রাজশাহীতে মানব কঙ্কাল পাচারে সক্রিয় পাচারকারীরা: বিপাকে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা

December 30, 2017 at 9:52 am

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সারা দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে আগামি ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে ক্লাস। আর ক্লাস শুরু হওয়ার সঙ্গে এবার ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন হবে বই-খাতা-কালম, এপ্রোনসহ পড়া-শোনার জন্য আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র। কিন্তু এসবের পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রয়োজন দেখা দিকে প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি করে মানব কঙ্কাল। যেটি প্রয়োজন হবে শিক্ষার্থীদের এনাটমি বিষয়ে পড়া-শোনার জন্য।

এ বিষয়টি প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক। বিষয়টি প্রথম বর্ষ এবং দ্বিতীয় বর্ষেও রয়েছে। ফলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীই এই দুই বছরের পড়া-শোনার জন্যই একটি করে মানব কঙ্কাল সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে মানব কঙ্কাল সংরক্ষণের বৈধ কোনো উপায় না থাকায় এবং বৈধ বাজার না থাকায় এটি সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। সেই সুযোগে বছরের এই সময়ে ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে বিপুল পরিমাণ মানবব কঙ্কাল ঢুকছে দেশে। আর সেগুলো বিক্রি হচ্ছে উচ্চ দামে। ফলে কঙ্কাল কিনতে অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে এবং সময়মতো সংগ্রহ করতে না পেরে বিপাকে পড়ছেন নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে চরম ক্ষোভ।

মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের দাবি, সরকার মানব কঙ্কাল সংরক্ষণের বৈধ কোনো উপায় বের করুক। অথবা বিদেশ থেকে বৈধ উপায়নে এনে সেটি বাজারজাতের অনুমিত দিক। তাহলেই প্রতি বছর কঙ্কাল সংগ্রহ করতে গিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে আর বিপাকে পড়তে হবে না। বৈধ উপায়ে মানব কঙ্কাল পাওয়া গেলে একটা নির্ধারিত দামের মধ্যেই সেগুলো সংগ্রহ করতে পারবে শিক্ষার্থীরা। তখন পাচারকারীদের মুনাফা লুটের সুযোগ কমে আসবে।

রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান জানান, তিনি এবার পঁঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী। কিন্তু ৫ বছর আগে তিনি যখন মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, তখন একটি মানব কঙ্কাল সংগ্রহ করতে তাঁকেও হিমশিম খেতে হয়েছিল। শেষে ক্লাশ শুরু হয়ে যাওয়ার বেশকিছুদিন পরে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে একজন দালালের মাধ্যমে একটি কঙ্কাল সংগ্রহ করতে পারেন তিনি। এরপর নিয়মিত এনাটমি বিষয়ে ক্লাস করতে পারেন ওই শিক্ষার্থীরা; কিন্তু কঙ্কাল সংগ্রহ না হওয়ার আগে তাঁকে তাঁর এক বন্ধুর কক্ষে গিয়ে ওই বিষয়ে পড়া-শোনা করে আসতে হতো। এরপর সেই অনুযায়ী ক্লাসে গিয়ে শিক্ষকদের উত্তর দিতে পারতেন তিনি। যেদিন সহপাঠির কক্ষে যেতে পারতেন না, পরের দিনের ক্লাসেও উপস্থিত হতেন না মিজানুর রহমান।

এভাবে তাঁর প্রতি বছর নতুন শিক্ষার্থীরা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার পরেই কঙ্কালের অভাবে নানা ভোগান্তির মুখে পড়েন। আবার কঙ্কাল পেলেও অনেকেই উচ্চ দামের কারণে টাকার অভাবে প্রথম দিকে সংগ্রহ করতে পারেন না বলেও দাবি করেন ওই শিক্ষার্থী। পরে ধার-দেনা করে হয়তো বাধ্য হোন কঙ্কাল সংগ্রহ করতে।

রাজশাহীর একটি বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজে এ বছর ভর্তি হওয়া একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগামী ১০ জানুয়ারি থেকে আমাদের ক্লাস শুরু হবে। ওইদিন থেকেই একটি মানব কঙ্কালের প্রয়োজন হবে। কিন্তু আমি এখনো একটি কঙ্কাল সংগ্রহ করতে পারিনি টাকার অভাবে। এমনিতেই ভর্তির সময় ভর্তি ফি, শেসন ফিসহ বইপত্র কিনতে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর ওপর এখন ৫০-৬০ হাজার টাকার নিচে মানব কঙ্কাল নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এখনো কঙ্কাল সংগ্রহ করতে পারিনি।’

আরেক শিক্ষার্থী জাকিয়া বিনতে নূর বলেন, ‘একজন দালালের মাধ্যমে একটি কঙ্কালের ওয়ার্ডার দিয়ে সংগ্রহ করেছি। তবে এর জন্য দিতে হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। অথচ বৈধ উপায়ে পাওয়া গেলে এটি হয়তো বড় জোর ২০ হাজার টাকাতে পাওয়া যেত। কিন্তু দেশে কঙ্কালের বাজার অবৈধ হওয়ায় এটি কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে।’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে সারা দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে প্রায় সাড়ে নয় হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের মতো এবং বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ভর্তি হচ্ছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজারের মতো। বিপুল পরিমাণ এই শিক্ষার্থীদের প্রতি বছরই একটি করে কঙ্কাল সংগ্রহ করতে হচ্ছে ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে আসা।

রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি বিভাগের শিক্ষক মহিবুল হাসান জানান, তাঁর দুই ছেলে-মেয়ে গত বছর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু তাঁকেও দুটি কঙ্কাল কিনতে হয়েছে ৬০ হাজার টাকা করে দামে। এভাবে মেডিক্যালে পড়া প্রতিটি শিক্ষার্থীকেই অবৈধ উপায়ে আসা কঙ্কাল উচ্চ দামে কিনতে হচ্ছে গোপনে। তারপরেও সেটি কিনতে হচ্ছে গোপনে। কিন্তু মেডিক্যাল পড়া-শোনা তো আর গোপন পদ্ধতিতে হয় না। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য মানব কঙ্কাল একটি প্রয়োজনীয় বিষয়।’

ওই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘সরকার মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে দেশেই কঙ্কাল সংরক্ষণ এবং বাজারজাতের বৈধ ব্যবস্থা করতে পারে। তবে মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে এটি প্রায় অসম্ভব। এর জন্য বিদেশ থেকে যেসব কঙ্কাল চোরাই পথে আসছে, সেগুলো আসার জন্য বৈধতা দিতে হবে। তাহলেই কঙ্কাল নিয়ে আর জটিলতা থাকবে না। শিক্ষার্থীরা একটা নির্দিষ্ট দামের মধ্যেই এটিকে বৈধ উপায়ে সংগ্রহ করতে পারবে। এতে করে তাদের আর হয়রানির মধ্যেও পড়তে হবে না। আবার কঙ্কালের অভাবে পড়া-শোনারও বিঘœ ঘটবে না।’

রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাপারস্কপি বিভাগের আরেক শিক্ষক আনম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কঙ্কাল সংরক্ষণ ও বাজারজাতের জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। আবার শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে মৃত্যুর পরে দেহ দানের জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। তাছাড়াও বিদেশ থেকে বৈধ উপায়ে কঙ্কাল আমদানির অনুমতি দিয়ে শিক্ষার্থীদের হয়রানি থেকে রক্ষা করা যেতে পারে। আর এসব ব্যবস্থা না নিলে দিনের পর দিন কঙ্কাল নিয়ে এমন অব্যবস্থাপনা চলতেই থাকবে।

অপরদিকে রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা ছয়ফুল ইসলাম জানান, গত রবিবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নয়টি মানবব কঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত শুকুর আলী চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে।

শুকুর আলী জানান, রাজশাহীতে কঙ্কাল পাচারকারী দলের অন্যতম সদস্য হলেন পিয়ারুল নামের এক ব্যক্তি। তার হয়েই ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা কঙ্কালগুলো শুকুর আলী তাঁর বাড়িতে মজুদ করে রাখেন। ওই কঙ্কালগুলো ভারত থেকে ৪-৫ হাজার টাকা দাম দিয়ে কিনে নিয়ে এসে রাজশাহীসহ দেশের মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের কাছে ৫০-৬০ হাজার টাকা দামে বিক্রি করা হয়।

এই কঙ্কালগুলো কয়েক হাত ঘুরে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের হাতে গিয়ে পড়ে বলে মাঝে দামও কয়েক গুন বেড়ে যায়। তবে পাইকারী বাজারে প্রতিটি কঙ্কাল বিক্রি হচ্ছে এখন ৩০-৩৫ হাজার টাকা দামে।

স/আর

Print