রাজশাহীতে ধুমপানে আসক্ত হয়ে উঠছে স্কুলগামীরা

May 27, 2017 at 9:34 am

শফিক আজম:
‘ধুমপান মৃত্যূর কারণ’ প্রতিটি সিগারেটের প্যাকেটে এমন হুশিয়ারী সংবলিত লেখা দেখা যায়। তবুও ধুমপায়ীদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত বাড়ছে ধুমপায়ীদের সংখ্যা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে সমাজে ক্রমান্বয়ে অধুমপায়ী অপেক্ষা ধুমপায়ীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ধুমপায়ীদের স্পর্শে ধুমপানের ধোঁয়ার সংমিশ্রনে অধুমপায়ীরা চরমভাবে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। ধুমাপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও ধুমপায়ীরা এই অভ্যাসটি ত্যাগ করতে পারছে না। সহজলভ্য হওয়ায় প্রতিটি মুদি ও পান-সিগারেটের দোকানে সিগারেট বিক্রয় হচ্ছে দেদারসে।

 

বড়দের ন্যায় ধুমপানে আসক্ত হয়ে পড়ছেন স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এমনকি স্কুলের পাশে দাড়িয়ে ধুমপান করতে দেখা গেছে এসব শিক্ষার্থীদের। ধুমপানের ফলে শিক্ষার্থী এক দিকে যেমন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে অন্যদিকে ক্ষুন্ন হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর বড়কুঠি পদ্মাপাড়, রাজশাহী সিটি কলেজ মোড়, সিমলা পার্ক, পদ্মাচর,হেতম খাঁ গোরস্থান এলাকাসহ বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্টানের আশে পাশে একাকী কিংবা দলবদ্ধ হয়ে ধুমপান করেন শিক্ষার্থীরা। স্কুলের ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় স্কুল ফাঁকি দিয়ে অথবা টিফিনের বিরতিতে এহেন কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এমনকি প্রাইভেট শেষ করে চায়ের স্টলেও দেখা যায় তাদের ধুমপান প্রবণতা।
সরেজমিন ঘুরে রাজশাহী লোকনাথ স্কুল, রাজশাহী সরকারী হাই মাদ্রাসা, রাজশাহী মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, রাজশাহী শিরোইল সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম পরিহিত শিক্ষার্থীদের ধুমপান করতে দেখা যায়। বিশেষ করে নগরীর পদ্মাপাড়ে গেলের এর ভয়াবহ চিত্র লক্ষ্য করা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছু স্কুলগামি এক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বললে সে জানায়, ধুমপানটা যেন তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ইচ্ছে করলেই ত্যাগ করা যাবে যখন তখন। তবে হয়ে উঠেনা। আর নানাবিধ টেনশন দূর করতে অথবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে কখনও কখনও ধুমপান করে তারা।
ইদানিং প্রকাশ্যে ধুমপানের প্রবণতাও যেন বেড়েই চলেছে। সামাজিক মূল্যবোধ ভুলে এসব শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে ধুমপানে ব্রতী হয়ে উঠেছে। ফলে দেখা গেছে সমাজের শ্রদ্ধাশীল ব্যাক্তিবর্গকে উপেক্ষা করে ধুমপানে মধুপানের অপার স্বাধ উপভোগ করে তারা|
নানা কারণে শিক্ষার্থীরা মাদকাগ্রস্থ হয়ে পড়ছে। কেউ স্কুল, বাসা, প্রাইভেট কোচিংয়ের পড়ার চাপ থেকে রিলাক্স পেতে শুরু হয় কোন একজন পরে অন্য জন। অনেক সময় দেখা যায় অভিভাবকদের বিধিনিষেধ মানতে এক ঘেঁয়েমি থেকে মুক্তি পেতে ধুমপান করে। বন্ধ ুমহলের তাচ্ছিল্য অনেককে ধুমপানে আগ্রহী করে তোলে।

নতুন বন্ধু মহল বা কোন গ্রুপের সামনে ভাব দেখানোর জন্যও ধুমপান শুরু করে। সঙ্গ প্রিয়রা আসক্ত বন্ধুদের সহচার্য বঞ্চিত হবার আশঙ্কা থেকে অনেকে ধুমপানে ঝুকে পড়ে। পরিবারের কেউ মাদকাসক্ত থাকার জন্য ও পারিবারিক অশান্তি থাকলে বিরক্ত হয়ে ধুমপানে আসক্ত হয়ে পড়ে। আবার বাবা মায়ের অসচেতন ভালোবাসা থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা পয়সা প্রদানের কারণেও স্কুলগামি শিক্ষার্থীরা ধুমপানে আসক্ত হয়ে পড়তে পারে।

অভিভাবকরা বলছেন, সন্তানদের সঠিক পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব তার পরিবারের। সন্তান কোন অসৎ সঙ্গে মিশছে কিনা তা দেখা এবং সে অনুযায়ী তাকে চলাফেরার নির্দেশ দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের বন্ধুসূলভ আচরণের মাধ্যমে তাকে অসৎ সঙ্গ পরিত্যাগে বাধ্য করতে হবে।
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থী মুক্তাকিন আলমের অভিভাবক শাহিনুল আলম সিল্কসিটিনিউজকে  বলেন, স্কুলের সন্তানদের প্রেরণের পর আমরা খেয়াল করতে পারি না তারা কোথায় কি করছে। স্কুল থেকে প্রাইভেট এবং বাসায় আসা যাওয়া সবই বন্ধুদের সাথেই। তাদের এই দীর্ঘ সময়ে সঙ্গে নিয়ে যাতয়াত করা সম্ভব হয়ে উঠেনা। সন্তানরা কোথায় কি করছে তা জানা সব সময় জানা সম্ভব হয় না।
আরেক অভিভাবক সালমা আখতার সিল্কসিটিনিউজকে বলেন, একটি শিক্ষার্থী যখন মাদকের সাথে জড়িয়ে যায় তবে অভিভাবক হিসেবে আমাদের অবশ্যই প্রথম ধাপেই পরিত্যাগ করাতে হবে। এজন্য আমাদের অবশ্যই উচিৎ সন্তানেরা কোথায় কি করছে না করছে তা পর্যবেক্ষনে রাখা। তারা বাসায় আসতে কেন দেরী করছে, কোন কোন বন্ধুর সাথে আড্ডা দিচ্ছে সেগুলো খেয়াল করতে হবে। তার সাথে কঠোর না হয়ে বন্ধু সূলভ আচরণের মধ্যে দিয়ে খারাপ অভ্যাসে পরিণত যেন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
রাজশাহী সিরোইল সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ আনোয়ার সাদাৎ সিল্কসিটিনিউজকে বলেন, শিক্ষকরা ক্লাস মূখী হওয়ায় অনেক সময় নজরদারী করতে পারে না। কারণ দীর্ঘ ক্লাস চলাকালে সবার মাঝেই এক ঘেয়েমি চলে আসে। যার ফলে দেখা যায় য়ে শিক্ষার্থীরা স্কুলেই ধুমপানে আসক্ত হয়ে পড়ে। ধুমপানের বিরুদ্ধে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকার যদি শিক্ষকদের জন্য সপ্তাহে একটি দিন বিশেষ ভাবে নিয়ম করে দেয় যেন এদিন শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরের বিভিন্ন বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা করা হবে তাহলে এসব শিক্ষার্থীদের অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা যায়। এর মধ্যে ধর্মীয়, নৈতিক শিক্ষা, চিত্তবিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি, তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা ইত্যাদি বিষয়াবলী থাকতে পারে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে পরিবারকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। নিজের সন্তানকে ধর্মীয় ও নৈতিকতা সম্পর্কে জ্ঞান পরিবার থেকেই প্রদান করতে হবে। সন্তানকে অতিরিক্ত স্বাধীনতা বা হাতখরচ দেয়ার প্রয়োজন নেই। পারিবারিক সচেতনতা সন্তানকে ধংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
স/আর

Print