গোদাগাড়ীর মধু সুমনের সাফল্যের গল্প

December 30, 2017 at 9:38 am

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলার হাতনাবাদ গ্রামের বিলের চারিদিকে যেন হলুদের সমারোহ। গোটা বিলের যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই সরিষা ক্ষেত। সেই সরিষার হলুদ ফুলে ভরে হলুদ হয়ে উঠেছে বিলটি। আশে-পাশের বিলগুলোরও প্রায় একই অবস্থা। তবে হাতনাবাদ বিলের সরিষা ক্ষেতের মাঝে লুকিয়ে আছে আরেকটি সাফল্যের গল্প। সেই গল্পটি হলো একই এলাকার সুমন নামের এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। এই সুমন একসময় ছিলেন কাঠমিস্ত্রী। কিন্তু এখন তিনি একজন সফল ব্যক্তি। সরিষার মাঝে মৌমাছির সাহায্যে মধুচাষ করেই সুমন এখন সাবলম্বি। মধুচাষ করেই নিজের বাড়িটিও পাকা করেছেন তিনি। এবারও আশা করছেন আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার মধু বিক্রির।

মধুচাষি সুমন জানান, গত ২০১৩ সাল থেকেই তিনি সরিষা ক্ষেতে মধুচাষ করছেন। এর আগে বিভিন্ন এলাকা থেকে মধুচাষিরা এসে তাঁর এলাকার সরিষা ক্ষেত থেকে মধুচাষ করে নিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। সেই চাষিদের দেখেই একসময় নিজেও সিদ্ধান্ত নয়, এরপর থেকে তিনিও এ পেশায় নেমে পড়বেন। তারপর থেকেই তিনি নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এবং অন্য চাষিদের নিকট থেকে মধুচাষের উপায় জেনে েেম পড়েন মধুচাষে।
রাজশাহীর বেঙ্গল হানি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জার্জিস আলীর কাছ থেকেও মধুচাষের উপায় জেনে নেন সুমন।

তিনি আরও জানান, ২০১২ সালে তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পরে পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে তাঁর সকল দায়িত্ব পড়ে। বাবার পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেবে বাড়ির ভিটাসহ ৩-৪ বিঘা জমি পান তিনি। কিন্তু ছোট দুই ভাই ও এক বোনের পড়া-শোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল সুমনকে। শেষে একটি এনজিও থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সরিষা ক্ষেতে মধুচাষ শুরু করেন সুমন।

  • সুমন জানান, ইতালিয়ান এপিল মোল ফ্লেরা নামে মৌমাছি চাষের জন্য ৩৫ টি বক্স তৈরি করে রাজশাহী বিসিকের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট থেকে মৌমাছি ও চাক সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর ২০১৩ সাল থেকে নেমে পড়েন মধুচাষে। প্রথম বছর ৯টি ফ্রেমসহ মৌমাছি কিনে ৩টি বক্সের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর ৯ ফ্রেম মৌমাছি থেকে ১৫টি ফ্রেমে রূপান্তর করেন তিনি। এর জন্য রানী মৌমাছির মাধ্যমে বাচ্চা ফুটানো হয়। পরে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে তাঁর ফ্রেমের সংখ্যা এবং মধুচাষের পরিমাণ।

সুমন জানান, এ বছর তিনি ১৫টি ফ্রেমের মাধ্যমে মধুচাষ করছেন হাতনাবাদ বিলের মধ্যে। প্রতিটি ফ্রেমের মৌমাছি সংরক্ষণের জন্য তার বছরে খরচ হয় গড়ে ১৫ হাজার টাকা করে। শুধু শীতকালে মধু সংগ্রহের পর সারা বছর লালন পালন করতে হয়। মধু সংগ্রহের পর মৌমাছি গুলোকে চিনি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়াতে হয়।

dav

কিন্তু তার পরেও সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রতি বক্স থেকে অন্তত ২০ হাজার টাকা লাভ হয় তাঁর। প্রতি বছর সরিষা ক্ষেতে নভেম্বর থেকে জানুয়ারী মাস পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করা যায়। এরপর ফেব্রুয়ারী ও মার্চ মাসে লিচু বাগান থেকে মধু সংগ্রহ করা যায়। একটি বক্স থেকে গড়ে অন্তত ২৫ কেজি মধু পাওয়া যা। বক্স লো সরিষা জমির ধারে রেখে ২ দিন পর পর খুলে পরিচর্যা করতে হয় এবং ১০ দিন পর পর মধু সংগ্রহ করা যায়।
প্রতি কেজি মধুর বর্তমান বাজার মূল্য ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন তিনি।

সুমন আরও জানান, এবার হাতনাবাদ বিলে ২০০-৩০০ বিঘা জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। প্রতি বছর এই হারে সরিষা চাষ হয়। ফলে মধুচাষ করতে তার কোনো বেগ পেতে হয় না। আর সেই মধুচাষ দিয়ে তিনি এখন দিব্যি সংসার চালাতে পারছেন। বছর শেষে কিছু টাকা জমাও করতে পারছেন

গোদাগাড়ী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কৃষি সম্প্রসারণ মরিয়ম আহমেদ জানান, সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি থাকলে স্বাভাবিক চাষের চেয়ে ৩০-৩৫ শতাংশ সরিষা ফলন বাড়ে। কারণ সরিষা ফুলে মৌমাছি বসে পরাগায়ণ ঘটায়। এতে করে সরিষার দানা ভালো হয় এবং ফলন বৃদ্ধি পায়। যে সরিষার ক্ষেতে মৌমাছি থাকে না, সেখানে সরিষার ফলন কম হয়।

  • তিনি আরও জানান, সরিষার ক্ষেতে মধুর খামার গড়ে তোলা হলে খরচ কম হয়। শুধু মৌমাছির জন্য ফ্রেম করে সেগুলো সরিষা জমিতে বসে দিতে পারলেই হলো। মৌমাছি মধু উৎপাদন করে দিবে। মাঝে মাঝে শুধু পরিচর্যা করতে হয়। আর বছরজুড়ে মৌমাছিগুলোকে লালন-পালন করতে হয়।

ওই কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, চলতি বছর গোদাগাড়ী উপজেলায় ৬ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। গত বছর ৫ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছিল। সঠিক পরিচর্যা করলে একটি ইতালিয়ান এপিল মোল ফ্লেরা বা দেশি ভাষায় হুল বিহীন মৌমাছি বছরে ৩০০-৪০০ গ্রাম মধু উৎপাদন করে বলেও জানান তিনি।

স/আর

Print