রাজশাহীতে নৃশংস হত্যাকাণ্ড আর আলোচিত আত্মহত্যা দিয়ে শেষ হলো ২০১৬

December 31, 2016 at 1:57 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বছরটা ২০১৬। বছরের প্রথম দিকে ভালোই ছিলো। আস্তে আস্তে অস্থির হয়ে যায়। তার পরে একর পর এক হত্যাকাণ্ড। এসব হত্যাকাণ্ড নগরবাসীকে উদ্বিগ্ন করে তুলে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে নগরবাসী। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানবন্ধন করে নিহতর স্বজনরা। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা বলছেন, এইসব হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অনেক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরাও গ্রেফতার হয়েছে।

এসব হত্যাকাণ্ড চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলোর মধ্যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) দুই শিক্ষক, এক ছাত্র, বিএনপির নেতার আত্মহত্যা, আওয়ামী লীগ নেতা হত্যা, মায়ের হাতে ছেলে হত্যা, হোটেল নাইসে দুই শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার, দুই বান্ধবীর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা, জীবন বিমা কর্মীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা।

২৪ এপ্রিল বিকেলে জেলা আওয়ামী লীগ নেতা জিয়াউল হক টুকু রাজশাহী নগর ভবনের সামনে অবস্থিত নিজের ব্যবসায়িক চেম্বারে গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনার পর মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে তাকে দ্রুত রামেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও কিছুক্ষণ পর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন তার স্ত্রী শামসুন নাহার লতা। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়।

এর আগের দিন ২৩ এপ্রিল খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী। তাকে সকাল ৭টায় নগরীর শালবাগান এলাকার নিজ বাসার সামনে থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত রেজাউল করিম সিদ্দিকী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি ছিল রাজশাহীর বাগমারার দরগামাড়িয়ায়। সেখানে তার একটি গানের স্কুল ছিল। কোনো রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন না। সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার পরিচিতজনরা।  এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সবমিলিয়ে ৮জনকে আসামি করে এরই মধ্যে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে তিনজনই বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। পলাতক রয়েছেন একজন। আটক রয়েছেন চারজন।

গত ২২ এপ্রিল রাজশাহীর নাইস ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের কক্ষ থেকে দুই তরুণ-তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন পুলিশ ওই ঘটনাকে পরিকল্পিত জোড়া হত্যাকা- বলে উল্লেখ করেছিলেন। নিহত যুবকের নাম ছিল মিজানুর রহমান (২৩)। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। হোটেলের রেজিস্ট্রারে তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় লেখা ছিল। তরুণীর নাম সুমাইয়া (১৯)। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। বাড়ি ছিল পাবনার রাধানগরে। স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে হোটেলটির ৩০৩ নম্বর কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন তারা।

তখন বোয়লিয়া থানার ওসি জানিয়েছিলেন, সুমাইয়ার মুখে ছুরি দিয়ে কাটা দাগ আছে। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে আঘাতের চিহ্ন আছে। মুখে বালিশ চাপা ছিল। আঘাতের পর বালিশ চাপা দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া মিজানুর রহমানের ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়।

গত ১৬ নভেম্বর নগরীর ফায়ার সার্ভিস মোড় এলাকায় নিজ বাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও বিশিষ্ট ঠিকাদার খন্দকার মাইনুল ইসলাম আত্মহত্যা করেন। নিহত বিএনপি নেতার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খন্দকার মাইনুল ইসলাম নিজের পিস্তল দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।

গত ৯ সেপ্টম্বর রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতকা বিভাগের শিক্ষিকা আকতার জাহান জলি (৪৫) আত্মহত্যা করেন। পরে তার শয়নকক্ষ থেকে একটি সুইসাইড নোট এবং একটি কীটনাশকের বোতলও উদ্ধার করা হয়। তিনি জুবেরি ভবনের ৩০৩ নম্বর কক্ষে থাকতেন।

গত ২০ অক্টোবর রাবি ছাত্র মোত্তালিব হোসেন লিপু নামে এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যার পরে তার লাশ ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর নগরীর বুধপাড়া এলাকায় মা তার সাত বছরের শিশু সন্তানকে কুপিয়ে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় মা তসলিমা বেগমকে (৩০) পুলিশ আটক করে। নিহত শিশু সন্তানের নাম শাহরিয়ার আলম কাব্য। কাব্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ রাসেল মডেল স্কুলের শিশু শ্রেণির ছাত্র। তবে তসলিমা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে জানিয়েছে তার পরিবারের সদস্যরা।

২৯ নভেম্বর নগরীতে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে জীবন বীমা করপোরেশনের অফিসের এক পিয়নকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে দৃর্বৃত্তরা। মঙ্গলবার দুপুরে পৌনে দুইটার দিকে নগরীর বুলনপুর মন্দিরের কাছে এ ঘটনা ঘটে। পরে ওই পিয়নকে রামেক হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। নিহত ওই পিয়নের নাম রাশেল ইসলাম (২০)। তিনি নগরীর ঘোষপাড়া এলাকার হাফিজুল ইসলামের ছেলে।

এ ঘটনায় শাকিল হোসেন নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশের সোপর্দ করেছেন নিহতের স্বজনরা। শাকিল নগরীর বুলনপুর এলাকার মাসুদ পারভেজের ছেলে। তিনি ঘটনার পরে হাসপাতালে আসেন খোঁজ-খবর নিতে। এ সময় রাশেলের স্বজনরা তাকে দেখতে পেয়ে ধরে মারপিট করতে থাকেন। পরে পুলিশ গিয়ে শাকিলকে আটক করে।

নগর পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতে খায়ের আলম সিল্কসিটিনিউজকে বলেন, নগরীতে ঘটে যাওয়া আলোচিত হত্যাকা-গুলোর বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

 

স/আর

Print