জসিম উদ্দিন মণ্ডল : মার্কসবাদের লোকভাষ্য

October 3, 2017 at 3:17 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

মার্কসবাদের কোনো পরিভাষা ব্যবহার করতে শুনিনি তাঁকে। রাজনীতির পরিভাষাও নয়। না বক্তৃতায়, না ঘরোয়া আলোচনায়, না প্রশিক্ষণে। কিন্তু যা বলতেন, তা কখনোই বিচ্যুত ছিল না মার্কসবাদ থেকে। বিচ্যুত ছিল না পার্টি-লাইন থেকে। তত্ত্ব দিয়ে কথা বলতেন না। বলতেন সবকিছু গল্পের আকারে, ঘটনার আকারে, বিবরণের আকারে। সেগুলোই তত্ত্ব হয়ে উঠত। তত্ত্ব না হলেও হয়ে উঠত তত্ত্বের চিরায়ত ও লোকায়ত ব্যাখ্যা। যা বোঝার জন্য শিক্ষিত-অশিক্ষিত, কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাউকেই দ্বারস্থ হতে হতো না পাঠ্যপুস্তকের, কিংবা অন্য কোনো ভাষ্যের। এই গুণটা যে তিনি অর্জন করতে পেরেছিলেন তার প্রধান কারণ মার্কসবাদকে তিনি পুঁথি থেকে আয়ত্ত করেননি। তিনি মার্কসবাদ শিখেছিলেন জীবন থেকে। নিজের জীবন থেকে আর বঞ্চিত মানুষের জীবন থেকে। আমরা সামাজিক-রাষ্ট্রীয়-বৈশ্বিক অবিচারগুলো দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। তখন সমাজজীবনের কুৎসিত দিকগুলোও আর আমাদের মনকে ব্যথাগ্রস্ত এবং প্রতিবাদমুখর করে তুলতে পারে না। কিন্তু জসিম মণ্ডলের মতো মানুষেরা অভ্যস্ত হতে পারেন না সারাজীবন। তাই সেই অসাম্য এবং অবিচারের ক্ষত বয়ে বেড়ান, নতুন আঁচড়ে দগদগে হয়ে ওঠে সেইসব ক্ষত। আর সেই কারণেই পারবেন কি পারবেন না, এমন দোলাচলে না ভুগে অবিরাম সরানোর চেষ্টা করেন সমাজ ও দেশের বুকের ওপর চেপে বসা সেই জগদ্দল পাথরকে।

জসিম উদ্দিন মণ্ডলকে বাগ্মী বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আমরা। কিন্তু এই কথাটাও মনে রাখতে হবে যে প্রথাগত বাগ্মী তিনি ছিলেন না। নিজের বুকের মধ্যে লালন করা বিশ্বাসকে তিনি উগড়ে দিতেন নিজের ভাষায়। প্রথাগত বাগ্মীরা জেনেশুনেও অনেক সময় মিথ্যার সপক্ষে দাঁড়ায়। তত্ত্ব আর তর্কের বিকৃত উপস্থাপনায় মোহিত-সম্মোহিত করে শ্রোতাদের। এমন অনেক কথাও এমন সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে, যা তারা নিজেরাও বিশ্বাস করে না। তারা সত্যকে আড়াল করে, নির্মমতাকে সহনশীলতার আবরণ দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু জসিম মণ্ডল কখনোই সেইসব বাগ্মীদের সারিতে দাঁড়াননি। যা বিশ্বাস করেন না, তা কখনো উচ্চারণ করেননি। বরং যারা তত্ত্বের মোচড়ানি দিয়ে সত্যকে ঝাপসা করার চেষ্টা করে, তাদের আক্রমণ করেছেন সমস্ত বাকশক্তি এবং কর্মশক্তি দিয়ে। কথা বলার মোহিনী শক্তি করায়ত্ত করার জন্য কোনো বাকশিল্পীর সাহায্য প্রয়োজন হয়নি তাঁর। তাঁর রাজনীতিই তাঁকে বাকশিল্পী করে তুলেছিল। শ্রোতাদের মনের মধ্যে এই কথাটি গেঁথে দিতেন তিনি যে কোনোকিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরতেন নিজের এবং সঙ্গীদের জীবন থেকে। কৃষক ধান ফলাবেন। সেই কৃষক বছরের অর্ধেকটা সময় অনাহারে-অর্ধাহারে থাকবে পরিজনসহ, এটাই আমাদের শাসকদের রাজনীতি। যে তাঁতি কাপড় বুনবে, সেই তাঁতির বউ বস্ত্রের অভাবে লজ্জা নিবারণ করতে পারবে না, এটাই শাসক শ্রেণীর রাজনীতি। এইসব বলার পরেই উচ্চারণ করতেন প্রবাদপ্রতিম সেই বাক্য—‘ইহারই নাম রাজনীতি, ইহারই নাম অর্থনীতি। ইহা আপনাকে বুঝিতেই হইবে! ইহা আপনাকে করিতেই হইবে!’

হতাশ দেশের মানুষ প্রায়শই একটি কথা বলে থাকেন—যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ। সব শালারেই দেখছি!
জসিম মণ্ডল বলতেন—‘সব শালারেই দেখিছেন, কিন্তু নিজের শালারে তো দ্যাখেন নাই। সব পার্টিকে দেখিছেন, কমিউনিস্ট পার্টিকে দ্যাখেন নাই। আপনের নিজের শালা কমিউনিস্ট পার্টিকে দেখতে যদি চান তাহলে বিপ্লবের ডাক আসলে থাকতে হবে এই পার্টির সাথে।’

২.

কেমন হওয়া উচিত একজন কমিউনিস্টের জীবন যাপন?

কমিউনিস্ট কর্মী হয়ে থাকেন দুই ধরনের। এক ধরনের কর্মী হচ্ছেন সার্বক্ষণিক বা হোলটাইমার বা পেশাদার বিপ্লবী। পার্টির কাজ বাদে ইনাদের অন্য কোনো পেশা থাকে না। পার্টি তাদের জন্য মাসিক একটি অঙ্ক বরাদ্দ করে। সেই টাকাতেই তাদের জীবন চালাতে হয়।

কিন্তু যারা পেশাদার বিপ্লবী নন, কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সদস্য, তাদের বেলায় জীবন যাপন কেমন হবে?

আশির দশকে সারা দেশে ছাত্র ইউনিয়ন এবং ক্ষেতমজুর সমিতির বিস্তৃতি ঘটেছিল ব্যাপক। কমিউনিস্ট পার্টিরও। জসিম ভাইকে তখন সারাদেশে অসংখ্য সভা-সমিতিতে অংশ নিতে হতো। ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সম্মেলন এবং নবীন বরণ অনুষ্ঠানে তাঁকে চাইত সব শাখাই। তিনি যেতেনও। যেখানে সম্ভব, ট্রেনে যেতেন। রেলশ্রমিক নেতা হিসাবে তাঁর ট্রেনভ্রমণ ছিল নিখরচায়। অবৈধ নয়। রেলশ্রমিক ইউনিয়নের সাথে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের চুক্তি হিসাবেই তাঁর মতো সংগঠকরা এই সুবিধা পেতেন। সুবিধাটুকু শেষ পর্যন্ত কিন্তু পেয়ে যেত সংগঠনের সংশ্লিষ্ট শাখাটি। কারণ অনুষ্ঠানের অতিথিকে আনা-নেওয়ার ব্যয়ভার থেকে মুক্তি পেত তারা। এরপর বাকি থাকে থাকা-খাওয়া। ছাত্রদের হোস্টেলে কোনো এক ছাত্রকর্মীর বিছানায় ঘুমাতেন, ব্লকের কমন বাথরুম ব্যবহার করতেন, আর খেতেন ছাত্রদের কমন হোস্টেল ডাইনিংয়ে। মানুষ একটা নতুন জায়গাতে গেলে সেখানকার বিখ্যাত খাদ্যের খোঁজ নেয়। জসিম মণ্ডল কোনোদিন এমন শব্দ মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেননি। এমনকি কোনোদিন বলেননি যে ডাইনিং-এর খাদ্য মানসম্মত নয়। একথা কখনো বলেননি যে, খেয়ে তাঁর পেট ভরেছে কি না। তবে ডাল-তরকারি নিয়ে গল্প করার সময় হাসি-ঠাট্টা চলত। তিনি তো পার্টির কাজে প্রায় সারাবছর দেশটা চষে বেড়াতেন। সংসার চলত কীভাবে? শোনা হয়নি কোনোদিন। জিগ্যেসও করা হয়নি। তাঁকে তো পরতে দেখেছি একটাই পাজামা-পাঞ্জাবি। ঝোলার মধ্যে থাকত একটা লুঙ্গি আর টুকিটাকি জিনিস। বিলাসিতা তো দূরের কথা, বাড়তি কোনো কিছুই রাখতেন না নিজের জন্য।  ‘জীবনের রেলগাড়ি’ যে লিখলেন, সেটাও পার্টির কথা চিন্তা করেই। তাঁর মুখেই শুনেছি—বইটা বিক্রি হলে পার্টির ফান্ডে কিছু টাকা জমা হতে পারবে।

তাহলে কৃচ্ছতাই কি কমিউনিস্ট জীবনযাপনের শর্ত? এই বিতর্কের শেষ হয়নি। কিন্তু এটুকু নিশ্চয়ই বলা যায়, জীবনযাপনে বিলাসিতা এবং বাহুল্য এড়িয়ে চলতে পারলে ভালো। তবে কৃচ্ছতা কমিউনিস্ট জীবনের অঙ্গ নয়। লেনিনের জীবন যাপনের যতটুকু পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে বাহুল্য না থাকলেও সুরুচি এবং স্বচ্ছলতার নিশ্চয়তা সবসময় বজায় রাখার চেষ্টা ছিল। আর সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আগে নিজের পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সয়-সম্পত্তি দান করে দিতে হবে, এমন উদাহরণ বাংলাদেশের ও ভারতবর্ষের কিছু কমিউনিস্ট ছাড়া কোথাও নেই। আরও প্রশ্ন আছে? আজকের যুগে পার্টির নিজস্ব একটা কার বা মাইক্রোবাস থাকবে না কেন? কাছে-পিঠে কোনো প্রোগ্রামে যাওয়ার জন্য সারাটা দিন নষ্ট করে পাবলিক পরিবহনে ভ্রমণ করতে হবে কেন? পার্টির সদস্য লুঙ্গি-পাজামার বদলে স্যুট-টাই পরবে না কেন? লোক না-ঠকিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে না কেন? পার্টির বা সহযোগী সংগঠনের কোনো সদস্য আন্দোলন করতে গিয়ে মামলা-হুলিয়ায় পড়লে পার্টি তার আইনি সাহায্য এবং সবটুকু শেল্টারের ব্যবস্থা করবে না কেন? পার্টির সদস্য নিজ যোগ্যতায় বড় কোনো চাকুরি করলে সে উচ্চমধ্যবিত্ত জীবন যাপন করতে গেলে সমালোচিত হবে কেন? কমিউনিস্ট তো সাত্ত্বিক সন্ন্যাসী নয়। তবে জসিম মণ্ডল এমন এক প্রজাতির কমিউনিস্ট যাঁকে এই ধরনের কোনো প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি। জীবনটাকে তিনি এমনভাবে বিন্যস্ত করে নিতে পেরেছিলেন, যাতে বিপ্লবের জন্য প্রতিটি নিশ্বাস ব্যয় করতে পারেন।

৩.

এই যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং আমৃত্যু পার্টির প্রতি নিবেদিত থাকা—এই শিক্ষা তিনি কোথায় পেয়েছিলেন? কীভাবে জেনেছিলেন যে পুঁজিবাদের মধ্যে বসবাস করে, পুঁজিবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসাবে গ্রহণ করে দেশের মানুষকে কোনোদিনই মানুষের মর্যাদায় অভিষিক্ত করা যাবে না?

জেনেছিলেন জীবন থেকেই। পুঁথি থেকে নয়। তাই অক্লেশে জীবনের শেষ কর্মীসভাতেও বলতে পেরেছেন—‘শোনেন সবাই, বিশ্বব্যাংকের তাবিজ-কবজ-পানিপড়া-ঝাড়ফুঁক, হোমোপ্যাথি-আ্যলোপ্যাথি, আমেরিকার আশীর্বাদ, আয়ুব খানের উন্নয়নের ডংকা, ছাইফর রহমানের ছাগলতত্ত্ব, মুহিত সাহেবের রাবিশতত্ত্ব—সব দেখেছি। সব দেখেই বলছি— সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছাড়া আর কোনো চিকিৎসা নাই।’

সূত্র : বাংলাট্রিবিউন

Print