ইলিশ ধরতে আজ থেকে বাধা নেই জেলেদের

October 23, 2017 at 9:17 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

ইলিশ শিকারে সরকারঘোষিত নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হলো আজ সোমবার (২৩ অক্টোবর) রাত ১২টায়। এখন আর এ মাছ ধরতে নদীতে জাল ও নৌকা নিয়ে নামার ক্ষেত্রে বাধা নেই জেলেদের।

গতকাল রবিবার (২২ অক্টোবর) পর্যন্ত মোট ২২ দিনের জন্য দেশের ইলিশ অধ্যুষিত নদ-নদীতে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা ছিল সরকারের। মা ইলিশ সংরক্ষণ, মা ইলিশ রক্ষা ও স্বাচ্ছন্দে ইলিশের ডিম ছাড়ার সুযোগ করে দিতেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সোমবার এ নিষেধাজ্ঞার সময় অতিবাহিত হওয়ায় আবার শুরু হলো ইলিশ ধরার কার্যক্রম।

সরকারের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় আজ (সোমবার) থেকে কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, খুলনা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম -এই ২৭ জেলার জেলেরা নদ-নদীতে ইলিশ ধরতে পারবেন।

মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, দেশের নদ-নদীর সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ইলিশের প্রজননক্ষেত্র। এর মধ্যে চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার শাহের খালী থেকে হাইতকান্দি পয়েন্ট, ভোলার তজুমুদ্দিন উপজেলার উত্তর তজুমুদ্দিন থেকে পশ্চিম সৈয়দ আওলিয়া পয়েন্ট, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লতা চাপালি পয়েন্ট এবং কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থেকে গণ্ডামারা পয়েন্ট হলো ইলিশের প্রধান প্রজননক্ষেত্র।

ভোলা জেলার মনপুরা, ঢলচর, নোয়াখালী জেলার হাতিয়া কালিরচর ও মৌলভীরচরকে ইলিশের বিশেষ প্রজনন এলাকা বিবেচনা করা হয়। গত বছর ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল সরকার। চলতি বছর ১২ দিন এগিয়ে ১ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর কারণ সম্পর্কে সূত্র জানায়, আশ্বিনের পূর্ণিমার ওপর নির্ভর করে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ এবছর এগিয়ে আনা হয়।

সূত্র আরও জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন নদীতে ইলিশ ধরা পড়ে। তবে চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর হচ্ছে ইলিশ অধ্যুষিত জেলা। এ জেলাগুলোর আশপাশের নদীগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে তালা হয়েছে ইলিশের অভয়ারণ্য। সাগর থেকে ইলিশের ঝাঁক এসব জেলার আশপাশের নদীগুলোয় এসেই ডিম ছাড়ে। এর মধ্যে পদ্মাসহ চাঁদপুরের মেঘনা, ভোলার তেতুলিয়া, বরিশালের কীর্তনখোলা, পটুয়াখালীর পায়রা, আগুন মুখা, পিরোজপুরের বলেশ্বর এবং সন্ধ্যা নদীর মাছ সবচেয়ে সুস্বাদু।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১০ বছর আগেও দেশের মাত্র ২১টি উপজেলার নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। এখন দেশের ১২৫টি উপজেলার বিভিন্ন নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়।

মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইলিশ মাছ জাতীয় সম্পদ। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে, যার অর্থমূল্য আনুমানিক সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। জিডিপিতে ইলিশের অবদান এক দশমিক ১৫ শতাংশ। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ ইলিশের পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সংশ্লিষ্ট নানা কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাই ইলিশ রক্ষায় প্রধান প্রজনন মৌসুমে এবছর ১-২২ অক্টোবর পর্যন্ত এই ২২দিন দেশের সর্বত্র ইলিশ মাছ ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ করে সরকার।

ইলিশ রক্ষায় সবাইকে সরকারের এই আইন মানতে হবে বলে জানান মৎস্যমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক। তিনি জানান, জাটকা নিধন রোধ করতে পারলে এবছরও দেশে ইলিশের প্রাচুর্য থাকবে। তিনি বলেন, ‘৫-৭ বছর আগেও দাম বেশি হওয়ায় দেশের সাধারণ মানুষ ইলিশ মাছ খেতে পারত না। মন্ত্রণালয়ের সময় উপযোগী উদ্যোগের কারণে আজ দেশের সর্বত্র ইলিশ মাছের ছড়াছড়ি। ১৫-২০ বছরের মধ্যে এবারই ঢাকার বাজার ছাড়িয়ে শহর, গ্রামগঞ্জের অলি-গলিতে ইলিশ পাওয়া গেছে, যা গরিব মানুষরাও সাধ্য অনুযায়ী কিনে খেতে পেরেছে।’

মোহাম্মদ ছায়েদুল হক জানান, চন্দ্র-মাসের ভিত্তিতে প্রধান প্রজনন মৌসুম ধরে গত বছর আশ্বিন মাসের প্রথম চাঁদের পূর্ণিমার দিন এবং এর আগের তিন ও পরের ১১ দিনসহ মোট ১৫ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ ছিল। এবারও আশ্বিন মাসের প্রথম চাঁদের পূর্ণিমার দিন এবং এর আগের চার ও পরের ১৭ দিনসহ মোট ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা-ইলিশ সুরক্ষা ও মা-ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারায় ইলিশ উৎপাদনে ধারাবাহিক সফলতা এসেছে। পাশাপাশি সরকারের জাটকা নিধন কার্যক্রম, মা-ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম, ইলিশের অভয়াশ্রম চিহ্নিতকরণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ইত্যাদি সময়োপযোগী কর্মসূচি ইলিশের সংখ্যা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। মা-ইলিশ রক্ষায় ২০১১ সালে যেখানে এক হাজার ৪৪০টি অভিযান চালানো হয়েছিল, সেখানে ২০১৫ সালে চালানো হয় পাঁচ হাজার ২০৯টি অভিযান। তারা আরও জানিয়েছেন, একটি মা-ইলিশ দুই ফালি থেকে সর্বনিম্ন দেড় লাখ এবং সর্বোচ্চ ২৩ লাখ পর্যন্ত ডিম দেয়। ইলিশ কেবল আমাদের জাতীয় মাছই নয়, জাতীয় সম্পদও বটে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় পার হওয়ার পরও সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার সময় দেশের বিভিন্ন নদীতে মা ইলিশ ধরা পড়ে। এজন্য গত দুই বছর আগে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের সময় ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৫ দিন করা হয়। এরপরও মা ইলিশ ধরা পড়ায় গত দু’বছর ধরে এসময় আরও সাত দিন বাড়িয়ে মোট ২২ দিন করা হয়েছিল।

মৎস্য অধিদফতরের হিসাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চার লাখ টনের বেশি ইলিশ উৎপাদন হয়। আর চলতি বছরের ইলিশ উৎপাদন সাড়ে চার লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। বাংলা ট্রিবিউন

Print