বাহাদুর শাহ পার্ক নাকি পার্কিং স্পট!

November 21, 2017 at 5:17 pm

মাহাবুব হোসেন:
পার্কের ভিতর সারি সারি মোটর সাইকেল। কিছু কিছু স্থানে রয়েছে সাইকেল। অবৈধ ভাবে গড়ে উঠা একপাশ দখল করে চলছে চায়ের রমরমা ব্যবসা। যে যার মতো চালিয়ে যাচ্ছেন ধুমপান সেবন। পার্কের ভিতর একের পর এক ঢুকছে মোটরসাইকেল। মোটরসাইকেলের কারনে তিল ধারনের ঠাই নেই পার্কটিতে। পায়ে হেটেও পার্কে প্রবেশ করা দুরহ ব্যাপার। প্রতিদিন সকালে পার্কে গেলেই এমন সব কর্মকা- চোখে পড়বে হরহামেশেই। দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এটি বাহাদুর শাহ পার্ক, না মোটরসাইকেল পার্কি। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সরেজমিনে গিয়ে এমন সব দৃশ্য চোখে পড়ে। সম্প্রতি বাহাদুর শাহ পার্কে নাটোর পৌরসভার মার্কেট নির্মাণ করা নিয়ে আলোচনায় আসে পার্কটি।

স্থানীয়রা জানান, ১৯৫৭ সালে শহরবাসীর চিত্ত বিনোদনের জন্য বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব বাহদুর শাহ্ এর নামে শহরের পিলখানা রোডে একটি পার্ক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের দখল প্রক্রিয়া আর ২০০১ সালের দিকে তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ওই পার্কের কিছু অংশে কয়েকটি টয়লেট ও কয়েকটি দোকান বিশিষ্ট একটি তিনতলা মার্কেট তৈরি করে পার্কের পরিবেশ নষ্টের কাজ শুরু করেন। এরপর থেকেই পার্কটি চিত্ত বিনোদনের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়ে। বর্তমান মেয়র উমা চৌধুরী জলি বাহাদুর শাহ পার্কের ভিতরে ৯৩ লাখ টাকা ব্যায়ে ২১ টি দোকান বিশিষ্ট একটি বিপণী বিতান নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে ১৬ অক্টোবর ই-টেন্ডার আহবান করেন। এরপর থেকেই আলোচনায় আসে পার্কটি নিয়ে।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি নাটোর জেলা শাখার সভাপতি নিরেন্দ্র নাথ কর্মকার সিল্কসিটি নিউজকে জানান, এই রকম একটা কমার্শিয়াল জায়গায় পার্কের পরিবর্তে মার্কেট ভবন নির্মাণ অতীব জরুরী। এই পার্ক টি মূলত মাদক সেবীদের আখড়া হওয়ায় জুয়েলারী দোকানগুলোতে ডাকাতিসহ নানা অপরাধ সংঘটনের আতঙ্কে থেকে ব্যবসা করতে হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের। একই কারনে সাধারন ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের কাছে জায়গাটি মোটেও নিরাপাদ নয়। আমরা মঙ্গলবার রাতে নিচাবাজারস্থ পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে এখানকার নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সাথে মতবিনিময় করেছি বলে জানান তিনি।


নাটোর পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানায়, তৎকালীন নাটোর পৌরসভার চেয়ারম্যান এ্যাড. কামরুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহনের পর বাহাদুর শাহ পার্কটিকে মার্কেট নির্মাণ করে। সে সময় পার্কেল জায়গায় মার্কেঠ নির্মান করা হলেও কেউ প্রতিবাদ করেনি। বাহাদুর শাহ পার্ক টি মূলত স্বর্ণকার পট্টির পেটের ভেতরে হওয়ায় এটা পার্ক নয়, মোটর সাইকেল পার্কিংয়ের জন্য বেশি ব্যবহার হচ্ছে। পার্কের মধ্যে রয়েছে ১৪টি পান, সিগারেট ও চায়ের দোকান। আর পার্কের পুরোটা জায়গা জুড়ে দেখা যায় সারি সারি মোটর সাইকেল। এছাড়া স্বর্ণপট্টির বিষাক্ত এসিডের ব্যবহার এখানকার পরিবেশ সাধারণ মানুষের জন্য ক্ষতিকর।

নাটোর পৌরসভা কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, প্রায় ৯শতক জায়গায় প্রতিষ্ঠিত এই পার্কের প্রায় আড়াই শতকের মত জায়গা দখল হয়ে গেছে। বাকী প্রায় ৬শতক জায়গায় প্রায় ৯৩ লক্ষ টাকায় বানিজ্যিক ভবন নির্মানের প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করে নাটোর পৌরসভা। কিন্তু এখানে পৌরসভা কর্তৃক একটি বানিজ্যিক ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু না হতেই পার্কের স্থলে বানিজ্যিক ভবন নির্মানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। শহরের নজরুল মঞ্চের সভাপতি গোলাম কামরান, সাতারু আজিজুর রহমান খান চৌধুরী, সুজনের যুগ্ম সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মঙ্গলবার বিকালে নাটোর পৌর মেয়র ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। পার্কটিকে কেন ভাঙ্গতে হবে আগামী ১০দিনের মধ্যে নাটোর পৌরসভাকে কারণ দর্শাতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এনিয়ে সংবাদ পত্রে প্রতারণা শব্দটি ব্যবহার করে প্রকাশিত সংবাদের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন পৌরমেয়র উমা চৌধুরী জলি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকেই জানিয়েছেন, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই নেমে এই পার্কটি হয়ে ওঠে মাদকসেবীদের রমরমা আখড়া। বাইরের মাদকসেবী ছাড়াও এখানকার স্বর্ণ ব্যবসার সাথে জড়িত অনেকেই বিভিন্ন রকমের মাদক গ্রহণ করে থাকেন। এত ছোট জায়গাতে যেখানে মানুষ চলাচল, বসতেই পারেনা সেখানে এখানে পূর্ণাঙ্গ পার্ক তৈরী রীতমত দুঃসাধ্য। পার্কটি স্বাভাবিক ভাবেই একটি অনিরাপদ এলাকা হিসেবে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল। এছাড়া জায়গাটা সঠিক ব্যবহার না হওয়াসহ নানা কারনে জায়গাটি ঝুঁকিপূর্ণ। গত দুই বছরে এখানকার স্বর্ণের দোকানে ২টি বড় ধরনের ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরহাদ হোসেন সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, বাহাদুর শাহ পার্ক আগের মতো আর নেই। বর্তমানে পার্কটিতে মোটরসাইকেল পার্কিং হিসেবে ব্যবহার করছে স্বর্ণকার পট্টির ব্যবসায়ীরা। এই পট্টিতে স্বর্ণ কিনতে বা বানাতে এবং এখানকার কারিগড়রা পার্কের ভিতর মোটর সাইকেল রেখে চলে যায়।


তিনি আরো বলেন, সন্ধ্যা নামলে পার্কটি অনিরাপদ হয়ে যায়। মাদক সেবিদের আড্ডা বসে প্রতিনিয়ত। যার কারনে অনিরাপদ হয়ে উঠেছে স্বর্ণকার পট্টি। তবে পৌরসভা রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য পার্কের জায়গায় মার্কেট নির্মান করলে মাদক সেবিদের আড্ডা নষ্ট হয়ে যাবে। নিরাপদ হয়ে উঠবে স্বর্ণকার পট্টি।

এবিষয়ে নাটোর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, পৌরসভার সকলের গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাহাদুর শাহ পার্কটি বানিজ্যিক ভবন নির্মাণের আগে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। ই-টেন্ডারের মাধ্যমে টেন্ডার নির্মাণ কাজের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। যেখানে ১২জন বিডার ই-টেন্ডারে অংশ নেন। তিনি আরো বলেন, যারা পৌরসভার, সরকারের উন্নয়ন চোখে সহ্য করতে পারেনা তারাই এই কাজের বিরোধিতা করছে। এখানে বানিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হলে মাসে প্রায় ৩৫-৪০হাজার টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারবে পৌরকর্তৃপক্ষ। তাছাড়া, এখানে সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশ সৃষ্টি পৌরসভার দায়িত্বে মধ্যেও পড়ে।

এ ব্যাপার পৌরসভার মেয়র উমা চৌধুরী জলি এ প্রতিবেদককে বলেন, পৌরবাসীর সাথে তিনিও চিত্ত বিনোদণের পক্ষে, তবে বাহাদুর শাহ্ পার্কের নয় শতক জমির মধ্যে তিন শতকের ওপরে সাবেক পৌর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম তার সময়ে টয়লেট, মার্কেট আর কয়েকটি চায়ের দোকান করে দেয়ায় সেখানে আর পার্কের কোন পরিবেশই নেই। এখন সেখানে ফাঁকা জায়গাটি মটর সাইকেল রাখার ষ্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে। আর দিনে রাতে চলে মদ-গাঁজার রমরমা আড্ডা। তিনি বাহদুর শাহ্ এর নাম রেখেই মার্কেট তৈরী করে দিতে পারলে পরিবেশটি উন্নত হবে এবং পৌরসভার কিছু বাড়তি রাজস্ব আয় বাড়বে যা দিয়ে পৌরবাসীর অন্য কোন সেবা দেয়া যাবে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন এবং নাটোর পৌরসভার উন্নয়ন কিছু স্বার্থনেষী মানুষ সহ্য করতে পারছেনা। যার কারনে পৌরসভার উন্নয়নে বাধা প্রদান করছে।

স/শ

Print