‘মহাভারত’-এর পাণ্ডবদের বংশধর এই মুসলিম সম্প্রদায়!

December 12, 2017 at 6:33 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

‘মহাভারত’ পড়তে বসলে দেখা যায়, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরে কৌরব ও পাণ্ডবকুল শূন্য হয়ে যায়। পঞ্চপাণ্ডবের সন্তানরাও এই যুদ্ধে নিহত হন। কেবল বেঁচে যান অভিমন্যুর স্ত্রী উত্তরার গর্ভস্থ সন্তান পরীক্ষিৎ। তিনিই পরে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসেন।

কিন্তু তার পরে প্রশ্ন থেকে যায়, কুরুকুলের কী হল? খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারতে ষোড়শ মহাজনপদের উত্থানের কালে ‘কুরু’কুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘মহাভারত’-এর ঐতিহাসিক সত্যতা বহুকাল আগেই নিরূপিত। হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ থেকে ডি ডি কোশাম্বী পর্যন্ত মহাভারতের ঐতিহাসিকতা নিয়ে গবেষণা করে গিয়েছেন। ফলে এই প্রশ্ন ভারতীয় মননে দেখা দেওয়াটাই সংগত যে, চান্দ্র বংশের কী হল।

‘শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতা’-য় পাণ্ডবদের যে বংশ তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা এই প্রকার—

অভিমন্যু-পরীক্ষিৎ-জন্মেজয়-শতানিক-সহস্রানিক-অশ্বমেধজ-অসীমকৃষ্ণ-নেমিচক্র (এঁর আমলেই বন্যার কারণে রাজধানী হস্তিনাপুর থেকে কৌশাম্বীতে স্থানান্তরিত হয়।)-চিত্ররথ-শুচিরথ-বৃষ্টিমান-সুষেণ-সুনীত-নীচাক্ষু-সুখীনল-পরিপ্লব-সুনয়-মেধাবী-নৃপাঞ্জয়-দুর্ব-তিমি-বৃহদ্রথ-সুদাস-শতানিক-দুর্দমন-মহীনর-দণ্ডপাণি-নিমি-ক্ষেমক।

ক্ষেমক এই বংশের ত্রয়োদশ পুরুষ। তাঁর পরে আর কারোর নাম শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতায় পাওয়া যায় না। অনুমান করা যায়, এঁর সময়েই পাণ্ডবদের রাজধানী কারোর দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং তাঁরা ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

তার পরে কেটে গিয়েছে বেশ কিছু হাজার বছর। বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগৎ ক্রমে লীন হয়েছে সুলতানি-মুঘল জমানায়। বদলেছে এদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র। কুরু বংশের সন্তানরা এর মধ্যেই কিন্তু টিকে ছিলেন। যুগের বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও বদলেছেন। এমনকী বদলে ফেলেছেন ধর্মও। এমনই এক দাবি পোষণ করে হরিয়ানা-উত্তর প্রদেশ-রাজস্থানের মেওয়াট অঞ্চলে বাসরত এক বিশেষ মুসলমান সম্প্রদায়।

মেওয়াটি বা সংক্ষেপে ‘মেও’ মুসলমানরা এই সেদিনও নিজেদের মধ্যে পাণ্ডব-গৌরব কীর্তন করতেন, এমনটাই সাক্ষ্য দিচ্ছে বিভিন্ন সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম। এই গানে অর্জুনের মতো মহাভারতীয় বীরদের কথা ঘুরে ফিরে আসে। এই সব অঞ্চলের লোকবিশ্বাস— পাণ্ডবরা রাজধানী থেকে উচ্ছিন্ন হলে তাঁদের বংশধররা এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। এবং কালক্রমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। অনুমান করা হয় এই ধর্মান্তরণ ঘটেছিল ১২ থেকে ১৭ শতকের মধ্যে।

ধর্মান্তরণের পরেও মেও মুসলমানদের একাংশ বিশ্বাস করতে থাকেন যে তাঁরা ক্ষত্রিয় উৎসের। তাঁদের মধ্যে আজও রাম খান-জাতীয় নাম দেখা যায়। স্বাধীনতার আগেও মেওয়াটি সম্প্রদায় হোলি ও দেওয়ালি পালন করত। সেই সঙ্গে আবার দুই ইদেও অংশ নিত। আজও এরা হিন্দুদের মতো স্বগোত্রে বিয়ে করে না। তাঁরা যেমন নিজেদের পাণ্ডব-বংশজাত বলে বর্ণনা করেন, তেমনই তাঁদের দাবি— পবিত্র কোরান-এ আল্লাহ যে সব নামহীন প্রেরিত পুরুষের কথা বলেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শ্রীকৃষ্ণ এবং রামচন্দ্র।

এই সমন্বয়ের দিন অবশ্য ১৯৯২-এর সাম্প্রয়িক অসন্তোষের কাল থেকে কমতে শুরু করে। গোঁড়া মুসলমানরা যেমন মেওদের বিরোধিতা করে, তেমনই গোঁড়া হিন্দুরাও তাঁদের প্রতি সদয় নন। এক সময়ে এঁরা মুঘল শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। গোধনকে রক্ষা করতে তাঁরা অসংখ্য বার হাঙ্গামায় জড়িয়েছেন। কিন্তু আজ এই বিভ্রান্ত ধর্ম-রাজনৈতিকতার গর্ভে এঁদের স্থান কেথায়, তা নিয়ে বিরাট প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সম্প্রতি রাজস্থানের আলওয়ারে পহেলু খান নামে এক মেও মুসলমান ব্যক্তিকে গোরক্ষকরা হত্যা করে বলে অভিযোগ। অথচ মনে রাখা দরকার, মেওরা কিন্তু নিজেদের ‘গোসেবক’ হিসেবেই পরিচয় দিয়ে আসছেন আবহমান কাল।

Print