জাতীয় নির্বাচনের আগে জঙ্গিরা নাশকতার পরিকল্পনা করছে

June 14, 2018 at 11:53 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:   জাতীয় নির্বাচনের আগে জঙ্গিরা নাশকতার পরিকল্পনা করছে বলে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা। সম্প্রতি বগুড়ার একটি জেএমবি (জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) আস্তানা থেকে নাশকতার পরিকল্পনার এ রকম একটি চিঠি পেয়েছে পুলিশ।
কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিরা গোপনে তহবিল সংগ্রহ, প্রচারণা ও নতুন সদস্য তৈরির কাজ করে চলেছে। আবার পাশের দেশ ভারতেও সংগঠিত হচ্ছে জেএমবি। যেখান থেকে বাংলাদেশে নাশকতা চালানোর আশঙ্কাও করছেন কর্মকর্তারা।
সর্বশেষ গত সোমবার মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে প্রকাশক ও বামপন্থী রাজনীতিক শাহজাহান বাচ্চুকে গুলি করে হত্যা করে বোমা ফাটিয়ে পালিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। মতাদর্শিক কারণে জঙ্গিরা বাচ্চুকে খুন করতে পারে বলে ধারণা ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তাদের। ওই ঘটনার পর আরও নড়েচড়ে বসেছেন নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জঙ্গিরা আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে তাঁদের কাছে তথ্য রয়েছে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়ার অনেক আলামতই তাঁরা পাচ্ছেন। তহবিল সংগ্রহে এরা ডাকাতি-ছিনতাই করছে। সম্প্রতি ঢাকা, রাজশাহী ও গাজীপুরে অন্তত ১৫টি ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনায় জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব ছিনতাই–ডাকাতির মাধ্যমে তারা প্রায় এক কোটি টাকা সংগ্রহ করতে পেরেছে। অর্থ সংগ্রহে এত জোর দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করা। তাদের লক্ষ্য নির্বাচন। সম্প্রতি বগুড়া থেকে উদ্ধার হওয়া জঙ্গিদের দুটি চিঠিতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

জঙ্গি চিঠিতে নাশকতার পরিকল্পনা
বগুড়ার কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা গত ১৯ মার্চ জেলা সদরের বাঘোপাড়া বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির রাজশাহী অঞ্চলের তিন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে গ্রেপ্তার করেন। তাঁরা হলেন রফিকুল ইসলাম ওরফে রাকিব, আবু বক্কর ওরফে সীমান্ত ও ইব্রাহিম ওরফে আবির। আবিরের কাছ থেকে উদ্ধার হয় জেএমবির শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশে একজন জঙ্গির হাতে লেখা পাঁচ পৃষ্ঠার পৃথক দুটি চিঠি।
বগুড়ার একজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, হাতে লেখা চিঠি দুটি জেএমবির শীর্ষ আমির সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন ওরফে দাদা ভাইয়ের উদ্দেশে লেখা। চিঠিটি জঙ্গিনেতা ইয়ামিন ওরফে শহীদুল্লাহর মাধ্যমে সালেহীনের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে চিঠি পৌঁছানোর আগেই তা গোয়েন্দাদের হাতে পড়ে। সালেহীন বর্তমানে ভারতে রয়েছেন।
পুলিশ সূত্রগুলো জানায়, দুটি চিঠি কারাগারে বসে লিখেছেন ‘সজল’ (ছদ্মনাম) নামের এক জঙ্গি। দুটো চিঠিতেই উল্লেখ করেছেন, গত বছরের ৭ নভেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাজশাহী কারাগারে ছিলেন না; ছিলেন কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি সেলে। সেখানে ‘দাদা ভাই’ এবং ‘সাগর’ (সম্ভবত হাদিসুর রহমান সাগর) নামে দুই নেতার পাঠানো চিঠি (রিসালা) পেয়েছেন। সেই চিঠির উত্তরে কিছু লেখার তাগাদা অনুভব করছেন বলেও তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন।
সেই চিঠিতে সজল লিখেছেন, ‘অ্যামুনেশন সংগ্রহে তৎপর হওয়া দরকার। সামনে নির্বাচন। বিভিন্ন রকম সহিংসতা হবে। এই সুযোগ কাজে লাগানো দরকার।’
চিঠিতে গত ১৩ নভেম্বর ছয়জনের নামে ১৫ হাজার, ১৫ ডিসেম্বর তিনজনের নামে ১৫ হাজার, ৮ জানুয়ারি ৩ জনের নামে ১৫ হাজার টাকা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
দুটি চিঠিতেই বিভিন্ন কারাগারে বন্দী প্রায় অর্ধশত জঙ্গি এবং তাদের পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা তুলে ধরে মাসিক আর্থিক সাহায্য বাড়ানো এবং নিয়মিতকরণের তাগাদা দেওয়া হয়। কীভাবে এই অর্থ জঙ্গি এবং তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছানো যাবে, তার নির্দেশনা এবং জঙ্গিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের মুঠোফোন নম্বরও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। জঙ্গিদের মামলা মোকাবিলা, আপিল ও জামিনের জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে। জঙ্গি মামলা মোকাবিলার জন্য বিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ এবং সরকারি কৌঁসুলিদের টাকার বিনিময়ে হাত করার পরামর্শও রয়েছে চিঠিতে। গত ১৭ ডিসেম্বর ৮ ব্যাগ খাবার, ১৮ জোড়া মোজা, ২৮টি বিছানার চাদর, ৪৪টি লুঙ্গি, ১৮টি পাঞ্জাবি চিঠির প্রেরক পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
আরেকটি চিঠিতে ছিল, সাংগঠনিক তহবিল গোছানোর তাগাদাসহ সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়বর্ধনমূলক নানা প্রকল্প হাতে নেওয়ার দিকনির্দেশনা। চিঠির এক জায়গায় ব্ল্যাকবোর্ডসর্বস্ব প্রশিক্ষণের বদলে সশস্ত্র জিহাদের প্রতি তাগাদা দেওয়া হয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, সালেহীন এখন জেএমবির হাল ধরেছেন। বাংলাদেশ থেকে ধাওয়া খেয়ে তিনিসহ জেএমবির একটি অংশ ভারতে গিয়ে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছে। ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পর দেশটিতে জেএমবির তৎপরতা আলোচনায় আসে। চলতি বছর বৌদ্ধদের ধর্মগুরু দালাই লামাকে হত্যার পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তারা আবারও আলোচনায় এসেছে।

ভারতে তৎপর সালেহীনরা
ঢাকার কাউন্টার টেররিজমের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ খুন করে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া সালেহীন বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। সেখানে তিনি এবং একই প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান জামাআতুল মুজাহিদীন ইন্ডিয়া (জেএমআই) নামে সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জেএমআইয়ের একটি অংশ গত জানুয়ারি মাসে ভারতের বিহারের বুদ্ধগয়ায় বৌদ্ধদের ধর্মীয় গুরু দালাই লামাকে হত্যার ফন্দি এঁটেছিল। পরে একটি দুর্বল বোমা বিস্ফোরণের পর গোয়েন্দারা তৎপর হলে কয়েকজন গ্রেপ্তার হন। ফাঁস হয়ে যায় জঙ্গিদের পরিকল্পনা।

Print