বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রভাব খাটাবে চীন-ভারত

July 1, 2018 at 10:20 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

দেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকার ওপর প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে নামবে চীন ও ভারত।

দৃশ্যপটের অন্তরালে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। শুধু নির্বাচনে নয়, সামরিক ও বেসামরিক নানা বিষয়ে প্রভাব খাটানোর প্রতিযোগিতায় মেতেছে চীন ও ভারত। জাপানভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্য ডিপলোম্যাট শুক্রবার এক নিবন্ধে বাংলাদেশ নিয়ে চীন-ভারতের টানাটানির চিত্র তুলে ধরেছে।

নিবন্ধের শুরুতে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে লড়াই শুরু হয় ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট, যখন চীন বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দেশের স্বাধীনতার পক্ষে নিজেদের সেনা মোতায়েন করে ভারত কার্যত বাংলাদেশের বন্ধু হয়ে যায়।

সম্প্রতি ভারতের নৌবাহিনী প্রধান দেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো যৌথ টহল কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এতে বাংলাদেশ নিয়ে চীন ও ভারতের লড়াই আবারও খবরের শিরোনাম হয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামুদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল সুনিল লানবা। এ সময় দু’দেশের নৌবাহিনীর প্রধান যৌথ টহল কার্যক্রম ‘করপ্যাট’ উদ্বোধন করেন।

গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে চীনের তৈরি দুটি সাবমেরিন মোতায়েন করে বাংলাদেশ। এতে খুশি হতে পারেনি ভারত। চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন কেনা ও বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে ভারত। এর পরপরই গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ সফরে আসেন লানবা। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

নৌবাহিনী প্রধানের সফরের কয়েকদিনের মধ্যে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পরিকরও ঢাকা সফর করেন। এ সফর বাংলাদেশে ভারত ও চীনের প্রভাব সম্পর্কে আমাদের কি বার্তা দেয়? ইতিহাসে ফিরে তাকালে এর উত্তর পাওয়া যায়।

নিবন্ধে বলা হয়, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হওয়ার পর দলটি ক্ষমতা হারায়। ওই বছরের আগস্টের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। তারা ভারতের একচেটিয়া প্রভাব দূর করতে চীনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে।

১৯৭৫ সালের সেনাপ্রধান ও পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণকারী জিয়াউর রহমান এই কার্যক্রম শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতার লড়াইয়ে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।

’৭৫-পরবর্তী সময় ছিল চীন-বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক সহযোগিতার স্বর্ণযুগ। বৈদেশিক নীতিতেও তা বজায় ছিল। তখন উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। আর এতে সমর্থন দিয়েছিল চীন।

চীন ও ভারত নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মেরুকরণ ঘটায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসা পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল।

এরপর আবারও ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনব্যাপী চীনের সামরিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ ভারতের জন্য একটি প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসে, ভারতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে দলটি আরও উদারতা দেখায়।

২০১০ সালে ভারত থেকে সহজ শর্তে ১০০ কোটি ডলার ঋণ গ্রহণ করে বাংলাদেশ। এটি ছিল কোনো দেশকে দেয়া ভারতের সবচেয়ে বড় অঙ্কের ঋণ। ২০১৭ সালে ভারত আরও ৫০০ কোটি ডলার ঋণ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৫০ কোটি ডলার ভারত থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার জন্য রাখা হয়।

এরপর চীন বাংলাদেশের সোনাদিয়া দ্বীপে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে। ধারণা করা হচ্ছিল, ২০১৪ সালের চীন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করবেন। কিন্তু তা কখনই ঘটেনি। ওই প্রকল্প নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে।

গুঞ্জন ছড়াচ্ছে যে, ওই প্রকল্পে বাধা দিয়েছে ভারত। গত বছর বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে দুটি সাবমেরিন গ্রহণ করে। খুবই সস্তা দামে এগুলো কিনেছে বাংলাদেশ। এতে ভারত চরম অস্বস্তিতে পড়ে। পরে বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে সাবমেরিন প্রশিক্ষণ প্রদানের প্রস্তাব দেয় ভারত।

ওই প্রস্তাবের প্রক্রিয়া কতদূর এগিয়েছে তা প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু লানবার সফর ও করপ্যাট নিয়ে ঘোষণা বাংলাদেশ ও এর নৌসীমানায় সরাসরি উপস্থিতির বিষয়ে ভারতের আগ্রহই প্রকাশ পায়। দেশের আসন্ন নির্বাচনেও প্রভাব বিস্তারের লড়াই চালিয়ে যাবে দিলি­ ও বেইজিং।

Print