দলের দুই শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াই নিশ্চিত করছেন। এখন জ্ঞানী লোকেরা হয়তো সন্দেহ করবেন, কে সত্য বলছে বা কে মিথ্যা বলছে। সত্য-মিথ্যা যাই হোক, থলের বিড়ালটা কিন্তু একটু হলেও ম্যাঁও করছে। আপনারা শুনতে পান বা না পান, আমি কিন্তু পাচ্ছি।

 

বেশ অনেক বছর ধরেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অভিযোগ করে আসছেন, ২০০১ সালে ভারতকে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। কিছুদিন আগে তো এ বিষয়ে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর হাত আছে বলেও মন্তব্য করেছেন। তাঁর এমন অভিযোগের পর আমার মাথায় অনেকগুলো প্রশ্ন কিটমিট করছে। তাহলে কি এ দেশের নির্বাচনের ফল শেষ পর্যন্ত ভারতই নির্ধারণ করে? আমাদের নির্বাচন কমিশন কি অনেক আগে থেকেই ব্যর্থ বা অসহায় অন্যান্য মেকানিজম বা কূট-কৌশলের কাছে? ভারত চাইলে কি যে কাউকে ক্ষমতায় বসাতে পারে?

 

অন্তত শেখ হাসিনার বক্তব্য তো সে রকমই ইঙ্গিত দেয়। তিনি না জেনে কি এমন গুরুতর অভিযোগ করতে পারেন? অতএব এর সত্যতা আছে ধরে নেওয়াটা কি খুব ভুল হবে? আর এটা হলে তো ব্যাপারটা ভয়াবহ। স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা ভারত বা তাদের গোয়েন্দা সংস্থার কব্জায়! আর যদি এমনই হয়, তাহলে পরের নির্বাচনে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছিল, তখন ‘র’ আসলে কী করেছিল। তখন কি বিএনপি গ্যাস বিক্রির মতো কোনো মুচলেকা দিতে পারেনি? নাকি আওয়ামী লীগ এর চেয়ে বড় কোনো মুচলেকা দিয়েছিল? কারণ মুচলেকা দিলে যদি ক্ষমতায় আসা যায়, তাহলে সে সুযোগ কোন দলই বা ছাড়বে? এখন যেমন বিএনপি মনে করছে।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরের পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অভিযোগ করলেন, শেখ হাসিনা ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করেছেন। কারণ আওয়ামী লীগ আরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকে চায়। দিনকয়েক আগে, প্রায় একই সুরে গান গেয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। তিনি বলেছেন, ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ‘র’ ভূমিকা রেখেছে। এনাদের কথা শুনেও আমার মাথায় সেই আগের প্রশ্নকীট ভর করেছে। ভারতই কি আসলে এ দেশের মসনদের নিয়ন্ত্রক? ভারত যাকে চায়, তাকেই ক্ষমতায় বসানো বা ধরে রাখা যায়? একনায়কতন্ত্রের সময়টা বাদ দিলে ১৯৯১ সাল থেকে এ দেশের মানুষ যে ভোট দিয়েছে, তার কোনো মূল্য নেই? আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই যে গলা ফাটিয়ে বলে, জনগণই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে কে ক্ষমতায় যাবে, তা কি অন্তঃসারশূন্য? তাদের আসল আস্থা তো দেখছি ভারতের ওপর। এ দেশের জনগণে তাহলে কি ভোট নামক নাটকের দর্শক মাত্র?

 

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষকের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলেই জনমনে একটা ধারণা ছিল। যদিও নির্বাচনকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগ সব সময়ই ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কথাবার্তা শুনলেও মনে হয়, তারা যে যখন জয়ী হয়েছে সেটা একদম সহিহ-শুদ্ধ ছিল। আর যখন হেরেছে, তখন নানা যড়যন্ত্র-তত্ত্ব হাজির করেছে। আর সেখানটায় বরাবরই প্রভাবকের ভূমিকায় থেকেছে আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। এই ভারত ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশকে পানিসহ অনেক ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।

 

কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, এই অধিকারের প্রশ্নকে সামনে আনার বদলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কার্যত ভারতের শাসকদলের সঙ্গে একটা নতজানু ও দয়া-দাক্ষিণ্যের সম্পর্ক স্থাপন করেছে। আওয়ামী লীগ বরাবরই ভারতের শাসক দল, বিশেষ করে সে দেশে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেসের সঙ্গে, সুসম্পর্ক বজার রাখার নামে নিজের স্বার্থটাকেই বড় করে দেখছে। সীমান্ত হত্যার মত বিষয়ে জোর গলায় প্রতিবাদ না করে বরাবরই মিনমিন করেছে। আর আওয়ামী লীগের এই ভারতপ্রীতিকে কাজে লাগিয়ে দেশের জনগণকে ‘ভারতবিরোধী’ রাজনীতিতে উৎসাহিত করেছে বিএনপি। কিন্তু অধিকারের প্রশ্নে আরো মিনমিনে থেকেছে। কার্যত তারা ভারতবিরোধিতাকে তাদের ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে পানিসহ নানা সমস্যার ন্যূনতম সমাধান তারা করতে পারেনি। আদতে চায়ওনি। ২০০১ সালে ভারত সফর শেষে দেশে ফেরার পর সাংবাদিকরা গঙ্গা চুক্তি নিয়ে কোনো আলাপ হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘ভুলে গেছি’। তিস্তা তো দূরান্ত!

 

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ভারতকে যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক না কেন, কেউই অধিকারের জায়গায় থেকে, ন্যায্যতার জায়গা থেকে দেশটির নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেনি। বর্তমান সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি জোরের সঙ্গে উচ্চারণ করতে পেরেছেন, ‘মিস্টার মোদি, মমতা ব্যানার্জি, মুখ্যমন্ত্রী আর আমি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী। আলাপটা আপনার সঙ্গে আমার। তিস্তায় দুই বালতি পানি থাকলে এক বালতি আমাদের।’

 

আর খালেদা জিয়া শুধু দেশ বিক্রির অভিযোগ করেই খালাস। তিনি কি ভারতের উদ্দেশ্যে বলতে পেরেছেন, বাংলাদেশকে তিস্তার পানি দিতে হবে?

 

আওয়ামী লীগ আর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের কথা থেকে বারবারই বুঝেছি, তারা দুর্বল অবস্থানে থেকেই কথা বলেছেন। ভারতের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট, সেভেন সিস্টারের স্থিরতার জন্য সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয়কে কখনই কূটনীতির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেনি বা চায়নি। উল্টো এগুলো ‘বিনামূল্যে’ দিয়ে দিয়েছে  আওয়ামী লীগ। বাণিজ্য বৈষম্য দিন দিন বেড়েছে বই কমেনি। একতরফা নির্বাচনের বিশ্বচাপ সামলাতে ভারতকে পাশে চেয়েছে যে কোনো মূল্যে। আর বিএনপি প্রকাশ্যে ভারতের বিরোধিতা করলেও তাদের সামনে গিয়ে এটা বোঝাতেই কাচুমাচু করেছে যে, বিএনপি ভারতবিরোধী নয়। ফলে সব সময় তাদের আলোচনাগুলো একটা অধস্তন বা নতজানু অবস্থান থেকেই শুরু হয়েছে। যার ফল হয়েছে অসম। যাতে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

 

দেশ বিক্রি বা মুচলেকার এই বালখিল্য আলোচনায় জনগণের মাঝেও অযথা কিছু ভারতভীতি বা ভারতপ্রীতি তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে দেশের বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে। বাংলাদেশের মানুষ ভুলতেই বসেছে ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ সব সময়ই একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছে। ভারতের নৈতিক কর্তব্য হলো বাংলাদেশকে প্রাপ্য পানির হিস্যা দেওয়া। ভারতের কোনো অধিকার নেই সীমান্তে মানুষ হত্যা করার। আর এসব অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের জনগণ সব সময় ঐক্যবদ্ধ সুরে আওয়াজ তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা প্রধানত দুটি শিবিরেই বিভক্ত হয়ে ভারতভীতি বা ভারতপ্রীতির প্রপাগান্ডায় পা দিয়েছে। অথচ আমরা জানি, তিস্তার পানি কোনো দলীয় কর্মীর জন্য দরকার নয়, সীমান্তে আওয়ামী লীগ বিএনপি মরে না।

লেখক : জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র: এনটিভি

Print