নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েও বিতর্ক!

December 12, 2016 at 10:51 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নারীরা কখনও গেরিলা যুদ্ধে, কখনও সম্মুখ যুদ্ধে কখনও বা বার্তাবাহক হিসেবে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস তা মনে রাখেনি বলেই মনে করেন নারী মুক্তিযোদ্ধারা। তারা বলছেন, নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েও বিতর্ক তৈরির চেষ্টা হয়েছে। সম্মুখ সমরে অংশ না নেওয়ায় তাদের মুক্তিযোদ্ধা বলা যাবে না বলেও যুক্তি দেখানো হয়েছে। মনে রাখা দরকার, নারীর যুদ্ধ কেবল সম্মুখ সমরের না।

নারী মুক্তিযোদ্ধাদের মতামত, দীর্ঘ সময় তাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় ইতিহাসই বদলে গেছে। নতুন নিয়ম করে সেটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য যতটা যত্নশীল হওয়া দরকার সেটিও লক্ষ্য করা যায় না। এখনও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের নারী মানে কেবল নির্যাতনের শিকার, না হলে সেবিকা। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া নারীদের বক্তব্য, আর বিতর্ক তৈরি করবেন না। মনে রাখা দরকার নারীর যুদ্ধ কেবল সম্মুখ সমরের না। তারা ছিলেন গেরিলা যোদ্ধা, ছিলেন সম্মুখ সমরে, ছিলেন দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী, ছিলেন দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিভিন্ন প্রচারণায়।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘ইতিহাসের পাতায় পাতায় এবং মুক্তিযুদ্ধের ১৫ খণ্ড দলিলে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা উল্লেখ আছে। একাত্তর সালে ২০৩ জন নারী মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এরমধ্যে খেতাবপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধা দু’জন। তারা হচ্ছেন ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম বীর প্রতীক (সেনাবাহিনী) ও বেগম তারামন বিবি বীর প্রতীক (গণবাহিনী)।’

মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি, সুলতানা কামাল, রোকেয়া কবির, নাসিমুন আরা মিনুর অভিমত, তারা স্বীকৃতির লড়াই চালিয়েছেন ভিন্ন জায়গা থেকে। কেবল সম্মান পাওয়া নিয়ে তারা ভাবেন না। মুক্তিযুদ্ধ করে তারা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছেন। এটাই সব থেকে বড় পাওয়া। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে তারা দেশ স্বাধীন করেছিলেন, সে স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি। এই স্বাধীনতার জন্য নারীদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। সেটি তার সম্ভ্রম দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, শুধু এটুকু প্রত্যাশা তাদের।

মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারীদের ডেমো রাইফেল নিয়ে যে মিছিলটির ছবি দেখা যায় সেখানে সবার সামনে আমি থাকায় আমার সম্মুখ সমরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় সাত মাস শরণার্থী শিবিরে কাজ করেছি, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা দেশে প্রবেশের আগে তাদের রাজনৈতিক দীক্ষা দিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগরতলা ক্যাম্পে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ বাহিনী গঠন করা হলে আমি প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করি। ক্যাম্পে যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারসহ গেরিলারা প্রশিক্ষণ নেন।’

 

রোকেয়া কবির বলেন, ‘নারীর অবদানে কেবল দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের কথা উল্লেখ না করে গেরিলা স্কোয়াডে ফোরকান বেগম, ফরিদা খানম সাকী, মমতাজ বেগম, শামসুন্নাহার ইকু, গুলশান আরা রুবি, রাশেদা আমিন, আমেনা সুলতানা বকুল, শেফালী, নার্সিং স্কোয়াডের কাওসার বেগম, সালেহা বেগম, আখতার বেগম, ইয়াসমিন বেগম, নিলুফার পান্না, রওশন, খোরশেদা, কাজী হেলেন, গৌরী রানী পাল, পরিণীতি পাল, লায়লা আক্তার নামগুলো উল্লেখ করুন। আরও নাম আছে যেগুলো আমাদের মনেও নেই।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়া নারীদের অন্যতম সুলতানা কামাল বলেন, ‘সেসময় নারীরা রাজনৈতিকভাবেও নানা পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। সেই ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। নারী যদি সেবিকা না হতো, তাহলে এতো যুদ্ধাহত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচিয়ে তোলা যেত না। নারীর অবদান অস্বীকার করার যে প্রবণতা জিয়াউর রহমানের শাসনামল খেয়াল করলে স্পষ্ট হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চপদস্থ যে কর্মকর্তারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন, মনে রাখতে হবে তারা স্বাধীকার আন্দোলনকারীদের ভারতের দালাল বলেছে। অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা চেয়েছে যারা, তারা ধর্ম মানেন না বলে প্রচারণা চালিয়েছে। আমার ধারণা, যদি পাকিস্তানি আর্মি তাদের সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ করতে বলতো তাহলে তারা সেটা করতো। কিন্তু পাকিস্তানি সেনা তাদের বিশ্বাস করেনি। ফলে এই গোষ্ঠীর হাতে যখন বাংলাদেশ গেল, তারা এটাকে মিনি পাকিস্তান বানানোর প্রকল্প নিলো। এবং নারীদের আরও অবমাননার জায়গায় ঠেলে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি হলো।’

নারী মুক্তিযোদ্ধা নাসিমুন আরা মিনু বলেন, ‘আমরা ছোট ছিলাম বলে অত রাজনীতি বুঝতাম না। কিন্তু আমরা দেশকে মায়ের মতো ভালবাসি। সব কিছুই করেছি দেশের জন্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমন্যাশিয়ামে আমাদের রাইফেল প্রশিক্ষণ হয়েছিল, এসবই ছিল যুদ্ধের প্রস্তুতি। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পর আমার বাবা আমাদেরকে কাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ পাঠিয়ে দেন। সেখানে কয়েক দিন থাকার পর আমরা গ্রামের দিকে চলে যাই। ধীরে ধীরে পাকসেনারা গ্রামেও পৌঁছে গেল।সেসময় আমরা ঘুরে ঘুরে ক্যাম্পেইন চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ, ওষুধ, কাপড় সংগ্রহ করেছি। নারীরা মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করে খাইয়েছে। পরে  এসব সহায়তার খবর ছড়িয়ে পড়লে সেই নারীদের ধরে নির্যাতন, এমনকি হত্যাও করা হয়েছে।’

 

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

Print