ব্র্যান্ডিংয়ের অভাবে পরিচিতি পাচ্ছেনা নওগাঁর আম

May 21, 2018 at 9:01 pm

কাজী কামাল হোসেন:
লাভ বেশি হওয়ায় নওগাঁর অনেক কৃষক ধান ছেড়ে আমের চাষ শুরু করেছেন। প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে গড়ে উঠছে আম বাগান। স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্য মতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জেলায় ১৪ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ি যাকিনা গত পাঁচ বছরে জেলায় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন আম চাষ। তবে ব্র্যান্ডিং (প্রচার-প্রচারণা)-এর অভাবে পরিচিতি পাচ্ছেনা নওগাঁর আম।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে পোরশা, সাপাহার, নিয়ামতপুর, মান্দা, ধামইরহাট উপজেলা ছাড়াও জেলার ১১টি উপজেলায় আম বাগান গড়ে উঠেছে ১৪ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে চলতি বছর প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে ১২ দশমিক ৫১ মেট্রিক টন হিসেবে এ বছর আম উৎপাদন হওয়ার কথা ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৪০ মেট্রিক টন।

এ বছর জেলায় আমের ফলন হয়েছে ভালো। ইতোমধ্যে পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর এলাকায় আগাম জাতের আম উঠতে শুরু করেছে। আমের মোকাম হিসেবে পরিচিত পোরশার সারাইগাছী, নিয়ামতপুরের আড্ডা ও সাপাহার বাজারে বেচাকেনা শুরু হয়েছে। আমের গঠন ও স্বাদ ভাল হওয়ায় নওগাঁর আমকে ব্যবসায়িরা রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ জেলায় আমের আবাদ হয় ৭ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে। ফলন হয় ৯৯ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯ হাজার ৮২৩ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ করে ফলন হয় ১ লাখ ২২ হাজার ৮৫০ মেট্রিক টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১১ হাজার ১৮৫ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ করে ফলন হয় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জেলায় ১৩ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে আমের চাষ করে ফলন হয় ১ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন।

নওগাঁয় পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে আমের আবাদ হয়ে থাকে। জেলায় সবচেয়ে বেশী আমের আবাদ হয় পোরশা উপজেলায়। এই উপজেলাতে জেলার মোট উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি আম উৎপাদন হয়।

পোরশা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম বলেন, এ বছর পোরশায় আমের আবাদ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে। এখাকার বেশির ভাগ আম চাষিই অভিজ্ঞ। ফলে এখানে আমের ফলনও হয় বেশি। এখানে ফজলি, ক্ষীরশাপাতি, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, আশ্বিনা, আম্রপালি সহ সুপরিচিত ও সুস্বাদু প্রায় সব জাতের আম উৎপাদিত হয়ে থাকে। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে সঠিক ব্র্যান্ডিং (প্রচার-প্রচারণা)-এর অভাবে এই আমগুলোই ঢাকায় কিংবা দেশের অন্য অঞ্চলে গিয়ে চাঁপাই কিংবা রাজশাহীর আম বলে পরিচিত পাচ্ছে।

পোরশা উপজেলার নিতপুর ইউনিয়নের বাঙ্গালপাড়া গ্রামের আমচাষি আমির উদ্দিন সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, হামাগের এলাকার ঠাঁ ঠাঁ বরেন্দ্র এলাকা। খরার সময় স্যাচের (সেচ) অভাবে ইরি ধান আবাদ হয় না। আমন ধান আবাদ হলেও অ্যাঁটেল (এঁটেল) মাটি হওয়ায় ধানের ফলন ভালো হয় না। এক বিঘা জমিতে বছরে ২০ মণ ধান উৎপাদন হলে যে লাভ হবে ওই জমিত আম বাগান করলে তার ডবল (দ্বিগুন) লাভ হয়। তাই ম্যানষের দেখাদেখি হামিও হামার ১০ বিঘা জমিত আম বাগান গড়ে তুলছি। গত বছর ১০ বিঘা বাগানে সাড়ে ৪ লাখ টাকার আম বিক্রি হছিল। তবে কষ্ট লাগে যখন শুনি হামাগের আমকে রাজশাহীর আম বলে।

পোরশা উপজেলার নিতপুর ও গাঙ্গুর ইউনিয়নের তছলিম উদ্দিন, নয়ন বাবু, শামসুল আলম শাহ চৌধুরী আশরাফুল ইসলাম সহ ১০-১৫ জন আমচাষির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ এলাকায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ হচ্ছে। আম চাষের উপযোগি মাটি হওয়ায় আমের গুনগতমান বেশ ভালো। তারা বলেন, পাইকার আম কিনে আমাদের আমকে রাজশাহীর আম হিসেবে যখন চালায় তখন আমাদের কষ্ট লাগে। নওগাঁর আম বাংলাদেশের যেকোন আমের চেয়ে গুনগত মানের দিক থেকে ভাল। তাই আমরা চাই আমদের আম দেশবাসি চিনুক নওগাঁর আম হিসেবে। এ ব্যপারে যদি সরকার কোন উদ্যোগ নেয় আমরা সবাই সহযোগিতা করবো।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনোজিৎ কুমার মল্লিক সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজশাহী বিভাগের চারটি জেলায় (রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর) মোট আম উৎপাদনের পরিমান ছিল প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধু নওগাঁতেই আমের উৎপাদন ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে নওগাঁ জেলায় ১ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছিল।

তিনি বলেন, নওগাঁয় উৎপাদিত প্রায় সব আম আধুনিক প্রজাতির। অথচ নওগাঁর আমের কোনো পরিচিতি নেই। ব্যবাসায়ীরা নওগাঁ থেকে আম কিনে নিয়ে সেগুলোকে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বলে চালিয়ে দিচ্ছে। ব্র্যান্ডিং (প্রচার-প্রচারণা)-এর অভাবে নওগাঁর আমের কথা দেশবাসি জানতে পারছেনা। তিনি নওগাঁর আমকে ব্রান্ডিং হিসেবে পরিচিত করার জন্য সকলের সহযোগিতা চান।
স/শ

Print