বাংলাদেশে মিডিয়া ক্যু’র সবচেয়ে বড় শিকার পার্বত্য বাঙালিরা!

April 16, 2018 at 9:24 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

খবরের নামে গুজব ছড়ানোর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে মুসলিম ও রোহিঙ্গাবিদ্বেষী মনোভাবে উসকানি ও প্রণোদনা জোগানোর কাজে ফেসবুককে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাখাইনে নিধনযজ্ঞ পরিচালনার প্রেক্ষাপট তৈরিতে রোহিঙ্গাবিদ্বেষী কাজে ফেসবুকই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থার অভিযোগের পর সম্প্রতি ফেসবুকের উদ্যোক্তা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গও স্বীকার করেছেন যে, মিয়ানমারের চলমান রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলেও প্রায় অনুরূপ ক্ষেত্র সৃষ্টির অপচেষ্টার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। যেখানে, প্রতিনিয়তই বাঙালি বিদ্বেষী অপপ্রচার চালিয়ে ঘৃণা, অবিশ্বাস আর সন্দেহের বীজ বপনের কাজে ফেসবুক ক্রমেই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে, বেছে বেছে শুধুমাত্র বাঙালিদেরকে টার্গেট করা হচ্ছে তা নয় বরং, অনেক ক্ষেত্রেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাশাপাশি এসব পোস্টে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন এমনকি সরকার এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এমন উপাদানও রয়েছে।

পাহাড়ে এমনকি সমতলে সংঘটিত ঘটনাকে পুঁজি করেও এমন অপচেষ্টা অহরহ দেখা যায়। এক্ষেত্রে, বেশিরভাগ সময়ই যেকোন বাস্তব ঘটনাকে ব্যবহার করা হয়; তবে প্রকৃত ঘটনা গোপন করে, কিছুটা মিথ্যে মিশ্রণ করে বা আংশিক সত্য প্রকাশ করে এবং ছবি এডিট করে প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও অতীতে ঘটে যাওয়া ভিন্ন কোনো ঘটনার ছবি ব্যবহার করে, সাম্প্রতিক বা আলোচ্য ঘটনার ছবি হিসেবে চালিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়। এ ধরণের প্রচেষ্টার নিয়মিত শিকার হচ্ছে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিরা। ইচ্ছে করেই ইতিবাচক সংবাদগুলো আড়াল করে শুধুমাত্র নেতিবাচক সংবাদগুলোই সামনে এনে এবং অবশ্যই কিছুটা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়; বাঙালির প্রতি ঘৃণা আর পাহাড়িদের প্রতি সহানুভূতি অর্জনের উদ্দেশ্যে।

উপরের ছবিটি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে কিশোরী বিউটি আক্তারের, যাকে হত্যা করা হয় গত মার্চের ১৬ তারিখে। ঘটনার পরপরই বাঙালি বিদ্বেষী পোস্ট চলে আসে ফেসবুকে। ২০১২ সালের সবিতা চাকমার ঘটনা উল্লেখ করে একটি উস্কানিমূলক পোস্ট আপলোড করা হয়, যেখানে ব্যবহার করা হয় ২০১৮ সালের বিউটি আক্তারের মৃতদেহের ছবি। প্রকৃতপক্ষে, ২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সবিতা চাকমার লাশ নিজ বাড়ির পাশে পাওয়ার পর বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠনগুলো থেকে সবিতা চাকমা বাঙালি ট্রাক ড্রাইভার ও হেলপার কর্তৃক গণধর্ষিতা হয়ে মারা গেছে বলে দাবি করে ব্যাপক প্রচারণা, প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। এমনকি শাহবাগেও সবিতা চাকমা ‘ধর্ষণ’ ও খুনের ঘটনায় মানবন্ধন হয়েছে। আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলোও সেই সংবাদ গুরুত্ব সহকারে ছাপালেও পরে ময়না তদন্তে যখন প্রমাণ হয় যে, তাকে ধর্ষণ করা হয়নি তখন সেই সংবাদটি তারা বেমালুম চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।

এমন আরো অনেক ঘটনা রয়েছে যেখানে পাহাড়ি মেয়ে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার সাথে বাঙালিদের জড়িয়ে ফেসবুকে ভয়াবহ রকমের উস্কানি ও অপপ্রচার চালানো হয়েছে যার সাথে বাঙালিদের ন্যূনতম সম্পর্কও ছিলো না বরং অনেক ক্ষেত্রেই পাহাড়কে অশান্ত করে ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে পার্বত্য অঞ্চলের ত্রাস ইউপিডিএফ- এর সদস্যরা ধর্ষণ ও খুন করে তা বাঙালিদের উপর এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপর চাপানো হয়েছিল, যার প্রত্যেকটি ঘটনাই পরে মিথ্যা প্রমাণিত হলেও তা মিডিয়া চেপে যায়। এসব অপপ্রচারের সাথে আমাদের কিছু মিডিয়ারও জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে।

জনপ্রিয় ব্লগ ইস্টিশন ডট কম-(https://www.istishon.com/?q=node/19537) এ ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণ: বিচার কামনার চেয়েও বাঙালিকে ধর্ষক প্রমাণ করাটা যখন অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ শিরোনামে নাজমুল আহসানের লিখা থেকে জানা যায়, “বাংলাদেশে মিডিয়া ক্যু’র সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে পার্বত্য বাঙালিরা।”তিনি আরো জানিয়েছেন, “অনেক অপরাধের বোঝা বইতে হয়েছে পার্বত্য বাঙালিদের, যেটার জন্য আদৌ তারা কোনোকালেই দায়ী ছিলো না।”পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণ ও তার প্রতিবাদের শুধুমাত্র ২০১৪ সালের ৫টি ঘটনাকে কেস স্টাডি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দেখিয়েছেন যে, “কেউ কেউ আসলে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের বিচার চায় না, কিন্তু বাঙালিই ধর্ষক- সেটাই প্রমাণ করতে চায়। বিচার এখানে মূখ্য নয়, ধর্ষণকে কেন্দ্র করে আমি কতোটুকু রাজনীতি করতে পারলাম, সেটাই মূখ্য বিষয়।”

দেবী ত্রিপুরা, বিশাখা চাকমা, উ প্রু মারমা, আয়না চাকমা, দিপা ত্রিপুরা, ফাতেমা বেগম এবং সবিতা চাকমা- এর মতো অনেক ঘটনা আছে যেখানে ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও ঘৃণা সৃষ্টিতে।

পার্বত্যাঞ্চলে বাঙালিদের প্রতি ঘৃণার প্রকটতা এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মৃতকে পর্যন্ত রেহাই দেয়া হয়নি। রাঙামাটিতে পাহাড় ধ্বসের অব্যবহিত পরেই সেনাসদস্যরা জীবন বাজি রেখে উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পরে। অথচ, এই উদ্ধার কাজে নিয়োজিত সেনাসদস্যদের মৃত্যুতেও কিছু পাহাড়িকে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তারচেয়েও বেদনাদায়ক হলো এই যে, তারা তাদের এই ঘৃণা ও উল্লাস প্রকাশে কোনো রাখ-ঢাকের ধার ধারেনি, বরং প্রকাশ্যেই জানান দিয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে।

২ জুন ২০১৭, সকালে রাঙামাটির লংগদুতে পাহাড়িদের প্রায় শতাধিক বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। অনুমান করা হচ্ছে, পাহাড়ি দুই যুবকের হাতে নিহত বাঙালি মটর সাইকেল চালক নয়নের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ মিছিল হতে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল তরুণ এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী। ফেসবুকের কল্যাণে ঘটনাটি অতি দ্রুত লংগদুর বাইরে ছড়িয়ে দেয়া হয়, দেশে এবং বিদেশে; তবে একটু ভিন্নভাবে। জ্ঞাতসারেই হোক আর অজ্ঞাতসারেই হোক, এই ভয়াবহ সংবাদটি কয়েকটি দেশি এবং বিদেশি পত্রিকাতেও খানিকটা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

যে তিনটি ছবিকে লংগদুর অগিকাণ্ডের ছবি বলে চালানো হলো, দেশবাসী এবং বিশ্ববাসীর সমবেদনা প্রাপ্তি এবং বাঙালিদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির লক্ষ্যে, সেগুলো আসলে এদেশেই ঘটে যাওয়া টঙ্গীতে বয়লার বিস্ফোরণ (১০/৯/১৬), গাইবান্ধায় সাঁওতাল পল্লী (৭/২/১৭) এবং বরিশালে বিস্কুটের গোডাউন (৪/২/১৭) এর আগুনের ছবি। অনলাইনে গিয়ে ‘লংগদুতে আদিবাসীদের উপর হামলা: কিছু ভুল ছবি’(https://www.jaachai.com/posts/post-807) শিরোনামে একটি পেজ থেকে জানা যায় যে, লংগদুতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা সত্য হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় যে সকল ছবি এসেছে তার সব ছবিই এই ঘটনা সংশ্লিষ্ট নয়। ভিন্ন ঘটনার ছবি ব্যবহার করে বাঙালিদের দোষারোপ করা হয়েছে অত্যন্ত সুচারুভাবে।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বাংলাদেশ সংক্রান্ত যেকোন সংবাদের মধ্যে দেশ বিরোধী বা দেশের জন্য অবমাননাকর উপাদান যোগ করে ফেসবুকে পোস্ট করা হয়। যেকোন কিছুর সাথে কিছুটা মিথ্যে যোগ করে বা কোনো নেতিবাচক সংবাদের সাথে বাঙালি বিদ্বেষী মতামত যোগ করে পোস্ট আপলোড করা নৈমিত্তিক ব্যাপার।

কিন্তু, চরম বাস্তবতা হলো- ফেসবুকের এই ঘৃণা ছড়ানো এবং বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাশাপাশি অশান্তি এবং অসাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প পাহাড়ের বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে। নিরীহ এবং সরল মানুষগুলো প্রকৃত সত্যের পরিবর্তে মিথ্যের জালে ক্রমাগত আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়ছে; না বুঝেই পরস্পরের শত্রু হয়ে মুখোমুখি হয়ে পড়ছে একই সমাজের মানুষগুলো। ষড়যন্ত্রকারীদের কূটচালে ব্যাহত হচ্ছে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি; অকার্যকর হয়ে পড়ছে রাষ্ট্রীয় আন্তরিকতা, দেশবাসীর উদারতা আর জাতির ধর্মীয় সহিষ্ণুতা। দেশের বাইরে ভুলন্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সম্মান ও মর্যাদা।

তাই, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের অপব্যবহার আর ভারতে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজব ছড়ানোকে মাথায় রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে ফেসবুকে ধর্মীয় উস্কানিমূলক ও বাঙালি বিরোধী প্রচারণা ও ঘৃণা ছড়ানো বন্ধের পদক্ষেপ এক্ষুণি নিতে হবে। এ নিয়ে কালক্ষেপণের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বরং এ বিষয়ে লাগাম টানতে যত দেরি হবে, তত বেশি জ্যামিতিকহারে এই ক্ষতির শিকার হতে পারি আমরা সকলে।

Print