‘ডিপ ব্লু’ সুপার কম্পিউটারের খোঁজে

June 6, 2017 at 11:36 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক: ১৯৯৭ সালের ১১ মে’র কথা মনে আছে? সেদিন বিশ্বে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছিল। যন্ত্র হারিয়ে দিয়েছিল রক্ত-মাংসে গড়া মানব সন্তানকে। আর সেই মানব সন্তানটি ছিলেন বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ।

গ্যারি কাসপারভ ওই দিন দাবা খেলতে বসেছিলেন আইবিএম-এর সুপার কম্পিউটার ডিপ ব্লুর সঙ্গে। বিশ্বের তাবৎ বাঘা বাঘা দাবাড়ুদের সঙ্গে গ্যারি জিতলেও ডিপ ব্লুর কাছে সেদিন হেরে যান। মানুষের তৈরি কম্পিউটারের কাছে সেদিন প্রকৃতপক্ষেই মানুষকে হারিয়ে দিয়েছিল। যদিও ডিপ ব্লু সেসময় দাবা কম্পিউটার হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিল।

অবশ্য এর আগে গ্যারি ১৯৯৬ সালে ৬ বার হারিয়েছিলেন ডিপ ব্লুকে। বার বার হেরে (আসলে দাবার চাল বুঝে গিয়েছিল ডিপ ব্লু) গিয়ে তার থেকে শক্তি অর্জন করে সপ্তমবারের খেলায় বাজিমাত করেছিল ডিপ ব্লু। এরপরই মূলত তারকা হয়ে ওঠে ডিপ ব্লু নিজেই। এই সুপার কম্পিউটারটি ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে আসে এবং এটাই ছিল দেশের প্রথম সুপার কম্পিউটার।

আইবিএম-এর সুপার কম্পিউটার ডিপ ব্লু

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক ড. এ এম চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সুপার কম্পিউটারটি দেশে আনেন। জানা যায় সেসময় প্রায় ৩.৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সুপার কম্পিউটারটি কিনে আনা হয়। এর ঠাঁই হয় ধানমণ্ডিতে। বিসিসির সেসময়কার অফিসের পাশে রাখা হয় কম্পিউটারটি।

পরে কম্পিউটারটির জায়গা হয় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারের ডাটা সেন্টারে। গত ৩১ মে বুধবার ইফতারের কিছুক্ষণ আগে ডাটা সেন্টারের পরিচালক তারেক এম বরকতউল্লাহরআমন্ত্রণে এ প্রতিবেদকের সুযোগ ঘটে ডিপ ব্লুকে দেখার। প্রথম দেখাতেই মনে হয় বড়সড় কোনও সিপিইউ। তারেক এম বরকতউল্লাহ ডিপ ব্লু খুলে দেখান। বলেন, এটিতে ৬টি নড রয়েছে। প্রতিটি নডে রয়েছে ৪ করে সিপিইউ  সেই হিসেবে ডিপ ব্লুতে রেয়ছে ২৪টি সিপিইউ। এটি আইবিএম–এর তৈরি। এতে ব্যবহার করা হয়েছে আরআইএসসি (রিডিউস ইন্সট্রাকশন সেট কোড )। এতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতো ১৫ কিলোওয়াট। ডিপ ব্লু দিয়ে ম্যাসভলি প্যারালাল প্রসেসিং হতো, যেটা আগে ছিল না, আইবিএম নিয়ে আসে।

তিনি জানান, বিদ্যুৎ ব্যবহার বেশি হওয়ায় এবং এতে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের দাম বেশি হওয়ায় এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল ছিল বলে পরবর্তীতে আর এটি ব্যবহৃত হয়নি। তিনি আরও জানান, এটা দিয়ে ভালো কাজ যেমন করা যায়, তেমন খারাপ কাজও করা যায়। এমনকি নিউক্লিয়ার বোমার সিমুলেশনসহ আরও অনেক কিছু  করা সম্ভব। ফলে এটা আমদানির সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের অনুমতি নিতে হয়েছিল।

জানা যায়, ডিপ ব্লুর লাইফ টাইম (এন্ড অব লাইফ) শেষ হওয়ার পরও এটাকে সযতনে রাখা হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে আর এটা ব্যবহার করা হয়নি। চুক্তির শর্তানুযায়ী, এই মেশিন কাউকে দেওয়ার কোনও নিয়ম নেই। ফলে এটা সংরক্ষণ করা হয়েছে। ডিপ ব্লুর টিপিএম (ট্রান্সজেকশন পার মিনিট) ২১০০০। সাধারণত ১৫০০০ টিপিএম এর নিচের সক্ষমতার কোনও সুপার কম্পিউটার আনতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুমতি নিতে হয় না।

দেশে আনার পরে ডিপ ব্লু দিয়ে কী ধরনের কাজ হতো জানতে চাইলে তারেক এম বরকতউল্লাহ জানান, ইন্টারনেট ও মেইল সার্ভার হিসেবে এটা ব্যবহার হতো। আবহাওয়ার পূর্বাভাসদানেও এটা ব্যবহার করা হতো। এছাড়া সার্ক মেট্রোলজিক্যাল বিভাগ এটা দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মডেলিং করতো।

জানা গেল, বিসিসির সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এ এম চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ডিপ ব্লু-কে কেন্দ্র করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি (সাবেক খুলনা বিআইটি) বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জন শিক্ষক পিএইচডি গবেষণা করেন। তারা ডিপ ব্লু ব্যবহার করে নিউম্যারিক্যাল ওয়েদার ফোরকাস্টিং এর ওপরে তাদের গবেষণা সম্পন্ন করেন।

ইন্টারনেট ঘেঁটে জানা গেল, ডিপ ব্লুর পরে ২০০৪ সালে আসে সুপার কম্পিউটার জিন। এটি দিয়ে জিনের সিকোয়েন্স (জিন সিকোয়েন্সিং) করা যেত। এর সক্ষমতা ছিল ৩০০০০ প্লাস টিপিএম। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের কাজের জন্য এই সুপার কম্পিউটারটি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুমোদন না পাওয়ায় সেটি আর আনা সম্ভব হয়নি।

ডাটা সেন্টারের পরিচালক তারেক এম বরকতউল্লাহ বলেন, ডিপ ব্লুর চেয়ে আরও শক্তিশালী কম্পিউটার আমাদের রয়েছে। ডিপ ব্লু রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেশি হওয়ায় তা আর ব্যবহার করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, আমরা বড় মেশিন (সুপার কম্পিউটার) কিনব। আমরা বিগ ডাটা অ্যানালাইটিকস করতে যাচ্ছি। তখন আমাদের সুপার কম্পিউটার প্রয়োজন হবে। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা তো গবেষণা করে না, তারা গবেষণা বিমুখ। গবেষণা কাজের জন্যও তো সুপার কম্পিউটার প্রয়োজন। ফলে এই মেশিন কেনার সেই চাপটা নেই। তিনি উল্লেখ করেন, ফিজিক্স, ম্যাথ ও কেমিস্ট্রিতে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে না। তারা বেসিক সায়েন্স পড়ছে না ফলে মৌলিক গবেষণাও হচ্ছে না। তারা ডাক্তারি পড়ে কবিরাজ আর কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ে মেকানিক হতে চায়। তাদের এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা কেন্দ্র না হলে কোনও উন্নতি হবে না।

তিনি বলেন, স্কুলের মানে হলো পাঠশালা যার অর্থ পুঁথিগত বিদ্যা বিতরণ কেন্দ্র। আর বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান সৃষ্টি কেদ্র। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হলো পাঠশালাকেন্দ্রিক—ফলে গবেষণা, সুপার কম্পিউটার কিছুই নেই।

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

Print