সরেজমিন পবা স্বাস্থ্যকেন্দ্র: ভয়ঙ্কর চিকিৎসার সঙ্গে অনিয়মের পাহাড়

October 6, 2016 at 8:09 am
0
1336

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বুধবার বেলা ১১টা। রাজশাহীর পবা উপজেলার দারুশা এলাকায় অবস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় জরুরী বিভাগে বছর তিনেকের একটি শিশু চিৎকার করে কান্নাকাটি করছে। আর তাকে ধরে রেখেছে দু’জন লোক। অপর একজন লোক শিশুটির ঠোটে সেলাই দিচ্ছিলেন। প্রায় ২০ মিনিট ধরে শিশুটির ঠোটে জোর করেই সেলাই দিলেন লোকটি। পরে কাছে গিয়ে জানতে চাওয়া হলে সেলাইকারী লোকটি নিজের পরিচয় দিলেন হাসপাতালের উপসহকারী কমিউনিটি অফিসার (সেকমো) তারিকুজ্জামান।

 

জরুরী বিভাগের চিকিৎসক না থাকায় তিনি নিজেই এমএলএসএস হারুন-অর-রশিদ এবং শিশুটির বাবার সহযোগিতায় তার ঠোটে দুটি সেলাই করে দেন বলে দাবি করেন ওই সেকমো। অথচ তার দায়িত্ব হলো শুধুমাত্র ভর্তি হওয়া রোগীদের নাম-ঠিকানা ও বয়সহ আনুসঙ্গিক পরিচয় অন্তভূক্ত করা। কিন্তু এগুলো করার পাশাপাশি শিশু চিকিৎসাসহ অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে দেখা যায় তাঁকে। যার অর্থ দাঁড়ায় সবই ভয়ঙ্কর চিকিৎসা।

 

  • শিশুর মতো স্পর্শকাত রোগীর কাটা ঠোটে সেলাই দিতে পারেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ম্যাটসে পড়ার সময় ছোট-খাটো সেলাই ও কাটাকুটি সম্পর্কে তো প্রশিক্ষণ নিয়েছি। ওই অভিজ্ঞতা দিয়েই চিকিৎসা দিচ্ছি।’

14550801_1275053979213152_1783438921_o রোগীর প্রেসার মেপে দিচ্ছেন এমএলএসএস হারুন-অর রশিদ
শিশু রহিদুলের বাবা পবার নওহটা পৌর এলাকার ইটাখাটি গ্রামের বোরহান উদ্দিন জানান, গতকাল সকালে তার ছেলে খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে ঠোট কেটে যায়। এরপর অনেক রক্তপাত হওয়ায় শিশুটিকে উদ্ধার করে তিনি পা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসেন। নওহাটা থেকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দূরুত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। সেখানে অভিজ্ঞা চিকিৎসকও পাওয়া যায়।

 

  • কিন্তু শহরের হাসপাতালে নিয়ে গেলে বেশি খরচ হবে গরিব বোরহান উদ্দিন ছেলেকে নিয়ে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পবা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে গিয়েও চিকিৎসকের নামে একজন অনভিজ্ঞ লোক শিশুটির ঠোটে যে সেলাইটি দিলেন, সেটি নিয়েও পরবর্তি আশঙ্কার বিষয় রয়েছে।

 
শুধু এইরকম ভয়ঙ্কর চিকিৎসায় নয়, গতকাল বুধবার সরেজমিন হাসপাতাল ঘুরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের চিকিৎসা ও পথ্য সরবরাহ নিয়ে তামাশার চিত্র ফুটে উঠেছে।

 
হাসপাতালের ডিউটি রোস্টারে গতকালের ডিউটি (দায়িত্ব) ছিল ১১ জন চিকিৎসকের। কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায় গতকাল ৭ জন চিকিৎসক। অনুপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের গাইনী বিশেষজ্ঞ হুমাইরা শাহরিন, মেডিক্যাল অফিসার আফসানা রহমান, আরএমও বার্নাবাস হাসদা ও আরো একজন মেডিক্যাল অফিসার।

14585396_1275054719213078_1884569286_n
এই চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা বাধ্য হয়ে জরুরী বিভাগে রোগীর নাম-ঠিকানা অন্তভূক্ত কাজে দায়িত্বরত সেকমোর কাছে। এরকম অন্তত ১০ জন রোগীকে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় সেকমো তারিকুজ্জামানের কাছে। যাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন বৃদ্ধা আবার কেউ ছিল শিশু।
কর্ণহার গ্রাম থেকে আসা রোগী আজিজা বেগম বলেন, ‘জ্বর-স্বর্দীর চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসিছি। কিন্তু যে ঘরে য্যাতে বললো, সেখানে য্যায়ে দিখে ডাক্তার নাই। তাই আবার এখানে অ্যাসেছি।’

 

  • পরে আজিজাকে চিকিৎসা দিতে দেখা যায়, হাসপাতালের সেকমো তারিকুজ্জামানকে। তবে সাড়ে ১১ টার দিকে জরুরী বিভাগে গিয়ে অন্যান্য রোগীদের চিকিৎসা দিতে দেখা যায় মেডিক্যাল অফিসার আমেনা পারভীনকে।

 
জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জরুরী বিভাগের দায়িত্ব আজ নাই। তবে যার দায়িত্ব আছে, তিনি না থাকায় আমিই বসেছি।’

 
হাসপাতালের জরুরী বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা পবার কবিরাজপাড়া এলাকার ফরিদা বেগম বলেন, ‘দুপুর ১২টা বাজলেই হাসপাতালে আর কোনো চিকিৎসক থাকে না। এমনিতেও তেমন চিকিৎসক থাকে না। আর দুপুর হলে সব ফাঁকা হয়ে যায়। তাই আগে-ভাগে এসেই ডাক্তার দেখাতে হয়। তাও একজনের কাছেই অনেক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকতে হয়। এরপর কোনোমতে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি যায়। ওষুধ তো দেয় না।’

 
জরুরী বিভাগ থেকে হাসপাতালের অভ্যান্তরে ভর্তিকৃত রোগীদের খোঁজ নিতে গিয়ে আরো নানা অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের চিত্র ধরা পড়ে। হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সাতজন রোগীর মধ্যে বৃদ্ধ মসলেম উদ্দিন (৭০) বলেন, ‘এখানে ওষুধ দেয় না। দুই-একটা বড়ি দেয়, আর বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে অ্যানতে হয়। সকালে একবার ডাক্তার অ্যাসি দেখি যায়, এরপর আর কোনো খোঁজও থাকে না।’

14572005_1275053925879824_2111294994_o গতকাল খাবার তালিকায় ৫কেজি মুরগির মাংস থাকলেও এখানে সেই মাংসের দেখা পাওয়া যায়নি।

  • আরেক রোগী সাইদুর রহমান (৬০)। চারদিন আগে ভর্তি হন পবা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হওয়া সাইদুর রহমান জানান, এই চারদিন দুই-একটা করে বড়ি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকি ওষুধগুলো বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়েছে। তবে হাসপাতালের ওষুধ বন্টন রোস্টারে লিখা আছে সাইদুর রহমানকে প্যারাসিটামল, রেনিটিন, সালবুটামিল ও এজিথ্রোমাইসিন দেওয়া হয়েছে।

 
হাসপাতালের নারী ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গতকাল দুপুর ১২টার সময় ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ১৩ জন। কেউ বিছানায় শুয়ে আছেন, তো কেউ বসে থেকে গল্প করছিলেন। এদের মধ্যে গত শনিবারে ভর্তি হওয়া রোগী সাজেদা বেগম জানান, হাসপাতালে ওষুধ দেয় না। আবার খাবারও খাওয়া যায় না। এই কয়দিন একবারের জন্যেও মাংস আর দুধ চোখে দেখিনি। অথছ রাজশাহীর শহরের হাসপাতালে এসব দেওয়া হয়। তাহলে আমাদের হাসপাতালে দেওয়া হয় না কেন? প্রশ্ন করেন সাজেদা। তিনি এও বলেন, আমাদের গরিবদের হাসপাতাল তাই আমরা পাই না?’

 
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খাবার দিতে আসেন একজন ব্যক্তি। খাবারের ট্রলির সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি বড় হাড়িতে রাখা নিম্নমানের মোটা চালের ভাত, আরকেটি পাতিলে রাখা আছে সিলভার কাপ মাছ, আরেকটিতে আলুর ঘাটি এবং একটি পাতলা পানির মতো দেখতে ডাল। আবার খাবারের ট্রলিতেই রাখা রোগীদের তালিকায় লেখা আছে ২৮ জনের নাম। কিন্তু ৩১ শয্যার এ হাসপাতালটির দুটি ওয়ার্ড ঘুরে ৭ জন পুরুষ আর ১৩ জন নারী ছাড়া আর কোনো রোগীর দেখা মেলেনি।

 

  • এর মধ্যে দুজন রোগী ছিলেন গতকাল সকালেই ভর্তি হওয়া। নিয়ম অনুযায়ী যারা একদিন পর থেকে হাসপাতালের খাবার পাবেন। সেই হিসেবে ভর্তিকৃত চিকিৎসাধীন খাবার পাওয়ার উপযোগী রোগীর সংখ্যা ছিল গতকাল ১৮ জন। কিন্তু তার স্থলে খাবার তালিকায় ছিল ২৮ জনের নাম। বাঁকি রোগীরা কোথায় গেল জানতে চাইলে খাবার বিতরণকারী এবং ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জ মাহমুদা বেগমের জবাব, কয়েকজন রোগী ছুটি নিয়ে চলে গেছে। আবার কয়েকজন নতুন ভর্তি হয়েছে। তাদের সবাই খাবার পাবে।’

14550538_1275083679210182_817267054_o নিম্নমানের এই খাবারই পবা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রোগীদের মাঝে পরিবেশন করা হয়।
ছুটি নিয়ে চলে যাওয়া রোগীরা কিভাবে খাবার নিতে আসবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা খাবার খেয়ে চলে যাবে। তাহলে ওই রোগীগুলো কোথায় জানতে চাইলে তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি মাহমুদা।

 
এদিকে মাহমুদা গতকাল হাসপাতালের অফিস সহকারীকে হিসেব দেন, গতকাল ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩১ জন। তবে হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) রেজাউল হক চৌধূরী দাবি করেন, গতকাল হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল ২৯ জন।

 

  • হাসপাতালের খাবার বিতরণের রোস্টারে দেখা যায়, গতকাল রোগীদের জন্য ৫ কেজি মুরগির মাংস বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে যেসব রোগী চিকিৎসাধীন আছেন, তারা কেউ বলতে পারেননি এর মধ্যে মাংস বিতরণ করা হয়েছে। আবার যে ভাত ও তরকারি এবং সিলভার কার্প মাছ দেওয়া হয়, সেগুলোও রোগীরা খেতে পারেন না। খাবার বিতরণের ঠিকাদার হারুন-অর-রশিদ হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করে ইচ্ছে মতো খাবার পরিবেশন করেন বলেও দাবি করেন একাধিক সূত্র।

01-copy 14550936_1275053929213157_1819505517_o
তবে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ঠিকাদার হারুন-অর রশিদকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে একজন সেকমো কিভাবে শিশু ও নারীদের মতো রোগীকে চিকিৎসা দেন জানতে চাইলে টিএইচও বলেন, ‘তার চিকিৎসা দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নাই। তিনি এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকলে অবশ্যই তাই বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

  • আর অন্যান অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে (টিএইচও) রেজাউল হক চৌধূরী বলেন, ‘এরই মধ্যে নিয়মিত হাসপাতালে না আসার কারণে কয়েকজন চিকিৎসককে আমি শোকজও করেছি। কিন্তু তারপরেও যদি এরকম হয়ে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 
তবে অন্যান্য অনিয়ম নিয়ে তিনি সাক্ষাতে কথা বলতে চান বলেও দাবি করেন। যদিও গতকাল টিএইচও নিজেও অফিসে ছিলেন না। পবার হরিয়ানে অফিসের কাজেই আমি ফিল্ডে আছি।’

 

 
এদিকে তিনি আরো জানান, হাসপাতালের এক্সরে এবং অপারেশন থিয়েটার দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ আছে। ওটিতে শুধুমাত্র বনাদ্ধাত্বতরণ কাজ হয়। ২০০৪ সালে নতুন এক্সরে মেশিন পাওয়া গেলেও অন্যান্য সুবিধা না পাওয়ায় সেটিও এখন নষ্ট হতে বসেছে। অথচ এক্সরে টেকনিশয়ান প্রতি মাসে প্রায় ৪৩ হাজার টাকা বেতন উত্তোলন করে চলেছেন গত ১২ বছর ধরে। এই সময় ধরে তিনি কোনো কোনো দিন অফিসে আসেন, আবার কোনোদিন না এসে পরেরদিন দুইদিনের স্বাক্ষর করে যান-এমনটিও দাবি করেন হাসপাতালের একাধিক সূত্র।

স/আর