নাটোরে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানের পরেও থামছেনা ভেজাল গুড় তৈরী

January 14, 2018 at 5:17 pm

মাহবুব হোসেন:
নাটোরে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানের পরেও থামছেনা ভেজাল গুড় তৈরী। প্রতিনিয়ত ভেজাল এবং নোংরা পরিবেশে গুড় তৈরী করে বাজারজাত করছে গুড় উৎপাদনকারীরা। এতে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরছে সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি বড়াইগ্রামে একদিনে দুটি কারখানায় চারজনকে জরিমানা করার পর ভেজাল গুড় তৈরীকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী দেয় জেলা প্রশাসন। কিন্তু নানা কারণে অভিযান স্থবির হওয়ায় ভেজাল গুড় তৈরীকারীরা উৎপাদন করেই চলছে।

সূত্র জানায়, শীতে নাটোরের সাতটি উপজেলার সব কয়টি জায়গায় কমবেশি গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে। এরমধ্যে ,বাগাতিপাড়া, লালপুর, নলডাঙ্গা, বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর সবচেয়ে বেশি গুড় উৎপাদন হয়। শীতের মৌসুম পড়ার সাথে সাথে ভেজাল গুড় তৈরীতে মহোৎসবের মতো মেতে উঠে উৎপাদনকারীরা।

সূত্র আরো জানায়, উপজেলা প্রশসানকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর সদরের চাঁচকৈড় বাজারে গুড় উৎপাদনকারী অন্তত দশটি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় নোংরা পরিবেশে ভেজাল গুড় তৈরি করে বাজারে সরবরাহ করে আসছে উৎপাদনকারীরা।

সরেজমিনে চাঁচকৈড়ের গুড় উৎপাদনকারী কয়েকটি কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বাজার থেকে কিনে আনা নিন্মমানের গুড়গুলো ময়লাযুক্ত মেঝেতে নোংরা স্যান্ডেল পায়ে শ্রমিকরা গুড়ো করছেন। পাশেই প্রকাশ্যে রাখা হয়েছে চিনির বস্তা। দিনভর হাইড্রোজ আর কেমিকেল মিশিয়ে ভেজাল গুড় তৈরি করা হচ্ছে। আর এসব করছে স্থানীয় বাদশা, মুক্তার, আজিজ সোনার নামের তিনজন ব্যক্তি।


আরও পড়ুন: বড়াইগ্রামে তিনটি ভেজাল গুড় কারখানায় অভিযান: ৪ জনের জরিমানা(ভিডিও)


নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি সিল্কসিটি নিউজকে জানান, এলাকার অন্তত ১০জন অসাধু ব্যবসায়ী কারখানা খুলে হাজার হাজার মন ভেজাল গুড় তৈরি করছেন। তারা বাজার থেকে কমদামে নিন্মমানের ঝোলা ও নরম গুড় কিনে, গলিয়ে তাতে চিনি, রং, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকারি, পাথরচুন ও বিশেষ গাছের ছাল গুড়া দিয়ে গুড় তৈরি করছেন। সেই গুড় স্থানীয় হাট-বাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ট্রাক ভরে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা।

চাঁচকৈড় হাটে গুড় বিক্রি করতে আসা জরিপ আলী, শরীফ উদ্দিন ও শাজাহান আলী জানান, উৎপাদন খরচ বাদে বাড়তি লাভের আশায় খেজুর গুড়ের সাথে চিনি মিশিয়ে উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন তারা। তাছাড়া দিন বদলের সাথে বাড়ছে চাহিদা। তাছাড়া আশঙ্খাজনকহারে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কমছে রসের উৎপাদনও। মজুরি, জ্বালানি খরচ বাড়ায় ভেজালের প্রবণতাও বেড়েছে।

উপজেলার গুড়ের বড় মোকাম চাঁচকৈড়ে মানভেদে প্রতি কেজি খেজুর গুড় ৮০-৯০ টাকা ও ঝোলাগুড় ৬০টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ের মৌসুমি গুড় উৎপাদনকারিরা এসব গুড় বিক্রি করছেন। গুড় উৎপাদনকারিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কার্ত্তিক মাসের মধ্যভাগ থেকে চৈত্রমাসের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে চলনবিল অঞ্চলের নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, লালপুর, পাবনার চাটমোহর উপজেলায় বিকল্প আয়ের পথ হিসেবে খেজুর গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে।

উপজেলার চাঁচকৈড় হাটে গুড় বিক্রি করতে আসা প্রান্তিক গুড় উৎপাদনকারি রওশন আলী, খবির প্রামানিক ও কোরবান আলী জানালেন, তারা প্রতিটি গাছের জন্য মালিককে মৌসুম ভিত্তিক ২০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে থাকেন। মজুরি, জ্বালানি খরচ করে উৎপাদন খরচ ওঠেনা। খাঁটি গুড়ের উৎপাদন খরচ পড়ে গড়ে ১০০ টাকা। কিন্তু বাজারে এত দামে বিক্রি করা যায়না। তাই গুড়ের চাহিদা ও উৎপাদন খরচ পুষিয়ে নিতে প্রতি ১০ লিটার রসে দুই কেজি চিনি মেশান তাঁরা। গুড়ের রং ফর্সা ও শক্ত করতে চিনি মেশাতে হয়। চিনি মেশানো এই গুড়ে প্রকৃত স্বাদ-গন্ধ থাকেনা। পিঠা-পায়েসে উপযোগীতাও থাকেনা। তবে চিনিমুক্ত গুড়ে রং হয় কালো। তাতে প্রকৃত স্বাদ-গন্ধ অটুট থাকে। এই গুড় প্রতিকেজি ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।


আরও পড়ুন: লালপুরে চারটি ভেজাল গুড় তৈরী কারখানার মালিককে জরিমানা


এসব গুড় উৎপাদনকারী ও বিক্রেতাদের ভাষ্যমতে, প্রতি ৮লিটার খেজুর রসে ১কেজি গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে। প্রতি কেজি গুড় উৎপানে খরচ হয় ( জ্বালানি, মজুরিসহ) ৭০ টাকা। পক্ষান্তরে ১০ কেজি রসের সাথে ২কেজি চিনি মেশালে গুড় বেড়ে হয় দ্বিগুণ হয়। ৫ কেজি গুড়ের গড়দাম ৮০টাকা কেজি হলে ৪০০ টাকা হয়। সেক্ষেত্রে ২ কেজি চিনিতে চার কেজি বেশি গুড় উৎপাদন হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম ৬০ টাকা। ভেজাল গুড় তৈরি করে বাড়তি মুনাফা হচ্ছে।

ঢাকা থেকে আসা পাইকার হানিফ আলী ও সিরাজগঞ্জের উল্লাহপাড়া থেকে আসা আসমত ব্যাপারী জানালেন, খেজুর গুড়ের সেই ঐতিহ্য আর নেই। প্রান্তিক পর্যায়ের মৌসুমি গুড় উৎপাদনকারি ও মহাজন সকলেই ভেজাল গুড় তৈরি করছেন। গুড়ের রং ফর্সা ও শক্ত করতে তারা যথেচ্ছা ভাবে চিনির সাথে ক্ষতিকারক রাসায়নিক মিশিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন।

গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক রবিউল করিম জানান, খেজুর গুড়ে চিনি, রং,হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকারির মত ভেজাল মিশ্রণের কারনে খাদ্যনালীতে ক্যান্সার, কিডনী ড্যামেজ, লিভারে ক্ষতি হওয়ার সম্ভানা থাকে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনির হোসেন সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, খেজুর গুড়ে ভেজাল মেশানোর বিচ্ছিন্ন অভিযোগ তার কাছে রয়েছে। দ্রুত অভিযান চালানো হবে।
স/শ

Print