তিনিই প্রথম তৈরি করেছিলেন বাংলা হরফ

February 21, 2018 at 1:51 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

ভাষা দিবস নিয়ে বাঙালির একটা আলাদা অহঙ্কার আছে। বাংলা বিশ্বের একমাত্র ভাষা যার জন্য প্রাণ দিয়েছেন বহু মানুষ। ভাষার জন্য আন্দোলন এবং তার জেরে পৃথক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। এইসব কিছুর জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস বাঙালির কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা ভাষা নিয়ে অনেক জানা বা অজানা তথ্যের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন পঞ্চানন কর্মকার। বাংলা ভাষা নিয়ে বিপ্লবের পিছনে তাঁর অবদান কিছু কম নয়। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে পঞ্চানন কর্মকার পদ্মা পারের নয়, গঙ্গা পারেরই বাসিন্দা ছিলেন।

বিংশ শতকের ৭০-এর দশকের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে কোনও যোগ নেই হুগলী জেলার ত্রিবেনীর বাসিন্দা পঞ্চানন কর্মকারের। কারণ ১৮০৪ সালেই তিনি পরলোকে গমন করেন।

তাহলে বাংলা ভাষার পিছনে তাঁর অবদান কী? এই প্রসঙ্গে জানার জন্য চলে যেতে হবে অষ্টাদশ শতকে। তখন পৃথক বাংলাদেশ গঠন তো অনেক দূরের কথা, লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গও হয়নি। ১৭৫৯ সালে ত্রিবেনীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন পঞ্চানন কর্মকার।

পঞ্চানন বাবুর পূর্বপুরুষ পেশায় ছিলেন কর্মকার বা লৌহজীবি। বেশ কয়েক পুরুষ আগে তাঁরা ছিলেন লিপিকার। তামার পাতে, অস্ত্রশস্ত্রে অলঙ্করণ বা নামাঙ্কনের কাজে তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। বংশানুক্রমে তিনিও পূর্বপুরুষদের এই শিল্পবৃত্তির গুনাগুণ। পূর্বপুরুষেরা প্রথমে ছিলেন হুগলী জেলার জিরাট বলাগড়ের অধিবাসী, পরে ত্রিবেণীতে গিয়ে বসবাস শুরু। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেন পঞ্চানন বাবু।

১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে চার্লস উইলকিন্স যখন হুগলিতে ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেডের লেখা ‘অ্যা গ্রামার অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ বইটি মুদ্রণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তখন পঞ্চাননবাবু তাঁর প্রযুক্তিজ্ঞান নিয়ে বাংলা হরফ প্রস্তুতের কাজে উইলকিন্সকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন।

এই পঞ্চানন কর্মকারই প্রথম নির্মাণ করেন বাংলা হরফ। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর তৈরি হরফে বাংলায় বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টর কেরিকৃত অনুবাদ ছাপা হয়। তিনিই বাংলা মুদ্রণাক্ষরের স্রষ্টা ও মুদ্রণশিল্পের প্রযুক্তিবিদ।

১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ উইলিয়াম কেরির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয় এবং সে বছরই তিনি কেরি সাহেবের উদ্যোগে শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে যোগদান করেন। একটি পুরোনো মেশিন নিয়ে এই প্রেসের কাজ শুরু হয়। কিন্তু পঞ্চাননবাবুর মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অল্প দিনের মধ্যে এটি এশিয়ার বৃহত্তম অক্ষর তৈরির কারখানা অর্থ্যাৎ টাইপ ফাউন্ড্রিতে পরিণত হয়। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর তৈরি হরফে বাংলায় বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টর কেরিকৃত অনুবাদ ছাপা হয়।

১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনিই প্রথম ভারতবর্ষে দেবনাগরী ভাষায় হরফ নির্মাণ করেন। কেরির সংস্কৃত ব্যাকরণ মুদ্রণের জন্য তিনি দেবনাগরী ভাষায় হরফ তৈরি করেন। পরে তিনি আরো ছোটো ও সুন্দর এক স্পষ্ট বাংলা হরফের নকশা তৈরি করেন। বাংলা মুদ্রণশিল্পে পঞ্চানন কর্মকারের তৈরি হরফের নকশা দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ছিল। বাংলা ভাষায় ছাপার ইতিহাসে প্রথম চলনসই বাংলা ও সংস্কৃত অক্ষরের ছাঁচ তৈরির অগ্রদূত হিসেবে পঞ্চানন কর্মকারের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পঞ্চাননবাবু তাঁর জামাতা মনোহর কর্মকারকে সযত্নে তাঁর সমস্ত জ্ঞান ও কলাকৌশল শিখিয়ে যান; মনোহর কর্মকার পরিশ্রম, সাধনা ও মেধা পাথেয় করে আরবি, ফারসি, গুরুমুখি, মারাঠি, তেলুগু, বর্মি, চীনা প্রভৃতি অন্তত চোদ্দোটি বিভিন্ন ভাষার হরফ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কলকাতা 24

Print