‘ভালোবাসা দিবি কি না বল’

December 26, 2017 at 12:11 pm

তাহলে ছুরি, পিস্তল, চাপাতি বা ভয়ংকর অ্যাসিড কিসের প্রতীক? নারীকে প্রেম নিবেদনের সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক? এগুলো হত্যা ও ধ্বংসের অস্ত্র, প্রেম না পাওয়ার প্রতিশোধের অস্ত্র। ‘প্রতিশোধ’ যদি হয়, তবে কিসের প্রতিশোধ? একজন প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দিল না, কিংবা প্রেম টিকল না; এর মধ্যে অন্যায় কোথায়? কাউকে কারও ভালো লাগতেই হবে? কিংবা আমি যা-ই করি, সে চিরকাল আমাকে পরমপ্রিয় করে রাখবে? নারীর কি মন নেই, নিজস্ব চাওয়া-পাওয়া নেই? পুরুষের বাসনার প্রতি হ্যাঁ হ্যাঁ করে যাওয়াই কি নারীর নিয়তি হতে পারে? তাহলে প্রেম না টিকলে বা প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দিলে প্রতিশোধের প্রশ্ন আসে কী করে?

কিন্তু যে বদরুল খাদিজাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছিল কিংবা অতি সম্প্রতি সুনামগঞ্জের ইয়াহিয়া সর্দার নামের যুবক হুমায়রা আক্তার নামের ১৬ বছরের স্কুলছাত্রীকে ছুরি মেরে হত্যা করল, তারা একে প্রতিশোধই ভেবেছে। প্রত্যাখ্যানকে অন্যায় বা অপরাধ বা প্রতারণা ভাবার এই মনটাকে বোঝা দরকার। যার ওপর তারা প্রতিশোধ নিতে চাইল তার প্রতি এই মনে কোনো ভালোবাসা থাকলে তো তারা ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দিত না, হত্যা করত না। একটি মেয়ে ‘না’ বলামাত্রই যদি ‘খারাপ’ হয়ে যায়, ‘ঘৃণিত’ হয়ে যায়, তার অর্থ তারা ওই মেয়েটির ভেতরের যে চাওয়া-পাওয়ার দাবিদার মন, তাকে কখনোই ভালোবাসেনি। তারা ভালোবেসেছে তার বাইরের দিকটাকে, যাকে তারা বলে ‘রূপ’। এই রূপ তার কাছে কোনো পণ্য বা সম্পত্তির মতো, যার দখল পাওয়াকেই সে প্রেমের সফলতা বলে ভেবেছে। প্রেমের সঙ্গে দখল, জয়, অর্জন এসব কোনো কোনো পুরুষ মনের বর্বর ধারণা—নারী তার কাছে কেবলই ভোগ বা আনন্দের সামগ্রী, যাকে দখল করতে হয়, বশে রাখতে হয়। নারী তার কাছে ভোগের কাঁচামাল। ভোগের কারখানায় কাঁচামালের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো দাম নেই। তাই আগ্রাসী ভোগের হিংসার আগ্রাসন ঘটে ছুরি-বন্দুক-চাপাতি বা অ্যাসিডের আক্রমণে।

 অনেক শিশু যে খেলনাটি তার বেশি পছন্দ, যা পাওয়ার জন্য সে কান্না করে, জেদ ধরে, এমনকি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে, সেই খেলনাটিই পাওয়ার পর ঠিকমতো কাজ না করলে তারা রাগের মাথায় ভেঙে ফেলে। কিন্তু আগ্রাসী প্রেমিক তো শিশু নয়, আর নারীও নয় তার খেলার খেলনা যে চালাতে না পারলে তাকে ভেঙে ফেলতে হবে। এই মনে কোনো প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই এবং ছিলও না। প্রেম একটা সম্পর্ক, সেই সম্পর্কে কোনো জোর চলে না। দুটি মন যেখানে সত্যিই এক না হলেও এক তালে বাজতে হয়। তাহলে জোর করে তারা যা পেতে চায়, সেটা প্রেম নয়, সেটা স্বেচ্ছাচারী ভোগদখলের বিষাক্ত বাসনা। নারীর অবশ্যই অধিকার আছে, এমন বিষাক্ত আকাঙ্ক্ষাকে ‘না’ বলার। সুতরাং প্রেমে ব্যর্থ হয়ে হত্যা বা আক্রমণ, এটা বলার কোনো জায়গাই নেই। প্রেমই যেখানে ছিল না, সেখানে ব্যর্থতার প্রশ্নই আসে না।

এভাবে ‘অনন্ত প্রেমে’র যুগ থেকে আমরা পিছলে চলে এসেছি ‘ভালোবাসা দিবি কি না বল’-এর যুগে। দুটিই দুই যুগের দুটি প্রেমের সিনেমার নাম। জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অনেক সময় জনমনস্তত্ত্বের দেয়াললিখন। যে প্রেম চূড়ান্ত বিচ্ছেদেও ফুরায় না, সেই অনন্ত প্রেমের সঙ্গে ‘ভালোবাসা দিবি কি না বল’-এর মনের দুস্তর ব্যবধান।

 ‘কেমনে বোঝাব সই রে, সে যে কত ভালো’—এই গান রোমান্টিক মনের গান। একটা সময় ছিল যখন ভালোবাসার মানুষের জন্য একজন হয়তো জীবনটাই দিয়ে দিত। এখন যারা প্রেমের নামে দখলকে না বলার দাম জীবন দিয়ে শুধছে, তারা প্রেমঘটিত ঘটনার নয়, আগ্রাসী পুরুষ মনোবৃত্তির নির্মম ও করুণ শিকার।

মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, মনের ঘরে প্রেম ও ঘৃণা খুব কাছাকাছি বসবাস করে। প্রেমবোধ খুব সহজেই বিগড়ে গিয়ে ঘৃণায় বদলে যেতে পারে। তাই মনটাকেও শেখাতে হয় প্রেম কী। অপ্রেমের যেকোনো আচরণ যদি কারও ক্ষতি করে, তবে তার প্রেমের জ্বালার দোহাই পেড়ে লাভ নেই, সে অপরের তো বটেই নিজের জন্যও ক্ষতিকারক। এমন লোককে নিরস্ত রাখা, শাস্তি দেওয়া, বর্জন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু তার আগে হে সম্ভাব্য প্রেম প্রস্তাবক, প্রেম পূর্ণ হয় প্রেমেই এবং সুখের পাশাপাশি দুঃখ-যন্ত্রণাও প্রেমেরই অংশ, যেমন বৃষ্টি ও বিদ্যুতের উৎসও একই। হৃদয় ছাড়া প্রেমের আর কোনো অস্ত্র বা উপায় থাকতে পারে না।

 

 

প্রথম আলো

Print