কালাসিন্ধু

April 5, 2018 at 8:23 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

দীর্ঘ দিন পরে ডাহুক-কোরার ঝোপঝাড় কাঁপানো এক কুহুকি ডাকে মোজম মাস্টারের মন আনন্দে চিরবির করে ওঠে। ছেচল্লিশ বছর পরও কালাসিন্ধু গ্রামের আদিরূপ এখনো বদলায়নি। পাশের দীর্ঘ নদী কালাসিন্ধু তার খেমটা নাচের ঢেউ নিয়ে এখন হয়তো বা মাতামাতি করে না। নাগিনীর ফণার মতো ছোট ছোট ঢেউ এখনো হিসহিস শব্দ তুলে আছড়ে পড়ে। বয়স হয়েছে কালাসিন্ধুর, তার সাথে পরিবর্তনও এসেছে নদীর শরীরে। এখন কিছুটা শান্ত, পরিণত বয়স হলে যা হয়। চর পড়েছে এদিক-সেদিক, বিশাল বালুর চটানে ঘাসের জমিনের সীমানা বেড়েছে। গরু-ছাগলের মুখ ঢুকিয়ে ঘাস খাওয়ার এক অফুরান খাদ্যভাণ্ডারের জন্ম হয়েছে। লঞ্চঘাটটি একটু সরে গেছে উত্তর দিকে। নদীপারের হাটবাজার একটু ভেতর দিকে সরে গিয়ে কালাচান চেয়ারম্যানের বাড়ির একেবারে কাছে ঠাঁই নিয়েছে। নৌকাগুলো ভিড়ত আতশ আলীর ছোট চায়ের দোকান বরাবর। চর পড়ায় নৌকার নোঙর পড়েছে গ্রামের পশ্চিম দিকের তেমাথার মোহনায়। ঠিক এখানে ছিল তনু ঘোষের মিষ্টান্নভাণ্ডার। তার পাশে হরেক পদের মালামাল নিয়ে আবদু ফকিরের বিশাল দোকান ছিল। মুড়িমুড়কির মিঠাই-মণ্ডার দোকানে হাজারো মাছি বিনবিন করত। হাওয়ায় উড়ত ধুলোবালু, দখিনা বাতাস লুটোপুটি খেলত, নিদাগ জোছনার হাহাকারে কেঁপে উঠত কালাসিন্ধু গ্রাম। খানিক দূরে কোব্বাত মাস্টারের বিশাল মক্তবজুড়ে কালাসিন্ধু গ্রামের সোনালি কিশোর-কিশোরীদের আমাছিপাড়ার পড়ার মধুর শব্দে কেঁপে উঠত কালাসিন্ধু। গাঁয়ের একমাত্র ইতল-বিতল পথটি হারিয়ে যেত গাঁয়ের শেষ সীমানায়। কালাসিন্ধু গ্রামে ঢোকার এই একটি মাত্র পথ। দু’পাশে নাম নাজানা বৃক্ষসারির নিবিড় বন। লতাগুল্মের পাশাপাশি কাঁটামান্দারের ধেই ধেই করে বেড়ে ওঠা প্রকৃতির এক দুর্লঙ্ঘ দেয়াল কালাসিন্ধু গ্রমটিকে রক্ষা করে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। কাঁটামান্দারের সারি কালাসিন্ধু গ্রামটিকে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করার যেন এক বৃক্ষঢাল।

এ চরে জনমনীষীর পরিচয় কিন্তু অন্যখানে। কালাসিন্ধু গ্রামের ইতল-বিতল পথের মাঝে পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালাসিন্ধু বটবৃক্ষ। সম্রাটের বিশাল প্রাসাদের ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা নাঙ্গা তরবারি হাতে কালাসিন্ধু বটবৃক্ষ যেন এক বিশাল দেহধারী পাহারাদার। প্রকাণ্ড শরীর নিয়ে বেশুমার জায়গা দখল করার পাশাপাশি অসংখ্য শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে কোঠি পত্রপল্লবের দিগন্ত বিস্তৃত পাখা ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালাসিন্ধু মহারাজ। গায়ে-গতরের বিশাল ফাঁক-ফোকরে পাক খাওয়া শরীরের পাশ ঘেঁষে ইঁদুর আরশোলা বাদুড়েরা ঝাঁপাঝাঁপি-লাফালাফি করে, কালীগোক্ষুর ঠাণ্ডা চোখ মেলে তা তাকিয়ে দেখে, কিন্তু কিছু বলে না। কত পদের পাখি যে আসে বটফল খাওয়ার লোভে। কেউ কেউ আসে দলের সাথে, কেউ আসে একা একা। কোনো কোনো পাখির দল কালাসিন্ধুর ঘন পাতার আড়ালে বাসা বেঁধে থেকেও যায়, ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটে, বাচ্চারা বড় হয়ে এক সময় চলেও যায়। যার যেমন ইচ্ছা। মহানন্দে পাখি, সাপ, পিঁপড়া, আড়শোলা, বাদুড়, জোছনা, ছায়া নিয়ে ভালোভাবেই দিন কাটছিল কালাসিন্ধুর। মাগো মা এমন পাহাড়ের মতো দশাশই চেহারা কালাসিন্ধুর সাক্ষাৎ ব্রহ্মা যেন ভর করে আছে এই বিশাল মহীরুহে। কালাসিন্ধুর ছায়া কী মনোরম। চোতের দাবদাহে হাঁসফাঁস করা পথিকের ঘর্মাক্ত মন নিমিষেই যেন বরফশীতল হয়ে যায়। হিন্দুরা তো ধুপধুনো দিয়ে পয়লা বৈশাখে ফলমূলের প্রসাদ বিতরণের সাথে পূজায় মেতে ওঠে। লুলা-কানা ফকিরেরা এই গাছের নিচে রাত যাপন করে। লুলা ফকিরের পায়ের ঘ্যানঘ্যানে ঘা থেকে পুঁজ খাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয় কালাসিন্ধু বটবৃক্ষের হাজারো লাল পিঁপড়ার দল। হাজারো লাল পিঁপড়া সারিবদ্ধ হয়ে লাল পুঁজের মজাদার খাবার খাওয়ার জন্য রণোন্মাদ সৈনিকের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ত লুলার ঘ্যানঘ্যানে ঘায়ের পুঁজের ওপরে। কালাসিন্ধুর ডালে ঝুলে থাকা পান্নস সাপের দল তখন শালিখের ছানা খাওয়ার মহানন্দে মশগুল থাকত। আহা ৪৬ বছর আগের কালাসিন্ধুর, তুমি কেমন আছো? গায়ে-গতরে পোক্ত থাকলেও এখন আর আগের মতো রূপ-যৌবন কালাসিন্ধুর নেই। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ঠিক মোজম মাস্টারের মতো জীর্ণশীর্ণ স্থবির দেহের মতো, বৈশাখের ঝড়ঝাপটা ধরে রাখার শক্তি নেই, নেই পত্রপল্লবের সবুজ দাপট। এক সময় কালাসিন্ধু পরাক্রমশীল শত্রুকে পরাজিত করার সাহস ও শক্তি সব কিছুই ছিল; এখন আর কিছু নেই। মোজম মাস্টারের এক সময় যেমন ছিল। সময়, আহা সময়! আজ ৪৬ বছর পরে ঠিক কোন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে মোজম মাস্টার, তা টের করতে না পারলেও তার স্পষ্ট মনে আছে, মোজম মাস্টার স্কুলের ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে এই কালাসিন্ধুর ছায়াতলে বিশ্রাম নিত। সাথে থাকত তার একমাত্র মা-মরা মেয়ে জরিফুলের জন্য দোকান থেকে কেনা এক পোঁটলা লেবেনচুস অথবা বিস্কুটের ছোট একটা পোঁটলা। জরিফুলের কথা মনে পড়ে এই শেষ বয়সে হুহু করে কেঁদে ওঠে মোজম মাস্টার। সেই সময়, সেই রক্তাক্ত একাত্তর। কালাসিন্ধুর গ্রাম। পাক বাহিনীর মেশিনগানের ব্রাশফায়ারের গগনবিদারী টা টা শব্দের সাথে মৃত্যুপথে ধাবিত হাজারো মানুষের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দেয়া মাতমের মাঝে কালাসিন্ধুর পাশের গ্রামের টিনের চালাগুলো আগুনের লেলিহান শিখায় ফটাস ফটাস শব্দ তুলে ধাউ ধাউ করে জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছিল, গৃহস্থালি তামাম জিনিস পুড়ে আগুনের পিণ্ড হয়ে বুলেটের মতো মাতাল উ™£ান্তের মতো এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছিল। এই দুষ্কালের দিবানিশির কঠিন সময় কালাসিন্ধু গ্রামের মানুষ যাবে কোথায়? তখন এই বুক উঁচানো কালাসিন্ধু বটবৃক্ষ হিমালয় পর্বতের মতো তার বিশাল কাণ্ডকে হাজারো বুলেটের সামনে বুক পেতে কালাসিন্ধুর মানুষকে রক্ষা করেছিল। পাক বাহিনীর মেশিনগানের অসংখ্য বুলেট-গোলায় ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়েছিল কালাসিন্ধুর দেহ। কড়াৎ শব্দে প্রকাণ্ড ডালা ভেঙে পড়লেও কালাসিন্ধু জীবন বাজি রেখে গাঁয়ের হাজারো মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রক্ষা করেছিল। দিনভর গোলাগুলির বৃষ্টিকে দাঁড়িয়ে থাকা কালাসিন্ধুর রুখে দিয়েছিল। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মোজম মাস্টার অগণিত মানুষের সাথে এই কালাসিন্ধুর কাণ্ডতলে এসে জীবন বাঁচিয়েছিল। দিন শেষে পাক হায়েনাদের গোলাগুলি থেমে যায়। রাতের আঁধারে মাতালের মতো টলতে টলতে কালাসিন্ধুর মানুষেরা তাদের বিধ্বস্ত আগুনে পোড়া ঘরে যখন ফিরছিল, ঠিক সে সময় এক গগনবিদারী কান্নার আওয়াজে কালাসিন্ধুর মানুষের দৃষ্টি তখন কান্না যেদিক থেকে আসছে সেদিকে ফিরে যায়। রুদ্ধশ্বাসে সবাই দৌড়ে যায়, দেখে জরিফুলের পোড়া দেহ নিয়ে মোজম মাস্টার বুক চাপড়ে কাঁদছে। এক সময় নিশুতি রাত কালবাদুড়ের ডানা ছড়িয়ে দিয়ে ঝুপ করে নেমে পড়ে বিধ্বস্ত আগুনে পোড়া কালাসিন্ধু গ্রামে। শুধু এখানে সেখানে লুকিয়ে থাকা কিছু মনিবহারা কুকুর জলা-জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে আ আ শব্দ তুলে মনিবের খোঁজে বিলাপ করতে থাকে। অসংখ্য বুলেটে বিদ্ধ ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে কালাসিন্ধু বটবৃক্ষ একা একা দাঁড়িয়ে থেকে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করতে থাকে। একাত্তরের পোড়া স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কালাসিন্ধু। কালাসিন্ধুর এই নীরব অশ্রুপাতের কথা কেউ না জানলেও একমাত্র মেয়ে জরিফুলহারা মোজম মাস্টার ঠিকই মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পেরেছিল। সেই অভিশপ্ত রাতের পর কালাসিন্ধুর মানুষ আর কখনো মোজম মাস্টারের চেহারা দেখেনি। মাস্টার কি বেঁচে আছে না মরে গেছে তা নিয়ে বৈকালিক আড্ডায় কালাসিন্ধুর মানুষ আতশ আলীর দোকানে আলগাপাতির চা খেতে খেতে মাঝে মাঝে সেই সময়ের স্মৃতিচারণে ফিরে যেত। সেই থেকে কালাসিন্ধু বটবৃক্ষ এই গাঁয়ের যেন স্বাধীনতার প্রতীক। ছেচল্লিশ বছর পর ন্যুব্জ দেহে কঙ্কাল শরীর নিয়ে যখন মোজম মাস্টার ফিরে আসে, তখন কালে-কস্মিনেও এই গ্রামের মানুষ ধারণা করতে পারেনি যে মোজম মাস্টার বেঁচে আছে, মৃত্যুর আগে ঠিক স্বাধীনতা দিবসের আগের রাতে সে ফিরে আসবে।
মোজম মাস্টার টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়, কাঁপা কাঁপা পা ফেলে ছেচল্লিশ বছর আগের সেই আতশ আলীর চায়ের দোকানের দিকে হাঁটতে থাকে। সন্ধ্যার নিভুনিভু আলোয় আতশ আলীর চায়ের দোকান তখন জমজমাট। বাঁশের কঞ্চিতে লাগানো দড়ির আগুন তখন ছোট জবাফুলের মতো মিনমিন করে জ্বলছে। ঠিক সে মুহূর্তে চোখ পড়ে সবার- টলতে টলতে স্থবির ভাঙাচোরা শরীর নিয়ে কে আসছে? এ সময় তো এ গাঁয়ে লঞ্চ ভেড়ার সময়ও শেষ। আগন্তুক লোকটি কে? টলতে টলতে এসে বাঁশের বেঞ্চিতে ধপ করে বসে পড়ে। আতশ আলীকে বলে- ‘এক কাপ চা হবে, আলগা পাতি দিয়ে।’
আগন্তুকের মুখের দিকে ঠায় চেয়ে থাকে চায়ের দোকানের কাস্টমাররা। বেঞ্চির এক কোণে বসে থাকা কইরা চানতারা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে বলে ওঠে-
‘মিয়া ভাইয়ের বাড়ি কই, এহানে আইছেন কিয়ের লাইগ্যা।’
কইরার কথা শুনে বাইল্যা মাছের সাদা চোখের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন মোজম মাস্টার। দণ্ডকয়েক পর পাগলের মতো হা হা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। বেঞ্চিতে বসে থাকা গরিব হোসেন কয়েক পা এগিয়ে এসে বলে- ‘পাগল ছাগলে দেশ ভইরা গেছে।’
মোজম মাস্টারের গগনবিদারী হাসি আর থামে না। চিৎকার করে বলে- ‘তোমরা কি জরিফুলরে দেখছো? দেখলে কইয়া হালাও, নইলে এই কালাসিন্ধুর কাছে বিচার চামু… হে হে হে কালাসিন্ধু সবই জানে, এয় বটগাছ অইলে কী অইবো হেয় সব কিছুই জানে, হেয় বুকের ভেতরে লুকাইয়া রাখছে জরিফুলরে।’
গরিব হোসেনের পাশে বসা জব্বর আলী উঠে এসে হঠাৎ মোজম মাস্টারের গালে ঠাস করে চড় কষিয়ে দেয়। আচমকা চড় খেয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায় মোজম মাস্টার। জব্বর আলীর আচমকা এই কাণ্ড দেখে থ খেয়ে যায় আতশ আলীর দোকানের তাবৎ খরিদ্দাররা।
এই এই পাগলরে মারলি ক্যা? হেয় তো কামেল মানুষও অইতে পারে। জব্বর আলী বিপদের গন্ধ পেয়ে দোকানের পেছন দিয়ে সটকে পড়ে। দু-তিনজনে মিলে মোজম মাস্টারকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে। একজন একটা বনরুটি এগিয়ে দিয়ে বলে-
‘চাচা খাইয়ালন, কইথন আইছেন চাচা, ঠায়-ঠিকানা কী?’
মাস্টার উঠে বসে হাঁপাতে থাকে। কোটরে যাওয়া ঘোলা চোখ নিয়ে এদিক-সেদিকে তাকায়। আতশ আলী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, মানুষটারে চেনা চেনা মনে অইতাছে, জরিফুল কেডা…, কার কথা কয়, তয় মানুষটার মনে খুব দুঃখ, মাবুদরে, এই দুঃখ থাইক্যা মাইনষেরে আছান দেও মাবুদ।
‘চাচা এই রাইতে থাকবেন কই, কেউকি আছে এই গেরামে?’
মোজম মাস্টার কিছু বলে না। ঝোলাটি কাঁধে নিয়ে ধীরপায়ে রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যায়। রাত গভীর হয়। ধীরে ধীরে চায়ের দোকানের মানুষও আতশ আলীর দোকান থেকে বিদায় নেয়। আগামীকাল স্বাধীনতা দিবস। আশপাশের কোনো গাঁয়ের স্কুল থেকে মাইকে ভেসে আসছে গানÑ ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্তলাল, রক্তলাল।’ বাড়ি যাবার পথে কে যেন বলে ওঠে, ‘মানুষটারে দেখলে কাহা মোজম মাস্টারের মতো মনে অয়, মাস্টারের চেহারাডা ঠিক এমুনই আছিল।’ কেউ কোনো কথা বলে না, চুপচাপ যার যার বাড়ি চলে যায়। ছেচল্লিশ বছর আগের কথা, কেউর কি তা মনে আছে? রাতের আঁধারে মোজম মাস্টার টলতে টলতে হাঁটতে থাকে। তার শেষ বিশ্রামের স্থান এই কালাসিন্ধুর ছায়ায়। একাত্তরে মারা যাওয়া জরিফুলের স্মৃতি নিয়ে পাগলের মতো কত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে মোজম মাস্টার। এক বুক ব্যথা নিয়ে চষে বেড়িয়েছে পথপ্রান্তর। জরিফুলের মতো মিষ্টি চেহারা দেখে কত কিশোরীকে জড়িয়ে ধরেছে। পরের মেয়েকে মোজমের কাছে কে দেবে? এর পরের ইতিহাস কত বেদনাদায়ক, ছেচল্লিশ বছরে কত বসন্ত-শীত মোজমের মাথার ওপর দিয়ে নিঃশব্দে পার হয়ে গেছে, মোজম তা বলতে পারে না। এই ঘনঘোর আঁধার রাতে কালাসিন্ধু কোথায়? হায় কালাসিন্ধু, আমাকে আশ্রয় না দিয়ে সে সময় না বাঁচিয়ে জরিফুলকে কেন বাঁচাতে পারলি না, তুই দায়ী কালাসিন্ধু, অন্ধকারের মাঝে পাগলের মতো বুক চাপড়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে থাকে মোজম মাস্টার। সে সময় কালাসিন্ধুর গা গড়িয়ে নিশুতি পাখিরা ভয়ঙ্কর স্বরে আর্তনাদ করে উঠছিল। কালাসিন্ধুর গা-ঘেঁষে অসংখ্য মৃত মানুষের হাড় করোটি মার্চপাস্ট করে এগিয়ে আসছিল, হাতে তাদের বিজয় পতাকা। হাড় করোটিদের মিছিল নিভৃতে এসে মোজম মাস্টারের হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলে দিয়ে বলেছিল- এই পতাকা যেন কালাসিন্ধুর শীর্ষডালে উড়িয়ে দেয়। এর সাথে জরিফুলের রক্তাক্ত পিরহান উড়িয়ে দেবে মাস্টার। এক সময় জরিফুলের রক্তাক্ত এই পিরহান বাতাসে হেলবে-দুলবে; যেমন করে এই কালাসিন্ধুর ডালে ঝুলনি বানিয়ে ঝুলত জরিফুল, ঠিক তেমনিভাবে শীত-বসন্ত-গ্রীষ্ম-হেমন্তে দুলবে জরিফুল হা.. হা.. হা..। পাগলের মতো হাসতে থাকে মোজম। অন্ধকারে দু’হাতে খামচে ধরে মাটি, উন্মাদের মতো মাটি উপড়াতে থাকে। শক্ত মাটির আঁচড়ে হাত রক্তাক্ত হয়, থেমে থাকে না মোজম, দরদর করে ঘাম ঝরতে থাকে। বিড়বিড় করে বলে ওঠে- ‘জরি মা আমার বুকের ধন? তরে লুকাইয়া রাখছে কালাসিন্ধু। কালাসিন্ধু তুই আমার মারে লুকাইয়া রাখতে পারবি, পারবি না, এই মাডিরে ফাঁক কইরা তর হাড়গোর সব- সব বাইর করমু… এর পরে তরে লইয়া হাইট্টা যামু কাশফুলের বনের ভেতরে…. যেহানে সব সাদা… সব… সাদা।’ নীরব নিথর দেহটি ধপ করে পড়ে যায় কালাসিন্ধুর মাটিতে। কেউ কিছু না জানলেও কালাসিন্ধু বটবৃক্ষ তা দেখে হুহু করে কেঁদে ওঠে। কালাসিন্ধুর এই হুহু বিলাপ কেউ দেখে না।
ভোরে সারা গ্রামে ছড়িয়ে যায়, কে যেন মরে পড়ে আছে কালাসিন্ধুর বটবৃক্ষতলে। ব্যাপারটি প্রথম টের পায় নামাজ পড়তে আসা আবদু ফকির। সারা গাঁয়ে ঢিঢি পড়ে যায়- ‘আহা কেডায়, কোন মায়ের পুত এমুন বেঘোরে মরল গো।’ সকালে আতশ আলী এ পথ ধরে দোকানে আসতে গিয়ে দেখে এ তো আর কেউ নয়, গত রাতে তার দোকানে বসে থাকা সেই অচেনা পাগল। রাতে কালাসিন্ধুর বটগাছের নিচে, শেষমেশ লোকটা মারাই গেল।’ দাফন-কাফনের সময় ছেঁড়া-ময়লা পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের হলো জরাজীর্ণ কাগজে কিছু লেখা। ঝোলাটি খুলতেই বের হলো এক কিশোরীর রক্তাক্ত পিরহান। জরাজীর্ণ কাগজে লেখা- ‘এখানে এই কালাসিন্ধুতলে যে বৃদ্ধ পাগলটি মারা গেল, হে কালাসিন্ধুর আমার আপন মানুষেরা, তোমরা হয়তো কালে-কস্মিনেও ভাবতে পারবে না, আজ থেকে ছেচল্লিশ বছর আগে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোর সময়ে গ্রাম ছেড়ে যাওয়া তোমাদেরই প্রাণপ্রিয় মাস্টার মোজম এখানে মরে পড়ে আছে। বিধ্বস্ত আগুনে পোড়া ঘরে পেয়েছিলাম আমার মেয়ে জরিফুলের রক্তাক্ত পিরহান, তার জন্য আনা লেবেনচুষের পোঁটলাটি আমি জরিফুলকে দিতে পারিনি। সেই অভিশপ্ত রাতে কাউকে না জানিয়ে আমি জরিফুলের পিরহান বুকে চেপে পালিয়েছিলাম এ গ্রাম থেকে। ছেচল্লিশ বছর ধরে আমি বাংলার এ প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে রুদ্ধশ্বাসে আমার মেয়ে জরিফুলের চেহারার কিশোরী আঁতিপাঁতি করে খুঁজেছি, কপাল মন্দ আমার কোথাও জরিফুলের মতো মিষ্টি কিশোরী আর খুঁজে পাইনি, জরিফুলের মতো অসংখ্য কিশোরী মুক্তির মন্দিরের সোপানতলে বলিদান হয়েছে। সুতরাং জরিফুলের জন্য দুঃখ করে লাভ কী? এর পরও জীবন প্রদীপ যখন নিভে আসার সঙ্কেত দিলো তখন সেই ছেচল্লিশ বছর আগের কালাসিন্ধু আমাকে অবিরাম ডেকে চলল। অবশেষে এই কালাসিন্ধুতলে আমি আবার ফিরে এলাম, হে কালাসিন্ধুর মানুষেরা আমার দাফন কিন্তু কালাসিন্ধুর বটবৃক্ষতলেই দিয়ো, সাথে কবরস্থ করবে আমার ঝুলিতে বহন করা জরিফুলের রক্তাক্ত পিরহান, কালাসিন্ধুর বটগাছের একটি ডালও সাথে দেবে। কারণ, কালাসিন্ধুর এই বটবৃক্ষ স্বাধীনতার স্মারক চিহ্ন…. ইতি তোমাদেরই মোজম মাস্টার।’
হুহু করে কাঁদতে থাকে কালাসিন্ধু গ্রমের মানুষ। কালাসিন্ধু বটবৃক্ষ সবার অজান্তে থরথর করে কেঁপে উঠল।

Print