অর্থই কাল হলো আবদুল শেখের !

January 11, 2017 at 8:52 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক:
অঢেল টাকা পয়সা ও সম্পদের মালিক ছিলেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত নথিপত্র সরবরাহকারী আবদুল শেখের। নগরীর মধ্যে তার তিনটি বাসা বাড়ি। এর মধ্যে বহরমপুর এলাকায় তিন তলা বাড়ি, অচিনতলা এলাকায় টিন সেট বাড়ি, বসুয়া এলাকাতেও টিন সেট বাড়ি। তার দুই ব্যাংকের মধ্যে একটিতে ৩৫ লাখ ও অপরটিতে ৫ লাখ টাকা মিলে ৪০ লাখ টাকা রয়েছে।

আবদুল শেখ চাকরি থেকে অবসরে যান প্রায় দুই বছর আগে। তার চাকরির পেনশনের টাকা কাউকে না জানিয়ে এককালীন বিক্রি করে দেন তিনি। এর মধ্যে তিন ছেলে ও এক মেয়েকে দুই লাখ টাকা করে আট লাখ টাকা দেন তিনি। আর বাকি টাকাগুলো তার নিজের নামে ব্যাংকে রাখেন।

এদিকে, আবদুল শেখের প্রথম স্ত্রী তাহেরা বেগম ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার তিন মাস আগে বিয়ে হয় স্ত্রী আছিয়ার সঙ্গে। আগের পক্ষের তিন ছেলে। পরের পক্ষের এক মেয়ে।

নগরীর বহরপুর এলাকায় পৌনে তিন কাঠা জমির উপরে তিন তলা বাড়িতে শ্বশুর ও ছোট ছেলে শরিফুল ইসলাম শরিফ থাকতেন, অচিনতলা এলাকায় পৌনে চার কাঠা জমির উপরে টিন সেট বাড়িতে থাকতেন মেজো ছেলে আবু বক্কর সুরুজ ও বসুয়া এলাকাতে আড়াই কাঠা জমিতে টিন সেট বাড়িতে থাকতেন বড় ছেলে আবু তাহের সুজন। এর মধ্যে ছোট মেয়ে আবেদা সুলতানা শিলার বিয়ে হয়েছে চার বছর আগে ছোটবনগ্রাম এলাকায়। সেই সময় খুশি মনে তাকে বাবা ৫০ হাজার টাকা দেন।

এদিকে, তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে সুজন ঠিকাদারি সাইডে কাজ করে, মেজো ছেলে সুরুজ কাঠমিস্ত্রি ও রঙের কাজ করে ও ছোট ছেলে শরিফ নিজে দাবি করেন চাকরি করে। কোথায় চাকরি করে, কী চাকরি করে তা পরিবারের লোকজন জানাতে পারেনি।

আবদুল শেখের মেজো ছেলে আবু বক্কর সুরুজের স্ত্রী রোজি সিদ্দিকা সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, তার স্বামী সুরুজকে ছোট ভাই শরিফ তার কাছ থেকে চার লাখ টাকা নেয় টিএনটি অফিসে চাকরি দেবে বলে। প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেলোও তিনি চাকরির কোন ব্যবস্থা করে দিতে পারেনি। শরিফ তার টাকা পয়সাও ফেরত দেয়নি।  তাছাড়া শরিফ নানা মানুষের কাছে চাকরি দেবো বলে অনেক টাকা নিয়ে নিয়েছে। যারা টাকা পাবে তারা মাঝে মধ্যে এসে খোঁজা- খোঁজি করতো। কিন্তু তাকে না পেলে তারা বাবা আবদুল শেখকে বলে যেতো এবং অপমান করতো।

তিনি শরিফকে বলে তুই মানুষের টাকা নিয়েছিস সেই টাকা দিয়ে দে। তাও শরিফ কথা শুনে না। শরিফের সঙ্গে এক হয়ে সুজনও টাকার জন্য চাঁপ দিতে থাকে। এ নিয়ে মাঝে মধ্যে তাদের বাড়িতে ঝগড়া হতো। আবদুল শেখকে বলে আপনি আপনার কিছু সম্পত্তি বিক্রি করে আমাদের টাকা  দেন। কিন্তু শ্বশুর বলে, আমি মরে গেলে তোরা যে যতটুকু ভাগ পাবি তা নিয়ে নিস। আমার অনেক কষ্টে করা এই সম্পদ। আমি বেঁচে থাকতে বিক্রি করে টাকা দেবো না।

নিহত আবদুল শেখের স্ত্রী আছিয়া বেগম সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, স্বামীর আগে স্ত্রী মারা যাওয়া তিন মাস আগে আমাকে বিয়ে করে নিয়ে আসে। তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ছিলেন। তার ভারতে চিকিৎসার করার জন্য অনেক টাকা পয়সা খরচ করেছিল। বেশ কিছু দিন আগে থেকে টাকাসহ জমিজমা লিখে নেয়ার জন্য শরিফ ও সুজন চাপ দিয়ে আসছিল।

তিনি আরো বলেন, তাদের টাকা পয়সার সমস্যা নিয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের চেম্বারে শালিস ডাকা হয়। কিন্তু সেখানে কোনো মিমাংসা হয়নি। স্বামীর প্রায় ৪০ লাখ টাকা রয়েছে। তাছাড়া স্বামীর ব্যাংকের টাকা পায়সাসহ বিভিন্ন কাগজপত্র একটা ট্রাংকে ছিলো। তারা স্বামী আবদুল শেখের মৃত্যুর পরে নগদ পাঁচ লাখ টাকা ও ৩৫ লাখ টাকার চেক এক জমিজমার দলিলপত্র ও দুই ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে চলে গেছে।

এদিকে, গত সোমবার নিহতের স্ত্রী আছিয়া বেগম ও মেজো ছেলের বৌ দাবি করেছিলেন, আবদুল শেখকে বালিশ চাঁপা দিয়ে হত্যার আগে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়েছিলো।

কিন্তু এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ রামেক হাসপাতালের ময়নাতনন্তকারী ডাক্তার এনামুল হক সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, আবদুল শেখের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ভিসেরা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভিসেরা প্রতিবেদন হাতে পেলে জানা যাবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত সোমবার নগরীর বহরমপুর এলাকার নিজ বাড়িতে আবদুল শেখকে বালিশ চাঁপা দিয়ে হত্যা করে তার ছেলেরা। এ ঘটনায় মেজো ছেলে সুরুজ বাদি হয়ে দুই ভাই ও ভাবিসহ চারজনের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় শরিফ ও তার স্ত্রী হাবিবা আক্তার লাইজুকে (৩০) আটক করে পুলিশ। সুজন ও তার স্ত্রী আক্তারুন্নেসা পলাতক রয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার তাদের আদালতের মাধ্যমে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে শুনানির অপেক্ষায় রাখা হয়। একই দিনে নিহতের লাশ রামেক হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে হেতেম খাঁ কবরস্থানে দাফন করা হয় বেলা দুইটার দিকে।
স/শ

Print