এবার উজানের ঢলে ডুবল তানোর-মোহনপুরের ৫ হাজার কৃষকের স্বপ্ন

May 1, 2017 at 8:16 am

নিজস্ব প্রতিবেদক:
এবার রাজশাহীর তানোর ও মোহনপুর উপজেলার বিলকুমারী বিলের পানি বেড়ে গিয়ে ডুবে গেছে অন্তত ৫ হাজার কৃষকের আধা-পাকা ধান। সেইসঙ্গে ডুবেছে কৃষকদের স্বপ্ন। গত চার থেকে ৫দিন ধরে একের পর এক ধানের জমি ডুবতে শুরু করেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি শুরু হয়েছে শুক্রবার থেকে। এদিন থেকেই বিলের প্রায় ৪০ ভাগ জমির ধান ডুবে গেছে বলে দাবি করেছেন কৃষকরা। এতে করে ওই এলাকার কৃষকরা এখন ধান নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

 

এখনো যেসব জমির ধান ডুবতে শুরু করেছে, সেগুলোও তড়ি-ঘড়ি করে কেটে নিচ্ছেন কৃষকরা। তবে শ্রমিকের অভাবেও সেই আধা-পাকা ধান কাটতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে কৃষকদের। এরই মধ্যে অন্তত ১২ শ হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।

 
তারা জানান, গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মোহনপুর ও পাশবর্তি তানোর উপজেলার মাঝখান দিয়ে যাওয়া বিলকুমারী বিলের পানি অব্যাহত বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে গত ২৫ এপ্রিল থেকে ওই বিলের জমির ধানও ডুবতে থাকে। সবচেয়ে বেশি ধান ঢুবতে শুরু করেছে গত শুক্রবার থেকে। ওইদিন থেকেই নওগাঁর মান্তা ও আত্রাইয়ের শিবনদীর উজান থেকে আসা পানির ঢলে মোহনপুরের বিলকুমারী বিলের পানি হঠাৎ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। এতে করে কৃষকদের জমির ধানও একের পর এক ডুবতে থাকে।

 

বাধ্য হয়ে কৃষকরা জমির আধা-পাক ধানই কাটতে শুরু করেন। আবার অনেকের জমির ধান শ্রমিকের অভাবে কাটতেই পারেননি। পানিতে ডুবে গেছে সব ধান। সবমিলিয়ে ওই বিলের অন্তত ৪০ ভাগ জমির ধান ডুবে গেছে বলেও দাবি করেছেন কৃষকরা। বাকি যেসব জমিতে এখন ধান রয়েছে, সেগুলোও ডুবে যাওয়ার ভয়ে আধা-পাকা অবস্থায় কেটে নিচ্ছেন কৃষকরা। এতে করে চরম ক্ষতিরমুখে পড়েছেন দুই উপজেলার অন্তত ৫ হাজার কৃষক।
কৃষকরা আরো জানান, এ বিলে শুধু ইরি-বোরো মৌসুমে বছরে একবার করে ধানচাষ করতে পারেন কৃষকরা। বিলের জমিতে অন্য সময়জুড়ে পানি জমে থাকে বলে জমিও থাকে উর্বর। ফলে অন্যান্য জমির চেয়ে এই বিলের জমিতে ধানচাষ করতে খরচ অনেকটা কম হয়।

 

 

তারপরেও অনেক বর্গাচাষি রয়েছেন, যাঁরা অন্যের জমি ধানচাষের জন্য বর্গা নিয়ে ধানচাষ করেন। এর জন্য জমির মালিককে বিঘা প্রতি দিতে হয় ৪-৫ হাজার টাকা করে। সঙ্গে প্রতি বিঘা জমিতে ধানচাষের জন্য অন্যান্য খরচ মিলে গরিব বর্গাচাষিদের বিঘা প্রতি খরচ হয় অন্তত ১০ হাজার টাকা। এতে করে বিঘা প্রতি ওই জমিতে ২০ মণ করে ধাণের ফলন হলেও বর্গাচাষিরা ৮-১০ হাজার টাকা লাভবন হন। কিন্তু এবার সব বর্গাচাষিদেরকেই পথে বসতে হবে জমির ধান পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে। আবার অধিকাংশ কৃষকই গরিব এবং মধ্যবিত্ত হওয়ায় তাঁরাও ক্ষতিরমুখে পড়বেন এবার।
মোহনপুর উপজেলার বেলনাপাড়া গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান জানান, এবার তিনি তিন বিঘা জমিতে ধানচাষ করেছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে প্রায় সোয়া দুই বিঘা জমির ধান পানির ঢলে ডুবে গেছে। তবে কোনোমতে মাত্র ১৫ কাঠা জমির আধা-পাকা ধান কাটতে পেরেছেন তিনি।
একই এলাকার হায়াতুল্লাহ সরকার বলেন, ‘এবার প্রায় ১০ বিঘা জমিতে ধানচাষ করেছি। এরই মধ্যে সবগুলো জমির ধানই ডুবে গেছে। এতে করে এবার ধান কিনে সংসার চালাতে হবে। আবার দান কিনতে গেলে আমার পরিবারে নেমে আসবে অভাব-অনটন। অথচ অন্যানবার ধান বিক্রি করেই সংসারটা অনেকটা ভালোভাবেই কেটে যেত। তবে এবার ধান ডুবে যাওয়ায় ছেলে-মেয়েদের পড়া-শোনার খরচ জোগানোসহ সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হবে।’
সাদেকুল ইসলাম নামের আরেক কৃষক দাবি করেন, এবার তিনি চার বিঘা জমিতে ধানচাষ করেছিলেন। যার মধ্যে সব ধানই ডুবে গেছে ঢলের পানিতে। এর ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। অথচ ওই জমিতে তিনি ধানচাষ করেছিলেন জমি বর্গা নিয়ে। এখন সব ধান হারিয়ে যেন পথে বসতে চলেছে তাঁর সংসার।
এদিকে মোহনপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রহিমা খাতুন বলেন,  মোহনপুরের খুব বেশি জমি নেই ওই বিলে। তবে উজানের ঢলে কিছু কৃষকের জমির ধান ডুবে গেছে খবর পেয়ে রবিবার সকাল থেকেই ওই বিলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে ক্ষতির পরিমাণ জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তানোর উপজেলার গোকুল গ্রামের কৃষক হযরত আলী জানান, এবার তিনি বিলকুমারী বিলে প্রায় ৫ বিঘা জমিতের ধানচাষ করেছিলেন। যার মধ্যে প্রায় ৩ বিঘা জমির ধানই ডুবে গেছে। বাকি জমিগুলোর ধানগুলো পাকতে এখনো ১০-১২ দিন সময় লাগবে। কিন্তু ডুবে যাওয়ার ভয়ে এখনোই কেটে নেওয়া হচ্ছে। তবে শ্রমিকের অভাবে আধা-পাকা ধানও কাটতে পারা যাচ্ছে না।
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সওকত আলী বলেন, ‘বিলকুমারি বিলের পানিতে বেশকিছু জমির ধান ডুবে গেছে বলে শুনেছি। তবে ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। তারপরেও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বিষয়টি খোঁজ নিতে বলা হয়েছে।’

স/আর

Print